বিশেষ প্রতিবেদক: অনেক চেষ্টার পরও ঘুরে দাড়াতে পারছে না শেয়ারবাজার। বাজারে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ থাকলেও প্রায় প্রতিদিনই নিম্নমুখী হচ্ছে বাজার। সেই সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই কমছে বাজার মূলধন। বিষয়টি যেমন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভাবিয়ে তুলছে, ঠিক তেমনি বাজার সংশ্লিষ্টদের কাছে এর প্রকৃত কারণ অজানাই রয়ে গেছে। আর এ কারনে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে বাজারের ভারসাম্য ধরে রাখতে ইনভেষ্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশসহ (আইসিবি) কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ছাড়া বাকিগুলো পুরোপুরি নিস্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। পোর্টফলিও ম্যানেজারসহ বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী বর্তমানে সাইডলাইনে থেকে বাজার পর্যবেক্ষণে বেশি ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। অতীত থেকে শিক্ষা নেয়া, বিনিয়োগকৃত অর্থের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় নতুন করে বিনিয়োগে আসছেন না বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী। এছাড়া রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত অনেকে মার্জিন লোন নিয়ে ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। পরিণতিতে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে না।

গত সপ্তাহের বুধবার পর্যন্ত টানা ১১ দিনের দরপতনে শেয়ারবাজারের মূল্য সূচক একটু একটু করে সূচক কমলেও ১২তম দিন বৃহস্পতিবার বড় বিপর্যয়ের কবলে পড়ছে দেশের শেয়ারবাজার। এদিন প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রায় ৭৬ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৬৮ পয়েন্ট বা সোয়া ১ শতাংশ হারিয়ে ৫৪৪৩ পয়েন্টে নেমেছে। বড় এ পতনে সূচকটি প্রায় এক বছর আগের অবস্থানে ফিরে গেছে। ক্লোজিং অবস্থান বিবেচনায় গত বছরের ১ জুন এর নিচের অবস্থানে ছিল। ওইদিন সূচকটির অবস্থান ছিল ৫৪৩৮ পয়েন্টে। বৃহস্পতিবার লেনদেন হওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে সিএসইর প্রধান সূচক সিএসইএক্সেরও সোয়া এক শতাংশ পতন হয়েছে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বৃহস্পতিবার পতনের কবল থেকে কোনো খাতই রক্ষা পায়নি। অধিকাংশ খাতের সার্বিক দরপতন ১ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৯৯ কোম্পানির শেয়ারের মধ্যে ২৬৬টিই লেনদেনের কোনো না কোনো পর্যায়ে দর হারিয়ে কেনাবেচা হয়। মাত্র ২৩টি শেয়ার আগের দিনের ক্লোজিং প্রাইসের তুলনায় বেশি দরে কেনাবেচা হয়। আর মিউচুয়াল ফান্ডসহ এ বাজারে লেনদেন হওয়া ৩৩৬ শেয়ার ও ফান্ডের মধ্যে দিনের শেষে মাত্র ৪৪টির দর বেড়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়েছে। কমেছে ২৫৪টির দর ও বাকি ৩৮টির দর অপরিবর্তিত ছিল।

এমন দরপতনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেকটাই দিশেহারা অবস্থা ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের কর্মকর্তাদের। এমনকি দুই স্টক এক্সচেঞ্জ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কর্মকর্তারাও ক্রমাগত দরপতনে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। সবার এখন একই প্রশ্ন-কী হলো শেয়ারবাজারের। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সবাই এখন মহা বিপাকে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, সংকটের মূলে ব্যাংক খাত। শেয়ারবাজার ইস্যুতে ব্যাংকের এক্সপোজার গণনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে জটিল অবস্থা তৈরি করে রেখেছে, তাতে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। তিনি বলেন, গত ফেব্রুয়ারির টানা দরপতনের সময় অর্থমন্ত্রী সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শেয়ারবাজার এক্সপোজার গণনায় পরিবর্তন আনার বিষয়ে গভর্নর ফজলে কবীর যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার একটাও বাস্তবায়িত হয়নি। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সংকটাবস্থায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবিকে আমানত বা ঋণ গ্রহণে একক গ্রাহকসীমা-সংক্রান্ত বিধান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। সেটিও করা হয়নি। বস্তুত ব্যাংকের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিআরআর কমানোসহ নানা নীতি-সহায়তা দিলেও শেয়ারবাজারের জন্য কিছু করেনি। এটাও বাজার সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খামখেয়ালীর কারণে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পথে বসতে চলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারণেই শেয়ারবাজারের এমন সংকট চলছে বলে তাঁরা মনে করেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তাব্যক্তিদের এদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তাঁরা অভিযোগ করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্ণর ব্যাংকিং বিষয়ে পেশাধারী ব্যক্তিত্ব নন। তাঁর আশে-পাশে যারা রয়েছেন, তারা সবাই শেয়ারবাজার বিরোধী মনোভাবের কর্মকর্তা। সে কারণে অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রতিশ্রুতি দিলেও তিনি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। তাঁরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখনো সময় আছে। অন্যথায় শেয়ারবাজার তছনছের সব দায়-দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংককেই নিতে হবে।