বিশেষ প্রতিবেদক: টানা দরপতনে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে দেশের পুঁজিবাজার। বর্তমান বাজারে আস্থা সঙ্কট প্রকট আকারে থাকায় তারল্য সংকটে হাহাকার করছে। টানা ১২ কার্যদিবস দরপতনে বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চিয়তায় রয়েছে। ফলে নির্বাচনী বছর পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই মুহুর্তে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করতে না পারলে ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীদের ভাগ্য বিড়াম্বিত হবে।

তাছাড়া পুঁজিবাজার ইস্যুতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও বাজার স্থিতিশীল হচ্ছে না। খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মহিত বলেছেন, বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেট গঠন করা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য। কিন্তু এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি। পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ বাস্তবায়িত করা হয়েছে।

তবুও মার্কেটের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। যেহেতু মার্কেটের যারা বড় প্লেয়ার রয়েছেন তাদের ওপর বাজারের গতিশীলতা নির্ভর করে। তাই তাদেরকে নিয়ে আসন্ন বাজেটের পরে অর্থমন্ত্রী বসবেন। তাদের সঙ্গে নিয়ে মার্কেটে গতি ফেরাতে করণীয় কাজগুলো সরকারের পক্ষ থেকে করা হবে বলে জানান তিনি।

কিন্তু সরকারের নীতি নির্ধারকরা নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও পুঁজিবাজার স্থিতিশীল হচ্ছে না। ফলে দু:চিন্তা কাটছে না সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। কারন একটানা ১২ কার্যদিবস দরপতন কোন স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের লক্ষণ নয়। এ অবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা রয়েছেন সাইডলাইনে।

তেমনি পুঁজিবাজার ইস্যুতে তুলকালাম, দায়িত্বশীলদের সমন্বয়হীনতা ইত্যাদি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে দ্বিগুণ। তেমনি পুঁজিবাজারের এ পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিও বিপাকে পড়েছে। তাই পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ফেরানোই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, ২০১০ অর্থবছরের শেষ এবং ২০১১ অর্থবছরের শুরু থেকেই পুঁজিবাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যাপক দরপতন হয়। মধ্যখানে কিছুদিন ভালো অবস্থানে থাকলেও বর্তমানে আবার চলছে অস্থিরতা। ক্রমান্বয়ে কমছে লেনদেনের পরিমাণ। লেনদেন বর্তমান চার শত কোটি টাকার নিচে চলে আসছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লেনদেন কম হওয়ার নেপথ্যে তারল্য সংকট প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ তারল্য সংকট কাটাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা প্রধান উৎস হলেও বাজারে তাদের তেমন অবদান লক্ষ্য করা যায়নি। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বলেছেন ভিন্ন কথা তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভয়ের কারনে তারা বিনিয়োগ করতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক নমনীয় হলে পুঁজিবাজারে তাদের বিনিয়োগ করতে কোন সমস্যা নেই।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী প্রভাষক হোসাইন আলী কাজী মতে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ফান্ড থাকার পরও নানা কারণে তারা বিনিয়োগ করতে পারছে না। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংক নমনীয় হলে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবো।

এ বিষয়ে ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএ সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেক বলেন, পুঁজিবাজারে সংকটের মূলে ব্যাংক খাত। শেয়ারবাজার ইস্যুতে ব্যাংকের এক্সপোজার গণনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে জটিল অবস্থা তৈরি করে রেখেছে, তাতে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

তিনি বলেন, গত ফেব্রুয়ারীর টানা দরপতনের সময় অর্থমন্ত্রী সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শেয়ারবাজার এক্সপোজার গণনায় পরিবর্তন আনার বিষয়ে গভর্নর ফজলে কবীর যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার একটাও বাস্তবায়িত হয়নি। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সংকটাবস্থায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবিকে আমানত বা ঋণ গ্রহণে একক গ্রাহকসীমা-সংক্রান্ত বিধান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। সেটিও করা হয়নি। বস্তুত ব্যাংকের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিআরআর কমানোসহ নানা নীতি-সহায়তা দিলেও শেয়ারবাজারের জন্য কিছু করেনি। এটাও বাজার সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খামখেয়ালীর কারণে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পথে বসতে চলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারণেই শেয়ারবাজারের এমন সংকট চলছে বলে তাঁরা মনে করেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তাব্যক্তিদের এদিকে কোন ভ্রুক্ষোভ নেই।

তাঁরা অভিযোগ করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্ণর ব্যাংকিং বিষয়ে পেশাধারী ব্যক্তিত্ব নন। তাঁর আশে-পাশে যারা রয়েছেন, তারা সবাই শেয়ারবাজার বিরোধী মনোভাবের কর্মকর্তা। সে কারণে অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রতিশ্রুতি দিলেও তিনি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। তাঁরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখনো সময় আছে। অন্যথায় শেয়ারবাজার তছনছের সব দায়-দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংককেই নিতে হবে।

এ সময় বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে সেসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে; সেগুলো সমাধান করতে হবে। বিশেষ করে এক্সপোজারের সমস্যা। এছাড়া পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে কস্ট প্রাইসে এক্সপোজার বিবেচনা, একই বিনিয়োগ দৈত গণনা, বন্ডে বিনিয়োগকে এক্সপোজারের বাইরে দেখা।

বাজারের বর্তমান অবস্থা এবং সরকারি পদক্ষেপের ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. এম বাকী খলিলী জানান, ব্যবস্থাপনাটাই এখন হ-য-ব-র-ল। সরকারের পক্ষ থেকে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানামুখী তৎপরতার কারনে বাজার স্থিতিশীল হচ্ছে না। আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ইস্যুতে পুঁজিবাজারে নমনীয় হতে হবে। তা না হলে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবো।

এ ব্যাপারে সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকলেও এসব বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যাওয়ার কোনোই অর্থ হয়না। এখানে সরকারের সমন্বয়ের অভাব আছে, যেমনটি আছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির মধ্যে। সরকারের কাছে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এই পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ বিশেষ করে মন্ত্রিপরিষদ ও জনপ্রশাসনের কার্যক্রম হাস্যকর। বাজারকে স্বাভাবিক করতে সমন্বয় জরুরি।

তিনি আরো বলেন, পুঁজিবাজারের ব্যাপারে একটা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হয়। আর এটা যাতে করতে না পারে সে জন্যই বিএসইসি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তারা সে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে চরম আস্থার সঙ্কট, যার কারণেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বা মার্কেট মেকাররা বাজারে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। তারা বিনিয়োগ খোয়াতে চান না।
তিনি বলেন, দু-একটা জিনিস দিয়ে এই বাজারের ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

শুধু স্পন্সর ডিরেক্টরদের দিয়ে বাজারের উন্নয়ন সম্ভব হবে না। বাজার ঊর্ধ্বমুখী হবে ঠিকই। কিন্তু তা বেশিক্ষণ ধরে রাখা যাবে না। এ জন্য আইসিবির মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বাজারে আনতে হবে। তাদের বিনিয়োগ আবার বাজারে আনতে হবে। তারা এখন চরম ভয়ে আছে। সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা তারা বাজারে বিনিয়োগ করে খোয়াতে চায় না। তাই বাজার স্থিতিশীল করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন তিনি।