২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি) রপ্তানি আয় কমেছে গেল অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১১২ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৫১৮ কোটি টাকা।

উদ্যোক্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে এর চাহিদা কমতির দিকে থাকায় ক্রেতারা দর কমাচ্ছেন। অন্যদিকে দেশেও উত্পাদন ব্যয় বাড়ছে। ফলে উদ্যোক্তারা আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না। এর ওপর নতুন করে বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ভোগ ব্যয় আরো কমতির দিকে যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারগুলোতে অনেক ব্র্যান্ডের স্টোর বন্ধ করে দিতে হয়েছে। সেখানে চাহিদা কমে গেলে বাংলাদেশেরও রপ্তানি আরো কমে যাবে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন অন্যতম রপ্তানিকারক ও পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

পোশাকের কাঁচামাল ও এক্সেসরিজের দাম বেড়ে গেছে। অন্যদিকে করোনার কারণে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যসহ কয়েকটি খাতের রপ্তানিতে ধস নেমেছে। ফলে সার্বিকভাবে রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এদিকে আঙ্কটাডের (জাতিসংঘের বাণিজ্য উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা) হিসেব অনুযায়ী, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত আট মাসে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৬২৪ কোটি ডলারের। আলোচ্য সময়ে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৭ কোটি ডলারের। অর্থাত্ আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ বা ৩৮২ কোটি ডলারের।

অন্যদিকে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি কমেছে প্রায় পৌনে পাঁচ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। সেই হিসেবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে অর্থবছরের বাদবাকী চার মাসে রপ্তানি করতে হবে ১ হাজার ৯২৬ কোটি ডলারের পণ্য।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, গত কয়েক মাসের রপ্তানির বিবেচনায় এটি কার্যত অসম্ভব। অর্থাত্ বলা চলে, চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী ক্রেতার চাহিদা ও ফ্যাশনে নতুনত্ব আসছে। ক্রমাগত ফ্যাশন পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু আমাদের রপ্তানি মূলত সাধারণ মানের পণ্য। আমাদের উচ্চ মূল্য সংযোজনের পণ্য রপ্তানি খুবই কম।

তিনি আরও বলেন, মূল্য সংযোজনে না যেতে পারলে রপ্তানির প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণ এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কমার্শিয়াল উইংগুলোকে কার্যকর করার পাশাপাশি রপ্তানি পণ্য ও বাজার সম্প্রসারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রয়োজন।

বাংলাদেশের রপ্তানির ৮৪ শতাংশই গার্মেন্টস পণ্য। গার্মেন্টস রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ কমে যাওয়ায় অনেক দেশেই পর্যটক কমে গেছে। ফলে সেসব দেশে পোশাকের চাহিদাও কমছে।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, ইতোমধ্যে বেশকিছু ব্র্যান্ডের খুচরা দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক স্পোর্টসের ব্র্যান্ড ৮০ শতাংশ লোকসান গুণেছে। ফলে তা আমাদের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে চীন থেকে আমদানিনির্ভর অনেক এক্সেসরিজের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় এখানে উত্পাদন খরচও বেড়েছে। সবমিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে আরো বড়ো চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

ইপিবির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত আট মাসে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি কমেছে সাড়ে ৫ শতাংশ। একই সময়ে বড়ো খাতের মধ্যে রপ্তানি কমার তালিকায় রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ৯ শতাংশ, প্লাস্টিক পণ্য ১ দশমিক ৮ শতাংশ, হিমায়িত মাছ ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ, বিশেষায়িত টেক্সটাইল ১০ শতাংশ, হোম টেক্সটাইল সাড়ে ৭ শতাংশ। অন্যদিকে আলোচ্য সময়ে রপ্তানি বাড়ার তালিকায় রয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্য সাড়ে ২৪ শতাংশ, কৃষি পণ্য ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ।