উল্কা খসে পড়ার খবর ক’জন রাখে! কিন্তু ঝকঝকে আকাশে সন্ধ্যাতারা না জ্বললে, গোলমেলে ঠিকই লাগে। শুকতারা চিরায়ত। একই নিয়মে জ্বলে যাওয়া তার নিয়ম। জীবন তেমন নয়। তেমন নয় খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার। মাশরাফি বিন মর্তুজার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারের তাই শেষ নামছে এটা সবার জানা। গত বছরের মার্চে নেতৃত্ব ছেড়ে দিতেই কিশোর কৌশিক থেকে হয়ে ওঠা মাশরাফির টাইগার লোগোর জার্সিতে শেষ লিখে ফেলেন অনেকেই।

তবুও মাশরাফি ছিলেন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ওয়ানডে উইকেট সংগ্রাহক এখনও ক্রিকেটারই আছেন। তবে কাগজে-কলমে। আনুষ্ঠানিক ‘সাবেক’ নন অর্থে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঘোষিত ওয়ানডে সিরিজের প্রাথমিক দলে সর্বশেষ সিরিজের অধিনায়ককে না দেখে হতাশ হয়েছেন তার ভক্তকূল। সন্ধ্যার আকাশে শুকতারা খুঁজে না পাওয়ার মতো হাহাকার উঠেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের দুই দশকের কালের চিত্র তিনি। তার অলিখিত শেষটা শীতের শুষ্কতার মতোই অনুভূত হয়েছে ক্রিকেট ভক্তদের হৃদয়ে। তার চেয়ে মাশরাফির মুখ থেকে ‘অবসর’ শব্দটা শোনাই কি ভালো ছিল না?

সেই প্রশ্নের উত্তর ম্যাশ আগেই দিয়েছেন, সবার শেষ একরকম হয় না। আর সামর্থ্য অনুযায়ী, সুযোগ পেলে খেলবেন, না পেলে তার আক্ষেপ থাকবে না। টিম ম্যানেজমেন্ট দরকার মনে না করলে, তাকে নেবেন না। সামর্থ্যের ওই প্রশ্নে মাশরাফিকে এই ৩৮ বছরেও বাতিলের খাতায় খেলে দেওয়া কঠিন। শুরুতে তিনি গতিময় পেসার হয়ে এসেছিলেন। সেই গতি সময়ে সময়ে খয়ে গেছে। কিন্তু মাশরাফি অন্যদিক থেকে হয়ে উঠেছেন খুরধার। সেই ধার ভেঙে যায়নি পুরোপুরি।

বোলিংয়ে তার নিয়ন্ত্রণ, উইকেট ও ব্যাটসম্যানকে পড়ে ফেলা তার ক্যারিয়ার করেছে দীর্ঘ। ২০০১ এ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করা মাশরাফি পরের দশকের শেষে এসেও দেখিয়েছেন নতুন রূপ। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু টি-২০ কাপেও তাই জাত চিনিয়েছেন ২৯০ আন্তর্জাতিক উইকেটের মালিক। টি-২০ এই টুর্নামেন্টের পারফরম্যান্স বিবেচনায় পারভেজ ইমন, শরিফুল ইসলাম, নাসুম আহমেদরা দলে জায়গা পেলে মাশরাফিও তাই ডাক পাওয়ার দাবি ওঠে। নির্বাচকরাও মানছেন, তার খেলে যাওয়ার সামর্থ্য আছে। কিন্তু সেটা বড়জোর এক বা দুটি সিরিজ কিংবা একটা বছর। ম্যানেজমেন্টের চোখ তো দূরে। এক আলোর পথের অভিযাত্রীকে ফেলে টিম ম্যানেজমেন্টকে তাই আলো ফেলতে হচ্ছে দূরে। ভিশন ২০২৩ নামক এই বন্দরে। ওই চিন্তায় মাশরাফি দলের বাইরে।

এই বাইরে চলে যাওয়া থেকে ফিরে আসা মাশরাফির জন্য কঠিন, অসম্ভব বলাই শ্রেয়। এই ‘বাদ’ শব্দটার জোর ২০০৯ সালে পড়া গুরুতর এক ইনজুরি, ২০১১ বিশ্বকাপে ডাক না পাওয়ার পরও ফিরে আসা, ২০১৪ টি-২০ বিশ্বকাপের ইনজুরি কিংবা দুই পায়ে সাতটি অপারেশনের চেয়েও বেশি; কঠিনও। ওই ফিরে আসার সঙ্গে মিলিয়ে অংক কষলে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলবে না। যেমন মেলেনি টেস্টে। নড়াইল এক্সপ্রেসের টেস্ট ট্রাক এবং সম্ভাবনা তাই ২০০৯ সালেই থেমে গেছে। কেন তার প্রশ্ন সবার জানা, টেস্ট খেলার মতো পর্যাপ্ত ফিটনেস, টেম্পারমেন্ট না থাকা। বড় ইনজুরিতে অচিরেই সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার শঙ্কায় সাদা পোশাকের ক্রিকেটে আর দেখা যায়নি টেস্ট দিয়ে অভিষেক হওয়া এই পেসারের।

২০০৯’র পরে যেমন ম্যাশের টেস্টে ফেরা হয়নি। তেমনি এই বাতিলের খাতা থেকে ফেরাও তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কারণ ওই ফিটনেস। কারণ পরিকল্পনা। আর বাদ পড়ার পর দলে ফেরার মূল ভিত্তি ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফরম্যান্স। করোনার কারণে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ বন্ধ হয়ে আছে। সেটা শুরু হয়ে শেষ হওয়া মানে মাশরাফির বয়সের পাল্লায় আরও এক বছর যোগ হয়ে যাওয়া। ততদিনে ‘নড়াইল এক্সেপ্রেসের’ পথটা অটোমেটিক শেষ হয়ে যাওয়া।

তবে দুই দশকে মাশরাফি যে আলো ছড়িয়েছেন তা জ্বলবে বহু দশক, ছুঁয়ে যাবে শতাব্দী। পেসার হিসেবে তার প্রায় তিনশ’ আন্তর্জাতিক উইকেট ছোঁয়া নতুন পেসারদের জন্য হবে কীর্তি। সবচেয়ে বেশি ওয়ানডে জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। সেটা ভাঙার পথে নতুন কেউ বাংলাদেশ ক্রিকেটকে নিয়ে যাবেন অনন্য উচ্চতায়। তার ইনজুরি জয় শুধু ক্রিকেটার নয় অ্যাথলেটসদের জন্য থাকবে উদাহরণ হয়ে। একজন মাশরাফির আলো সর্বদা ঠিকরে পড়বে বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনে। মাশরাফির এই ‘শেষ’ নতুন কিছু শুরুর সম্ভাবনাও। ক্রিকেটার হিসেবে ১৯ বছর সেবা দিয়েছেন মাশরাফি। রাজনীতির আলাপ বাদই থাকাল; অন্য ভূমিকায় বাংলাদেশের ক্রিকেটে তার সেবা দেওয়ার আছে কয়েক দশক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here