ড. এম কবির হাসান খ্যাতিমান বাংলাদেশী-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সে ফিন্যান্সের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তিনি অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের ইথিকস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স কমিটি ও এডুকেশন বোর্ডের সম্মানীত সদস্য। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ২০১৬ সালে তাকে ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফিন্যান্স পুরস্কারে ভূষিত করে। তার কাজের ক্ষেত্র ইসলামী ব্যাংকিং ও ফিন্যান্স, আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থা, উন্নয়ন অর্থনীতি, করপোরেট ফিন্যান্স, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার প্রভৃতি। বিভিন্ন সময়ে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও তুরস্ক সরকারকে পরামর্শ দেয়ারও অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বাংলাদেশে সুকুক চালুসহ নানা বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা।

বাংলাদেশে ইসলামিক বন্ড সুকুক চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

আমি প্রথমত এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখি। কারণ বাংলাদেশে ইসলামিক ফিন্যান্স মার্কেটের সাইজ পুরো আর্থিক খাতের ২৫ শতাংশ। সুকুক (sukuk) যদি ঠিকভাবে চালু এবং ব্যবহার করা যায়, তবে এটি সরকার ও অর্থনীতিকে দুদিক থেকে সাহায্য করবে। এক. অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাত আসতে চায় না। সরকার সুকুকের মাধ্যমে টাকা তুলে অবকাঠামো উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারবে। দুই. বিভিন্ন ধরনের বাজেটারি ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়। ফলে তারা ব্যাংক ব্যবস্থাকে চাপে ফেলে দেয়। সেক্ষেত্রে সুকুকের মাধ্যমে ঘাটতি অর্থায়নে সরকার নাগরিকদের কাছ থেকে অর্থ তুলতে পারবে। ব্যক্তিখাতও সুকুকের মাধ্যমে অর্থ তুলে ব্যবসাসহ ইসলামিক শরিয়াহ অনুযায়ী নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে এটি খুবই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। অনেক দিন ধরে এটি আমি বলে আসছি। কিন্তু পরিশেষে সেটি করতে যাচ্ছে সরকার। এটা খুশির কথা। তবে কথা হলো, এটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? তারা যদি ভুল করে শুরু করে তাহলে ভুল শোধরাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। তাড়াহুড়ো না করে ঠিকভাবে হোমওয়ার্ক করে সুকুক চালু করা দরকার। বেসরকারি খাতও সুকুক বন্ড চালু করতে পারে।

সুকুক চালুর ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কী?

প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো সুকুক সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া এবং কারিগরি কৌশলের সক্ষমতার ঘাটতি। ঘাটতি ধারণাগত পর্যায় থেকে নয়, পরিচালনগত পর্যায় থেকে। সমস্যা হলো, ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের প্রডাক্ট (product) উন্নয়ন করা হয় গতানুগতিক প্রডাক্ট (product) অনুসরণ করে। ফলে আমরা অনুকরণকারী হয়ে যাই। এটিকে বলা যায় মিমিকিং ইন্ডাস্ট্রি। যেমন ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রডাক্টগুলো গতানুগতিক ব্যাংকিংয়ের লোন প্রডাক্টগুলো অনুকরণ করে তৈরি করা হয়। সেগুলো অবশ্যই ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের প্রডাক্ট, কিন্তু যেসব কাঠামো অনুসরণ করে তৈরি করা হয়, তাতে অনেক সময় শরিয়ার বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জিত হয় না। আমার ভয় হচ্ছে যেভাবে সুকুকের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, তাতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা বেশি। ত্বকী উসমানী একবার ফতোয়া দিয়েছিলেন, বিশ্বে যেসব ইসলামিক সুকুকু আছে, তার মধ্যে ৮৫ শতাংশই শরিয়ার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তার মানে সেগুলো শরিয়া নিয়ম পরিপালন করে না। তার ফতোয়া দেয়ার পর সুকুক মার্কেটে বিরাট ধস নেমেছিল। কারণ চূড়ান্তভাবে ইসলামের নামে একটি বন্ড ছাড়া হচ্ছে, অথচ তাতে ইসলাম নেই, সেটি এক ধরনের প্রতারণা। বাংলাদেশ যে সুকুক চালু করতে যাচ্ছে, তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির কী কাঠামো আছে এবং সক্ষমতা কতটুকু তা জানি না। আমি দূর থেকে সঠিকভাবে বলতে পারছি না, সেটি সঠিক নির্দেশনায় এগোচ্ছে নাকি এগোচ্ছে না। আমি মনে করি, দেশে যোগ্য লোক নিশ্চয়ই আছে। আশা করি, তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে।

কীভাবে সুকুক চালু করা উচিত বা অন্যান্য দেশ কীভাবে করেছে?

প্রথম বিপদ হলো, যারা সুকুক মার্কেটে আছে বা সুকুক উন্নয়নে আছে, অধিকাংশ ব্যক্তিই কিন্তু আইনজীবী। আইনজীবীরা দেখে লেটার অব দ্য ল অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা। এখানে সুদ আছে কিনা, গড়বড় আছে কিনা, মৌলিক মূলনীতিগুলো অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা। কিন্তু তারা এর চূড়ান্ত ফল দেখে না। চূড়ান্ত ফল, এটি আসলে একটি প্রকৃত পুনঃঅর্থায়ন প্রডাক্ট (project financing), নাকি এটি একটি ডেবট প্রডাক্ট (debt product)। অনেক ক্ষেত্রে শুধু আইনজীবী নয়, সুকুকের মান যাচাইকারী ঋণমান সংস্থাগুলোরও মানসিকতা এমন যে তারা এটিকে রেট করে কনভেনশনাল বন্ড পারস্পেক্টিভ থেকে। এ কারণে তারা সুকুক ইনস্ট্রুমেন্টগুলোর কাঠামো পরিবর্তন করে ফেলে। কাঠামো পরিবর্তনের কারণে এটি আর সুকুক থাকে না, এর মেজাজ ইসলামী থাকে না। এটি গতানুগতিক বন্ডে পরিণত হয়। আমাদের মূল দ্বন্দ্বটা হলো, সুকুক অ্যাসেট বেজড (Asset based) বা অ্যাসেট ব্যাকড (Asset backed)। অ্যাসেট বেজড (Asset based) হলো ক্রেডিটওয়ার্দিনেস অব দি অরিজিনিটর প্রভাইডিং দ্য গ্যারান্টি। এখন দেখতে হবে সুকুকের উদ্দেশ্যটা কী? সেটি হলো আমরা নতুন ফিন্যান্সিং পাব। বিদ্যমান সম্পদকে জামানত ধরে সুকুক ব্যবহার করা হলে আসলে ওই সম্পদের মনিটাইজেশন করা হবে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ বাড়বে। কিন্তু এর মাধ্যমে নতুন অ্যাসেট (Asset) বা প্রডাক্টের ক্যাপাসিটি তৈরি হবে না। এ ভুলটি আমরা প্রায়ই করি। যারা কথা বলছেন, সুকুক নিয়ে তাদের মত হলো যে সেখানে সরকারি সম্পদ থাকা উচিত। অবশ্যই থাকা উচিত, তবে সেটি জামানতের মানের জন্য। এগুলোকে আমরা অ্যাসেট বেজড (Asset Based) সুকুক বলি। এ জায়গায় ক্রেডিটওয়ার্দিনেস নির্ভর করে সরকারের ঋণ ঝুঁকির মানের ওপর। কিন্তু যে সুকুকের কথা আমরা বলছি, যে সুকুক ইসলামী মতে শুদ্ধ, তা হলো অ্যাসেট ব্যাকড (Asset backed)। ধরা যাক, একটি মহাসড়ক তৈরি করা বা সম্প্রসারণ করা হবে। এই মহাসড়ক সম্প্রসারণের যে ভবিষ্যৎ প্রকল্প, তার বিপরীতে সুকুক ইস্যু করা যায়। সুকুক ইস্যু করলে সেই সুকুক দিয়ে নতুন কিছু তৈরি হবে। সেই সুকুক যারা কিনবে, তারা আবার কীভাবে রিটার্ন পাবে। মহাসড়ক থেকে টোল নেয়া হবে, তা থেকে সুকুক হোল্ডারদের রিটার্ন পরিশোধ করা যাবে। আমি জানি আমাদের বোদ্ধারা এসব বিষয় বোঝে এবং ঠিকমতো এগোচ্ছে।

ঠিকমতো এগোতে আমাদের কী করতে হবে?

আমরা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের চারটি কাঠামো দেখছি। সংজ্ঞাগতভাবে সুকুক হোল্ডারই অ্যাসেটের মালিক, অ্যাসেটের ক্রেডিটর নয়। মালিকানার যত অধিকার থাকে, সুকুক হোল্ডারদেরও তা থাকবে। প্রথম ধরনের সম্পদ হলো অ্যাসেট ব্যাকড (Asset backed)। এটি বর্তমান। আরেকটি হলো, অ্যাসেট বেজড (Asset based)। এটি অনুপস্থিত। সেক্ষেত্রে হোল্ডাররা অ্যাসেটের মালিক হচ্ছেন না। মূলত সেটি আসলে একটি ডেবট (debt) ইনস্ট্রুমেন্ট। অন্য ধরনের সুকুক হলো অ্যাসেট লাইট (Asset light)। এটি অনুপস্থিত, কিন্তু রিপোস্ট টু দ্য গ্যারেন্টর। আমরা যদি ঝুঁকির কথা বিবেচনা করি তাহলে সুকুকের দ্বিতীয় পয়েন্টটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে অথবা অন্য কোনো সেতু। সেতুর আয় থেকে সুকুক হোল্ডারদের রিটার্ন দেয়া হবে। তার মানে এখানে ঝুঁকির সম্পর্ক আছে। যদি মুনাফা কমে যায় তাহলে আয় কম আসবে। তখন সুকুক হোল্ডাররা রিটার্ন কম পাবে। কিন্তু সম্পদভিত্তিক সুকুক গ্যারান্টরের নৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করে। সরকারি প্রকল্পে সরকার নিজেই যদি রিটার্নের গ্যারান্টি দেয়, তখন সেটি সুদে পরিণত হয়। তবে ব্যক্তি খাতের প্রকল্পের অর্থায়নে সরকার থার্ড পার্টি গ্যারান্টি দিতে পারে। বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। কোনো সরকারি প্রকল্পে সরকার নিজেই যদি সুকুক হোল্ডারদের নির্দিষ্ট হারে মুনাফা প্রদানের গ্যারান্টি দেয়, তবে সেটি আর সুকুক থাকবে না। কিন্তু কোনো বেসরকারি প্রকল্পে সরকার থার্ড পার্টি হিসেবে গ্যারান্টি দিতে পারবে। মূল বিষয় হলো, আমার সম্পদে আমি গ্যারান্টি দিতে পারব না। কোনো বেসরকারি কোম্পানি নিজে সুকুকের অর্থে একটি ব্রিজ তৈরি করে, তার আয় থেকে সুকুকের ধারকদের মুনাফা দিতে পারবে। এক্ষেত্রে এ খাতকে (অবকাঠামো) টেকসই করতে এবং জনগণকে আস্থায় রাখতে সরকার থার্ড পার্টি হিসেবে গ্যারান্টি হতে পারে। তবে কোম্পানি কখনই মুনাফার গ্যারান্টি দিতে পারবে না। তৃতীয়টি হলো, ট্রু সেন্স অব সেলস ট্রানজেকশনের উপস্থিতি। অ্যাসেট বেজড (Asset based) সুকুক বর্তমান। আর অ্যাসেট ব্যাকড (Asset backed) ও অ্যাসেট লাইট (Asset light) সুকুক অনুপস্থিত। এটি ইসলামিক সুকুক বা ইসলামিক ট্রানজেকশনের ফান্ডামেন্টাল কনসেপ্ট। এটি সেল কনট্রাক্টে হতে হবে। সেল কনট্র্যাক্ট না হলে সেটি শরিয়া কমপ্লায়ান্ট হবে না। চতুর্থ বিষয় হলো, প্রেজেন্স অব গ্যারান্টি। ফাস্ট পার্টি সুকুক হোল্ডারদের রেট অব রিটার্নের গ্যারান্টি দিতে পারবে না। কিন্তু সেক্টরটিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে এবং সরকারের প্রাধান্যের কারণে কোম্পানির প্রকল্পে সরকার থার্ড পার্টি হিসেবে রেট অব রির্টান গ্যারান্টি দিতে পারবে। সরকারি প্রজেক্ট পরিশেষে অ্যাসেট কম্পোজিশন হাইলি ডিনোমিনেটেড ইন রিয়েল অ্যাসেট। এটিকে অবশ্যই রিয়েল অ্যাসেট হতে হবে। ইসলামিক শরিয়ার আরেকটি মৌলিক নীতি হলো ইউ ক্যান নট রেন্ট মানি ফর মানি। ফলে অ্যাসেট বেজড হাইলি ডিনোমিনিটেড ইন রিয়েল অ্যাসেট আর্থিক সম্পদের পূর্ণ চিত্র নয়। বলা হয়, ৫১ শতাংশ রিয়েল অ্যাসেট হতে হবে এবং ৪৯ শতাংশ মুরাবাহ বা ডেবট (debt) টাইপ অ্যাসেট হতে পারে। অনেক শরিয়া স্কলার এটি অ্যালাউ করে। কিন্তু এটি প্রকৃত অর্থে ইসলামী নয়। ইসলামী হতে হলে সেটিকে অবশ্যই হাইলি ডিনোমিটেড বাই রিয়েল অ্যাসেট হতে হবে। অ্যাসেট লাইট সুকুকও একই জিনিস। হাইলি ডমিনেটেড বাই ফিন্যান্সিয়াল অ্যাসেট। আমি জানি, সুকুক উন্নয়ন নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা বোদ্ধা। তারা পার্থক্যগুলো বুঝে ঠিকমতো এগোচ্ছেন। ঠিকমতো এগোলে আমাদের অবশ্যই অ্যাসেট ব্যাকড (Asset backed) সুকুক স্ট্রাকচারে যেতে হবে। একটি সিদ্ধান্ত টেনে বলা যায়, অ্যাসেট ব্যাকড (Asset backed) সুকুক কাঠামোয় রিটার্ন নির্ভর করে অ্যাসেটের ওপর। মনে করুন, সুকুক ইস্যু করা হচ্ছে নতুন একটি সেতু নির্মাণের জন্য। তার যে ইনকাম পটেনশিয়াল আছে এর ওপর ভিত্তি করে। সুতরাং রিস্ক আর রিটার্ন খোদ সম্পদের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কিত। সম্পদ বেশ জেনুইন ভূমিকা পালন করে। কেউই আসলে লোকসানে পড়বে না। ধরুন, আন্ডারলাইং অ্যাসেট পারফরম্যান্স ব্যর্থ হয়েছে। তখন সুকুক হোল্ডাররা কোথায় যাবে? সুকুক হোল্ডারদের অ্যাসেটের পূর্ণ মালিকানা-কর্তৃত্ব থাকবে। তারা সেই অ্যাসেট ডিসপোজ করতে পারে বা যেকোনো পদ্ধতি বের করে তাদের রিটার্ন নিজেদের মধ্যে বণ্টন করতে পারে। কাজেই অন্যতম শরিয়া মূলনীতি হলো রিস্ক অ্যান্ড রিটার্ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেকোনো ইনস্ট্রুমেন্ট, যেখানে নো রিস্ক নো গেইন দেখেন, সেটিই নন-শরিয়া কমপ্লায়ান্ট। যদি সরকারি সম্পদ জামানত হিসেবে ব্যবহূত হয়, তবে সরকারই গ্যারান্টর। কাজেই অ্যাসেট খেলাপিতে প্রকৃত ভূমিকা পালন করে না। অ্যাসেট জাস্ট লাইক অ্যা ক্যামোফ্লাজ ইন বিটুইন। এক্ষেত্রে সুকুকের ইসলামিক প্রিন্সিপাল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কাজেই যেকোনো নতুন কাঠামোয় চারটি বিষয় অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। প্রথম বিষয়, শরিয়া মূলনীতি ও লিগ্যাল ডকুমেন্টেশনের মধ্যকার প্যারাডক্স। যেটি বাংলাদেশে এখন ঘটছে। আমাদের বন্ড মার্কেটের তেমন উন্নতি ঘটেনি। গতানুগতিক বন্ড মার্কেট ডেভেলপ করতে হলে কোম্পানি আইন, সিকিউরিটিজ আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইনগুলো রিভিশন-মডিফাই করতে হবে শরিয়া রিকোয়ারমেন্টের সঙ্গে কমপ্লায়ান্ট করার জন্য। এটি প্রথম রিকোয়ারমেন্ট। দ্বিতীয় বিষয়, অ্যাসেট ডিসপোজের ক্ষেত্রে সুকুক হোল্ডারদের অধিকার নিশ্চিত করা। এজন্য আমি মনে করি, সরকারের বিদ্যমান যে সম্পদ, তার বিপরীতে সুকুক চালু করলে ঠিক হবে না। কারণ এখানে নতুন অ্যাসেট হচ্ছে না, পুরনো সম্পদের ওপর ডেবট (Debt) বাড়িয়ে দেয়া হলো। এটা অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়িয়ে দেবে। সৌভাগ্যক্রমে বাংলাদেশের ডেবট (Debt) ক্যাপাসিটি ভালো। ২০১৮ সালে তা ছিল জিডিপির ৩৪ শতাংশ। আমরা এক্ষেত্রে অনেক উন্নয়নশীল দেশের চেয়েও ভালো অবস্থানে আছি। এমনকি অনেক উন্নত দেশের চেয়েও যেমন ইউরোপে দেশগুলোর জিডিপি-ঋণ অনুপাত ১০০ শতাংশেরও ওপরে। এদিক থেকে আমরা অর্থনীতিতে আরো কিছু ঋণ ধারণ করতে পারি। যে কারণে আমি বলছি, অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান আছেন অথবা অমুসলিম আছেন, যারা বিশ্বাস করেন রিস্ক রিটার্ন পার্টনারশিপ ফিন্যান্সিংয়ে তারা সুকুক কিনবে। কারণ এটি তাদের বিনিয়োগ লক্ষ্য ও চিন্তাধারার সঙ্গে মিলিত। এ বিষয়টি আছে কিনা দেখতে হবে। তৃতীয় বিষয়, পারচেজ ও কনভার্ট ইকুইটি টু ডেট ইনস্ট্রুমেন্ট। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোকে সন্তুষ্ট করার জন্য যখন সুকুক সৃষ্টি করা হবে তখন সরকার বলবে, ঠিক আছে আন্ডারলাইং অ্যাসেট ব্যর্থ হয় তাহলে আমি তোমার বিনিয়োগকৃত অর্থ পরিশোধ করব। এমনটি হলে এটি ইকুইটি ইনস্ট্রুমেন্ট থেকে ডেট ইনস্ট্রুমেন্টে পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না। যখন ডেট ইনস্ট্রুমেন্ট হয়ে যায়, তখন সেটি বিক্রি করা যায় বটে, তবে সেটি কেবল অভিহিত মূল্যে (ফেস ভ্যাল্যু)। চতুর্থ বিষয়, সুকুক চালু করার জন্য একটি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তবে এটি পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল হতে হবে সুকুকের ইস্যুয়ারের ওপর। সুকুক হোল্ডারের পূর্ণ অধিকার থাকতে হবে, আমি আমার অ্যাসেট ডিসপোজ করব ইন টার্মস অব ব্যাংকরাপসি। তাদের সম্পূর্ণ সেই অধিকার রয়েছে। কিছু কারণের জন্য সরকার সুকুক হোল্ডারদের সময়ানুক্রমিক মুনাফা দিতে ব্যর্থ হলে সুকুক হোল্ডারদেরও তার দায় বহন করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি প্রজেক্টে সরকার কোনো গ্যারান্টি দিতে পারবে না। সুকুক ছাড়ার জন্য কয়েকটি দেশী-বিদেশী কোম্পানি বিএসইসিতে আবেদন করেছে। কিছু আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, কিছু আবেদন গৃহীত হয়েছে।

সুকুক ছাড়ার জন্য কোম্পানিগুলোর উদ্যোগকে কীভাবে দেখেন?

এটা নিশ্চয়ই ভালো। আমরা অন্য দেশের বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণ করছি। এর মাধ্যমে বিদেশী পুঁজি পাচ্ছি বা পাব। তবে আন্তর্জাতিক ডাইমেনশনে গেলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আমাদের দেশে আসবেন না স্থানীয় আইন ও বিধিভিত্তিক সুকুক কাঠামোয়। আপনার বুঝতে হবে, যারা তাদের অর্থ নিয়ে ঝুঁকি গ্রহণ করে, তারা ব্যাপক সফিস্টিকেটেড। এমনকি তারা পরামর্শ নেয়ার জন্য খুব সফিস্টিকেটেড অ্যাডভাইজার নিয়োগ দেয়। কাজেই সুকুক চালু করতে হলে আমাদের অনেক পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু ইসলামী ব্যাংকিং আইন নয়, আরো অনেক কিছু বদলাতে হবে। আমরা ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনা করছি গতানুগতিক ব্যাংকিং প্রবিধানের ভিত্তিতে। আমাদের একে একে সবই সংশোধন করতে হবে সুকুক চালু করার জন্য। প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে এ খাতের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য। এক কথায় আপনার প্রশ্নের উত্তর হলো হ্যাঁ, এসব কাজ করলে বিদেশী বিনিয়োগ আসবে, অন্যথায় নয়। আমি মনে করি, এসবের জন্য স্থানীয় বাজারের দিকে মনোযোগ দেয়া জরুরি। এ ধরনের ইনস্ট্রুমেন্টের দেশের ভেতরেই বেশ চাহিদা আছে। লক্ষ করুন, কোনো ইসলামিক ফিন্যান্স আইন ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বাজার অংশ ২৫ শতাংশ। তার মানে বাংলাদেশে ইসলামিক ফিন্যান্স ইন্ডাস্ট্রি চাহিদা চালিত। মানুষ এটি চায়। যারা ব্যাংকিং ব্যবসা করছেন, তারা একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছেন। অনেকেই ইসলামিক ফিন্যান্সের ভিশন ও মিশন নিয়ে ব্যাংকিং ব্যবসায় আসে। তারপর সেখানেও অর্থ কামানোর লোকও আছে। কারণ তারা মূলত ধর্ম বিক্রি করছে। এখানে বহু ফ্যাক্টর এবং বহু গোষ্ঠী যুক্ত। আমি শরিয়া স্কলারদের প্রতি সত্যিই সম্মান জানাই। দুর্ভাগ্যক্রমে আলেমরা কমার্শিয়াল জুরিসপ্রুডেন্সে খুব একটা প্রশিক্ষিত নন। বিভিন্ন প্রাইভেট ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা ব্যক্তিগত কথোপকথনে হয়তো এটি স্বীকারও করেন। হয়তো তাদের ইসলামিক ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। কিন্তু ইসলামিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা মানে এই নয় যে তারা ইসলামিক ফিন্যান্স জুরিসপ্রুডেন্সে বিশেষজ্ঞ এবং তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সক্ষমতা বাড়াতে হবে আমাদের নীতিনির্ধারকদের, বিচারকদের, আইনপ্রণেতাদের। যারা আসলে চান ইসলামিক ফিন্যান্স শক্তিশালী হোক কিন্তু বিষয়গুলো জানেন না, তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

ইসলামী ফিন্যান্সে সফল দেশ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। সেখানে কীভাবে কাজটি হয়?

খুব মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু, ১৯৮৩ সালে। কিন্তু মালয়েশিয়া শুরু করার আগে প্রথমে তারা একটি আইন তৈরি করেছে। বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকিং করতে চাইলে এ আইনগুলো অনুসরণ করতে হবে। আমাদের অনেক বছর হলো অথচ আমরা এখনো কোনো আইন তৈরি করেনি। মালয়েশিয়ার চেয়ে আমাদের ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ভিত্তি বেশি। মালয়েশিয়ায় ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বাজার অংশ এখনো ২৫ শতাংশে পৌঁছেনি। মালয়েশিয়া যখন সুকুক ছাড়ে, তার আগে তাদের সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন একটি আইন তৈরি করেছে কিংবা বিদ্যমান আইনকে পরিবর্তন-পরিমার্জন করেছে। যারা মার্কেটে আসবে তারা যথাযথভাবে খেলার বিধি জানবে। যেহেতু আমাদের কোনো আইন নেই, আমি শঙ্কিত তবে আশা করি আমার ধারণা ভুল হবে, এখানে অনেক কারসাজি হবে। মানুষ এটিকে তাদের ফান্ড বাড়াতে ব্যবহার করবে এবং নিজের আর্থিক সুফল অর্জনে কাজে লাগাবে। আবারো সেটি করবে ইসলামের নামে।

আপনি বলছেন, প্রথমে এক্ষেত্রে একটি আইন করতে হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মধ্যে কাকে উদ্যোগটি নিতে হবে?

আসলে দুটো সংস্থাকেই যৌথভাবে উদ্যোগটি নিতে হবে। সুকুক যেহেতু ক্যাপিটাল মার্কেট ইনস্ট্রুমেন্ট, সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখতিয়ারে পড়ে না, সেজন্য প্রাথমিকভাবে বিএসইকেই ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে অবশ্যই কাজটি করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে। সব বিশেষজ্ঞকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কি মালয়েশিয়ার মডেল অনুসরণ করতে পারে?

সুকুকের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার কৃতিত্ব বেশি। বিশ্ব সুকুক বাজারে ৭০ শতাংশ সুকুক বন্ড আসে মালয়েশিয়া থেকে। সেখানে কোম্পানির সুকুক যেমন আছে, তেমনি সভরেন সুকুকও আছে। উভয় দিক থেকে মালয়েশিয়া এক নম্বর দেশ। হ্যাঁ, আমরা মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারি। এক্ষেত্রেও বিপুলভাবে পার্থক্য থাকবে, তবে কনসেপচুয়াল ফ্রেমওয়ার্ক আমরা মালয়েশিয়া থেকে নিতে পারি।

ইসলামী ফিন্যান্সের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা খুব একটা এগোতে পারিনি। এক্ষেত্রে বাধাটা কী?

বাধাটা আমি বলব যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি। প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করতে চাই, এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি একটি ইসলামী ব্যাংকিং আইন করে যান। ইসলামিক সিকিউরিটিজ আইন করে যান ইসলামী ফিন্যান্স উন্নয়নের জন্য। কল্পনা করুন, ২৫ শতাংশ বাজার ইসলামী ব্যাংকিংয়ের। কাজেই ঐতিহাসিক সুযোগ মিস করা সমীচীন হবে না।

গতানুগতিক শেয়ারবাজারের অবস্থাই ভালো নয়। সেখানে নানা কারসাজি হয়, স্বচ্ছতার ঘাটতির কথা শোনা যায়। সেখানে সুকুকের মতো ইসলামী বন্ড চালু করে কি সুফল পাওয়া যাবে?

বিষয়টি আন্তঃসম্পর্কিত। আর্থিক বাজার উন্নয়নের ক্ষেত্রেও আমরা তলানিতে আছি। শেয়ারবাজারে ফটকাবাজি হচ্ছে, কারসাজি করছে। কিছু দুর্বৃত্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঠকাচ্ছে। এগুলো আসলে ঠিক করার দায়িত্ব সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের। আমাদের আইন আছে। তা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। প্রয়োগেই হচ্ছে সমস্যা। শক্ত হাতে আইন প্রয়োগ করতে হবে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রোফাইল পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অধিকাংশই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। তারা তাদের সঞ্চয় স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ করছে। আশা করছে যে তারা একটা ডিভিডেন্ড আয় সৃষ্টি করতে পারবে, যা দিয়ে তারা চলবে। এটা তো একটি জনকল্যাণের বিষয়। কাজেই নিশ্চিত করতে হবে, যাতে স্টক মার্কেট ভালোভাবে পরিচালিত হয়। বর্তমান অবস্থায় স্টক মার্কেট চলতে থাকলে সুকুক চালু করলেও তাতে খুব একটা সুফল মিলবে না। সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান এসেছেন। আশা করি, তার নেতৃত্বে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানপূর্বক শেয়ারবাজার আরো এগিয়ে যাবে।

কোন প্রকল্পগুলোর বিপরীতে সুকুক ছাড়তে পারবে আর কোনগুলোর বিপরীতে পারবে না, এটি কে নির্ধারণ করবে?

প্রথমত, অ্যাসেটটি হারাম হতে পারবে না। আমার মনে হয় না, একটি সেতু হারাম। কাজেই সেটির বিপরীতে সুকুক চালু হতে পারে। যেমন একটি করপোরেট বন্ড, যেটি দিয়ে ওষুধ তৈরির প্লান্ট তৈরি হবে। সেটি হালাল, যতক্ষণ তা অ্যালকোহল তৈরি না করছে। আমাদের এ ব্যাপারে তালিকা তৈরি করা দরকার যে কোন অ্যাসেট সুকুকের জন্য ব্যবহার করতে পারব আর কোনটি পারব না। তবে সমস্যা হলো, আমরা আবারো বিদ্যমান অ্যাসেট ব্যবহার করে মনিটাইজিং করছি, এটি আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নে সাহায্য করছে না। আমাদের সুকুককে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার জন্য ব্যবহার করতে হবে, বিদ্যমান ঋণকে মনিটাইজিং করার জন্য নয়।

জাকাত ও ওয়াকফ ব্যবস্থাপনাটা কীভাবে করলে দরিদ্র মানুষের আরো উপকার হতে পারে বলে মনে করেন?

২০০৮-০৯-এর দিকে রহিম আফরোজ গৌণ তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে জাকাতের সম্ভাবনা কত, সেটি গবেষণা করার জন্য আমাকে কমিশন করেছিল। ওই গবেষণায় আমি দেখিয়েছি বাংলাদেশে জাকাত যদি ঠিকভাবে সংগ্রহ করা হয়, তা দিয়ে সরকারের ৩০ শতাংশ উন্নয়ন কর্মসূচি অর্থায়ন করা সম্ভব। সরকারের বাজেটারি চাপ কমে যাবে এবং এটি হয়ে উঠবে অর্থায়নের বিকল্প উৎস। জাকাত ব্যবস্থাপনার জন্য বর্তমানে জাকাত বোর্ড একটি পুরোপুরি মন্ত্রণালয় হতে পারে। এখন এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন। এটিকে আরো কার্যকর করতে হবে, জনবল বাড়াতে হবে এবং গবেষণা করতে হবে। বাংলাদেশে এখনো বেঞ্চমার্ক স্টাডি হয়নি, যেটি দিয়ে খানা জরিপ করা যায় কত শতাংশ লোক জাকাত প্রদানের যোগ্য এবং আসলে কত শতাংশ লোক জাকাত দেয়। এ কাজগুলো করার জন্য একটি কাঠামোর উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কাজটি আমাদের শুরু করা দরকার। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের (মোগল আমলের বাংলা অঞ্চল) ওয়াকফ প্রতিষ্ঠার একটা সমৃদ্ধ ইতিহাস ছিল এবং এখনো তা বজায় আছে। শিক্ষা খাতে ওয়াকফর তাত্পর্যপূর্ণ অবদান বিদ্যমান। দেশের আট হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত ওয়াকফ সম্পত্তি। ওয়াকফ সম্পত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি মসজিদ ধর্মীয়র পাশাপাশি সেক্যুলার শিক্ষা প্রদান করছে। এভাবে সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ওয়াকফর বৃহত্তর পরিধি ও উপযোগিতা আছে। দেশের বিভাগভিত্তিক ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোর বণ্টন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেশির ভাগই ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০০ একর আয়তনের পুরোটাই ওয়াকফ সম্পত্তি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯০ শতাংশেরই আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রায় ২২০টি ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন রয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, ডিইউ অ্যালামনাই অ্যাসোশিয়েশন ও সরকার বিপুল স্কলারশিপ প্রদান করে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আর্থিক কষ্টের অনেকটাই লাঘব হচ্ছে। ওয়াকফ প্রতিষ্ঠাকে অতিরিক্ত কাজ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়, যা ইসলামের পাঁচ মূলনীতি মূল্যবোধকে ধারণ করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য আজকে ওয়াকফ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ অনুমোদন ওয়াকফকে গিফট অর্থনীতির একটি প্রকৃত উপকরণে (ইনস্ট্রুমেন্টে) রূপান্তর করবে।

ইসলামী ফিন্যান্সের সম্ভাবনাকে আরো কাজে লাগাতে আপনার পরামর্শ কী থাকবে?

প্রথমত, একটি ইসলামী ব্যাংকিং আইন করতে হবে। ইসলামিক ক্যাপিটাল মার্কেট আইন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনেক কাজ এখানে হয়ে গেছে। এখনই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক ব্যাংকিং ও ফিন্যান্স প্রোগ্রাম চালু করা দরকার। এ ধরনের প্রোগ্রাম মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চালু করা হয়েছে। আমাদের দক্ষ জনবলের ঘাটতি আছে। আমাদের ইসলামী ব্যাংকিং যারা করছেন, তাদের স্পিরিট আছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ জ্ঞান নেই। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। নীতিনৈতিকতার মতো সামাজিক পুঁজির (Social capital) উন্নয়ন ঘটাতে হবে। মানুষ ভালোকে ভালো বলা আর মন্দকে মন্দ বলার সৎ সাহস হারিয়ে ফেলেছে। এটাকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

সূত্র: বনিক বার্তা