প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিনিয়োগে বড় সুবিধা দিয়েছে সরকার। সুযোগটি হলো বন্ডে বিনিয়োগ। বন্ডটির নাম ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড।’ এই বন্ডে ১০ লাখ বা তার বেশি অঙ্কের ডলার বিনিয়োগ করলে গ্রাহককে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) ঘোষণা করে সরকার। তবে নগদায়নের কারণে বিনিয়োগ যদি ১০ লাখ ডলারের নিচে নেমে যায় এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে তিন মাসের মধ্যে ওই সীমা তিনি অর্জন করতে না পারেন, তাহলে গ্রাহক সিআইপি সুবিধা পাবেন না।

সরকারি হিসাবে বিদেশের মাটিতে ১ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন। তাঁদের শ্রম-ঘামের অর্থই প্রতিদিন জমা হয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে। এসব অর্থ প্রবাসী বাংলাদেশিদের কেউ পাঠান দেশে সংসারের খরচ মেটাতে, কেউ পাঠান সন্তানের লেখাপড়ার জন্য। কেউ আবার বাড়ি করেন, গাড়িও কেনেন।

কিন্তু হিসেবি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ২০০২ থেকেই চালু রয়েছে ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড। এটি তিন বছর মেয়াদি। বন্ডের মূল্যমান ৫০০; ১,০০০; ৫,০০০; ১০,০০০ ও ৫০,০০০ মার্কিন ডলার। তবে কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই। সর্বনিম্ন ৫০০ ডলার দিয়ে এই বন্ডে বিনিয়োগ করা যায়। এই বন্ডে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বেশি বিনিয়োগ করে সিআইপি তো হতে পারবেনই, মুনাফা অর্জনসহ আরও চারটি সুবিধা রয়েছে এতে। এগুলো হচ্ছে মৃত্যুঝুঁকি সুবিধা, আয়করমুক্ত মুনাফা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বিনিয়োগ, ঋণ নেওয়ার সুবিধা ইত্যাদি।

এত সুবিধা থাকার পরও ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ডের বিক্রি খুব বেশি নয় বলে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। সঞ্চয় অধিদপ্তরকে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছর আগেই জানিয়েছে, এই বন্ডের ব্যাপারে প্রবাসে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে এবং দেশের বাইরে এই বন্ডের বিক্রয়কেন্দ্র (সেলস পয়েন্ট) বাড়াতে হবে। এ ছাড়া লেনদেন কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে হেল্প ডেস্ক চালুর পাশাপাশি প্রচারণামূলক কাজে দূতাবাসগুলোতে কর্মরত কর্মচারীদেরও কাজে লাগানোর পরামর্শও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মৃত্যুঝুঁকি সুবিধা
এই বন্ডে বিনিয়োগ করলে মৃত্যুঝুঁকি সুবিধাও পাওয়া যায়। তবে মৃত্যুকালীন বিনিয়োগ থাকতে হবে। বন্ডের মেয়াদপূর্তির আগে বন্ডধারক মারা গেলে ক্রয়কৃত বন্ডের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুঝুঁকি সুবিধা দেওয়া হয়। যদিও মৃত্যুঝুঁকি সুবিধার অঙ্ক ২০ লাখ টাকার বেশি হবে না।

এ ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ন্যূনতম বিনিয়োগ হতে হবে ১০ হাজার মার্কিন ডলার। গ্রাহকের মৃত্যুর আগে বন্ডের মেয়াদ পূর্ণ হয়ে গেলে মৃত্যুঝুঁকি সুবিধা দেওয়া হয় না। বন্ডধারকের মৃত্যুর তিন মাসের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি সুবিধা দাবি করতে হয়।

ক্রেতার বয়স মৃত্যুকালে ৫৫ বছরের বেশি হতে পারবে না। মৃত্যুঝুঁকি সুবিধার দাবি নমিনি বা উত্তরাধিকারীরা দেশে বাংলাদেশি মুদ্রায় অথবা সমমূল্যে বৈদেশিক মুদ্রায় বিদেশ থেকেই নিতে পারবেন।

মুনাফা আয়করমুক্ত
এই বন্ডে বিনিয়োগকৃত ও অর্জিত মুনাফা আয়করমুক্ত। আর মেয়াদ শেষে মুনাফা রয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতেও সরল সুদে এই মুনাফা তোলা যায়। তবে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগে বন্ড নগদায়ন করলে মুনাফা কম হবে। এমনকি বন্ড কেনার তারিখ থেকে এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো মুনাফাই দেওয়া হবে না। তবে এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর কিন্তু দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে নগদায়ন করলে মুনাফা দেওয়া হয় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আর দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর কিন্তু তিন বছরের আগে ৬ শতাংশ এবং ৩ বছর পূর্ণ হওয়ার পর ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

পুনর্বিনিয়োগযোগ্য ও ঋণ সুবিধা
বন্ডধারক চাইলে ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ডে বিনিয়োগ করা আসল অঙ্ক পরের তিন বছরের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বিনিয়োগযোগ্য হয়। তখন তাঁর ফরেন কারেন্সি (এফসি) হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রায় তা জমা হয়ে যাবে।

বন্ডের বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার সুবিধাও রয়েছে। বন্ডের বিপরীতে আসল ও মুনাফা ইউএস ডলারে পরিশোধ করা হয়। তবে বন্ডধারক বা নমিনির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আসল ও মুনাফা বাংলাদেশি টাকায়ও পরিশোধ করা হয়ে থাকে।

গ্রাহক হতে পারেন কারা
এই বন্ড কেনার অন্যতম যোগ্যতা হচ্ছে আগ্রহীকে প্রবাসী বাংলাদেশি অথবা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক হতে হবে। তবে বাংলাদেশে অবস্থিত বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনার অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যাংক শাখায় এফসি হিসাব থাকতে হবে তাঁদের। প্রবাসী বাংলাদেশির নিজ নামে বা আবেদনে তাঁর উল্লেখিত ব্যক্তির নামে অথবা বাংলাদেশে তাঁর মনোনীত ব্যক্তির (বেনিফিশিয়ারি) নামে এই বন্ড কেনার সুযোগ রয়েছে।

বিদেশে লিয়েনে কর্মরত বাংলাদেশি সরকারি, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মচারী এবং বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে কর্মরত কর্মচারীরাও এই বন্ড কিনতে পারেন। পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে সত্যায়ন ছাড়াই প্রবাসী বাংলাদেশিরা কেবল পাসপোর্টের কপি দিয়ে এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকেরা
No Visa Required’ সিল-সংবলিত পাসপোর্টের কপি দিয়ে এই বন্ড কিনতে পারেন।

কোথা থেকে কেনা যায়
বাংলাদেশের সব তফসিলি ব্যাংকের অনুমোদিত ডিলার (এডি) শাখা, বিদেশে যেকোনো বাংলাদেশি ব্যাংক ও তাদের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যাংক এবং বিদেশে কার্যরত বাংলাদেশি ব্যাংকের আওতাধীন যেকোনো এক্সচেঞ্জ কোম্পানির মাধ্যমে এই বন্ড কেনা যাবে। তবে বিদেশে যে প্রতিষ্ঠান থেকে বন্ড কেনা হবে, সেই প্রতিষ্ঠানে তা নগদায়ন করা যায় না। সে জন্য বিদেশ থেকে বন্ড কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাকে আবেদনপত্রে বাংলাদেশের একটি কার্যালয়ের নাম উল্লেখ করতে হয়।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সামছুন্নাহার বেগম বলেন, এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বন্ডটিতে খুব বেশি বিনিয়োগ আসে না। এটিকে শুধু ইউএস ডলার বন্ডে না রেখে মাল্টি কারেন্সি, অর্থাৎ পাউন্ড, ইউরোতে বিনিয়োগ করার কথা ভাবা হচ্ছে। আর প্রচারণার জন্য বিভিন্ন দেশে রোড শো করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।