আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফলে টানা ৫ বছর পর করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এ সীমা বাড়াতে পেশাজীবী, ব্যবসায়ী সংগঠনসহ সব মহল থেকে দাবি জানানো হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দায়িত্বশীল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, করোনাকালীন সময়ে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কষ্ট লাঘবে এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও করমুক্ত আয়সীমা দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৫ লাখ রুপি করেছে। যদিও এনবিআর করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পক্ষে ছিল না।

কারণ করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হলে করদাতাদের বড় একটি অংশ করজালের বাইরে চলে যাবে। এতে আদায়ও কমবে। বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকা রয়েছে। এটি বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করা হবে।

গত আট অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ছিল দুই লাখ ২০ হাজার টাকা। এটিকে বাড়িয়ে তখন আড়াই লাখ টাকা করা হয়। এর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২ লাখ টাকা ও ২০১৩-১৪ তে ছিল ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। অবশ্য ২০১৫-১৬ পর প্রতি অর্থবছর গড়ে ৫ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি থাকলেও শুধু এনবিআরের অনাগ্রহের কারণে এ আয়সীমা বাড়ানো হয়নি।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বছর শেষে সার্বিক মূল্যস্ফীতির গড় দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশে। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা আড়াই লাখ টাকা। এর বেশি বার্ষিক আয় থাকলে এলাকাভেদে ন্যূনতম ৩-৫ হাজার টাকা আয়কর দেয়ার বিধান আছে। মহিলা ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ৩ লাখ টাকা, প্রতিবন্ধী করদাতারা ৪ লাখ টাকা ও গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতারা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত। বর্তমানে এলাকাভেদে ন্যূনতম কর হারে পার্থক্য আছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জন্য ন্যূনতম কর ৫ হাজার টাকা, অন্য সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৪ হাজার টাকা এবং জেলা শহরের করদাতাদের ৩ হাজার টাকা কর দিতে হয়।

অন্যদিকে আয় অনুযায়ী কর নির্ধারিত আছে। আড়াই লাখ টাকার পরবর্তী ৪ লাখ টাকার জন্য ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখের জন্য ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৬ লাখের জন্য ২০ শতাংশ, পরবর্তী ৩০ লাখের জন্য ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর নির্ধারিত আছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়েছে। কিন্তু সেই হারে দেশের করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়নি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত একলাফে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করেছে। মূলত কর ছাড় দিয়ে নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতেই করমুক্ত আয়সীমা একলাফে দ্বিগুণ করেছে ভারত। আমাদেরও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করমুক্ত সীমা বাড়ানো উচিত।

কারণ আদায়কৃত মোট আয়করের ৫৭-৬০ শতাংশ উৎসে কর হিসেবে আদায় করা হয়। বাকি বৃহৎ অংশ অগ্রিম কর ও প্রাতিষ্ঠানিক করদাতাদের কাছ থেকে আদায় হয়। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কাছ থেকে যে পরিমাণ কর আদায় করা হয়, তা একেবারেই সামান্য। শুধু প্রান্তিক করদাতার সংখ্যা বাড়িয়ে কাক্সিক্ষত আয়কর আদায় সম্ভব নয়। কারণ ছোট করদাতারা চাইলেও কর ফাঁকি দিতে পারে না। এর পরিবর্তে বড় ব্যবসায়ীদের মনিটরিংয়ের মাধ্যমে আরও বেশি কর আদায় সম্ভব।

//