মানুষকে আল্লাহ তাআলা যেসব অমূল্য নেয়ামত দিয়েছেন, তার অন্যতম হলো ভাষা। ভাষার মাধ্যমে মানুষ নিজের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ করতে পারে। সাহিত্য সৃষ্টি, মানব-সভ্যতার বিকাশ, ও সব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য ভাষাই প্রধান অবলম্বন। পৃথিবীর সব জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতি, ধর্ম-ইতিহাস ধারণ করে আছে ভাষা। তাই ভাষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। পবিত্র কোরআনে কারিমে আল্লাহ আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং ভাব প্রকাশের জন্য তাদের ভাষা দিয়েছেন।’ (সুরা আর রহমান, আয়াত : ২-৩)

কোরআনসহ পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থ বিশুদ্ধ ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে রাসুল বা বার্তা বাহক পাঠিয়েছেন। তারা সর্বোৎকৃষ্ট ভাষা নিয়ে আর্বিভূত হয়েছেন। বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলেছেন ও আল্লাহর বিধান বা দ্বীন প্রচার করেছেন। পৃথিবীর এমন কোনো জনপদ বা জনগোষ্ঠী নেই যেখানে আল্লাহ তাআলা তার বাণী বাহক এবং আসমানি কিতাব বা সহিফা অবতীর্ণ করেননি। তবে সব বার্তা বাহক ছিলেন বিশুদ্ধভাষী। সব আসমানি কিতাব ছিল সংশ্লিষ্ট জাতির বিশুদ্ধতম ভাষায়। তাই বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলা ইসলামেরই দাবি। নবী করিম (সা.)-এর একটি দায়েমি ও শ্বাশ্বত সুন্নত।

নবী করিম (সা.) সবসময় বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন। কেউ অশুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করলে তিনি তা শুধরে দিতেন। একবার এক সাহাবি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে ‘আ-আলিজু?’ বলে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। শব্দটির অপপ্রয়োগ হওয়ায় রাসুল (সা.) তা শুদ্ধ করে দিয়ে বললেন তুমি ‘আ-আলিজু?’ এর বদলে ‘আ-আদখুলু?’ বলো।

একটি হাদিসে আছে, সাহাবায়ে কেরাম আঙ্গুরকে ‘করম’ বলতেন। রাসুলে করিম (সা.) তা ঠিক করে দিয়ে ‘করম’ এর স্থানে ‘ইনাব’ বলার নির্দেশ দিয়েছেন। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আঙ্গুরকে ‘ইনাব’ বল না’। (মুসলিম শরিফ, হাদিস নং ৬০০৫)

অনুরূপ ইশার নামাজকে ‘আতামা’ না বলে ‘ইশা’ বলার নির্দেশ দিয়েছেন। মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বায় বর্ণিত আছে, সা’রা (রা.) বলেন, আমি সালিম (রা.)-কে বলতে শুনেছি, তোমরা ইশাকে ‘আতামা’ বলো না। এছাড়াও রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে শব্দের সুপ্রয়োগ-অপপ্রয়োগ ও শব্দ প্রয়োগের কুশলতা সম্পর্কে শিক্ষা দান করেছেন।

রাসুল (সা.) ছিলেন আরবদের মাঝে সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী। তিনি ঘোষণা করেছেন ‘আমি আরবদের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী’। রাসুল (সা.)-এর মুখনিসৃতঃ বাণীই হলো হাদিস। আরবি সাহিত্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে হাদিস। পবিত্র কোরআনের পর আরবি সাহিত্যে হাদিসের অবস্থান। কোরআন ও হাদিসের মতো সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেনি কোনো আরব। ভবিষ্যতেও পারবেনা। আল-কোরআন চ্যলেঞ্জ করেছে, কোরআনের মতো একটি সুরাও কেউ রচনা করতে পাারবেনা। আরবরা সেই চ্যলেঞ্জ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছে।

ভাষার বিশুদ্ধতা দাওয়াতি কাজে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ভাষার বিশাল অবদান রয়েছে। যেকোনো দেশে ও সমাজে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য সে দেশের মানুষের ভাষা ও সাহিত্যে র্পূণ পারদর্শিতা পূর্বশর্ত। বলা যায়, দাওয়াতি কার্যক্রমকে আবেদনময়ী ও মর্মস্পর্শী করে তোলে ভাষা। এইজন্যই মহান আল্লাহ তাআলা দাওয়াতি কার্যক্রমকে বেগবান, প্রানবন্ত ও সচল করার জন্য আম্বিয়া (আ.)-কে স্বজাতির ভাষায় ব্যুৎপত্তি ও পূর্ণ দক্ষতা দিয়ে পাঠিয়েছেন।

সব নবীদের মতো আমাদের নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) দাওয়াতি কার্যক্রম করত গিয়ে বহু বিদগ্ধ ভাষাজ্ঞ ব্যক্তিদের মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনো অশুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করেননি; বরং তিনি প্রতিপক্ষকে হৃদয়স্পর্শী ও আবেদনময়ী বর্ণনাশৈলীর মাধ্যমে কুপোকাত করেছেন। ভাষায় যদি বিশুদ্ধতা ও আবেদনময়তা না থাকে— তবে সম্বোধিত ব্যক্তির মন-মননে দাগ কাটতে সক্ষম হয় না। হৃদয়ে কোনো ধরনের রেখাপাত করে না। সে হিসেবে বিশুদ্ধ ভাষার শক্তি বহুগুণে বেশি। পারমাণবিক অস্ত্র দ্বারা দেশ ধ্বংস করা যায়, দেশ দখল করা যায় তবে মানুষের মন-মনন দখল করা যায় না। ভাষায় যদি থাকে বিশুদ্ধতা ও আবেদনময়তার গুণ— তবে সে ভাষা দ্বারা মানুষের মন জয় করা অতি সহজ। ভাষা মানুষের মনের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। এই জন্যই হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘কিছু কিছু কথায় জাদু আছে।’ 

মুসা (আ.)-এর মুখে জড়তা ছিল। তাই তিনি তার ভাইকে সহযোগী হিসেবে সঙ্গে পাঠানোর জন্য আবেদন করেন। কারণ তিনি ছিলেন সাবলীলভাষী। সুতরাং বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলা ও সম্বোধন করার গুরুত্ব বুঝানোর আরও কিছু বলার প্রয়োজন হয় না।

আমরা সর্বক্ষেত্রে রাসুল (সা.)-এর অনুসরণ করি। কিন্তু ভাষার প্রশ্ন এলে আমরা তার অনুসরণ করতে রাজি নই। এমনকি রাজি নই বিশুদ্ধ ভাষা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতেও। অথচ জানা উচিত যে, মুসলমানদের ধর্মীয় ভাষা আরবির পর পৃথিবীর যে কোনো ভাষার মর্যাদা সমান। কোনো জনপদ বা জনগোষ্ঠী হিসেবে কোনো ভাষার বিশেষ মার্যাদা নেই। বরং চর্চার মাধ্যমে যে ভাষা যত উৎকর্ষ অর্জন করতে পারে, সে ভাষার মার্যাদা তত বেশি।

পৃথিবীর অনেক ভাষা চর্চার অভাবে মৃত ভাষায় পরিণত হয়েছে। উর্দু ভাষাভাষীগণ চর্চার মাধ্যমে তাদের ভাষাকে উৎকর্ষতা দান করেছেন। ইসলামের কাছে নিয়ে গেছেন। তাই উর্দু আমাদের ভাষার তুলনায় সমৃদ্ধ ও ইসলামঘনিষ্ঠ ভাষা। অপর দিকে আমরা আমাদের ভাষাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারিনি। অন্যের ভাষা বলে বিমাতাসূলভ আচরণ করেছি। তাই আমরা আমাদের ভাষা সমৃদ্ধ করতে পারিনি। আমরা আমাদের ভাষাকে ইসলামের ও ইলমের ভাষা বানাতে পারিনি। এটা আমাদেরই ব্যর্থতা।

বিশুদ্ধ বাংলা বলতে বা লিখতে আমরা ততটুকু আগ্রহী নই— যতটুকু আগ্রহী বিদেশী ভাষা শেখার প্রতি। আমাদের চারপাশে প্রতিদিন যেসব বাংলা বলা বা লেখা হয়, তার বড় একটি অংশ অশুদ্ধ। সাইনবোর্ড লেখা হয় অশুদ্ধ বানানে। পত্রিকা লেখা হয় অর্ধশুদ্ধ বাংলায়। বিজ্ঞজনদের কথাবার্তায় অশুদ্ধতার ছড়াছড়ি। রক্ত দিয়ে আমরা ভাষা অর্জন করলেও ভাষার যথাযথ মর্যাদা আমরা দিতে পারিনি।

ভাষা আন্দোলনের দাবি ছিল সর্বত্র বাংলার প্রচলন ঘটানো। কিন্তু ৬১ বছর পরও তা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আমাদের সমাজের মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত শ্রেণী এখনো বাংলা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তারা বরং ইংরেজি বা অর্ধবাংলা বলেই আনন্দানুভ করেন। উচ্চবিত্তের ছেলেমেয়েরা ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে পড়ে গর্ববোধ করে। যে দেশের মানুষ বাংলার জন্য রক্ত দিয়েছে, সে দেশেই বাংলা উপেক্ষিত। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আরো একটি আন্দোলন দরকার। তবে সেটার নাম হবে ‘শুদ্ধ ভাষার আন্দোলন’। আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক : গবেষক, এমিরেটস সেন্টার ফর স্ট্র্যাটিজিক স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ (ইসিএসএসআর)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here