স্বল্প মূলধনি কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচার জন্য পৃথক মার্কেট (ট্রেডিং প্লাটফর্ম) তৈরি করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এখন শুধু চালু করার বাকি। তবে আগামী ১২ মে এই প্লাটফর্মটির উদ্বোধন হতে পারে বলে জানিয়েছে ডিএসইর একটি সূত্র। এদিকে এটিকে জনপ্রিয় করতে ডিএসইর পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাব গ্রহণ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর চূড়ান্ত করার আগে জনমত যাচাই করতে খুব শিগগিরই দৈনিক পত্রিকা, বিএসইসির ওয়েবসাইট ও ঢাকা এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। কমিশনের ৬৪২তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডিএসই সূত্র জানা গেছে, চলতি বছরের ১৭ ও ১৯ জুলাই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফার বাই স্মল ক্যাপিটাল কোম্পানিজ), ২০১৬ রুলের কিছু বিষয় সংশোধনীর জন্য বিএসইসিতে প্রস্তাব দেয় ডিএসই। পরে এই প্রস্তাবের যৌক্তিকতা তুলে ধরে কমিশনে প্রেজেন্টেশনও দেওয়া হয়। ডিএসইসির প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও এই বাজারে লেনদেন করতে পারবে। তবে এক হাওলা হতে হবে কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা। তাদের যুক্তি ছিলো যদি এই মার্কেট শুধুমাত্র বড়ো বিনিয়োগকারী বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর জন্য রাখা হয়, তাহলে যে উদ্দেশ্যে মার্কেট তৈরি করা হচ্ছে সেটি হবে না।

কারণ এখানে শেয়ারের তেমন হাত বদল হবে না। অন্যটি হলো মার্কেট ম্যাকার তুলে দেওয়া। একটি ছোটো কোম্পানির জন্য নিয়মিত প্রান্তিক প্রতিবেদন তৈরি করা কঠিন ও ব্যয় বহুল। এতে করে কোম্পানির খরচ বেড়ে যাবে। ফলে তারা সামনে এগোতে পারবে না। এ জন্য কর্পোরেট গভর্ন্যান্সে শিথিল করে দেওয়ার জন্য আবেদন করে ডিএসই। এছাড়া প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) আনা কোম্পানির তুলনায় ছোটো কোম্পানিগুলোর প্রোসপেক্টাসে তথ্য কম রাখার আবেদন করে ডিএসই।

এ বিষয়ে ডিএসই ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএএম মাজেদুর রহমান বলেন, শুনেছি (কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফার বাই স্মল ক্যাপিটাল কোম্পানিজ) আইনে কিছু সংশোধনী এনেছে। এখনো চিঠি হাতে পায়নি। চিঠি হাতে পাওয়ার পর এই উদ্বোধনের দিনক্ষণ ঠিক হবে। তবে যত দ্রুত সম্ভব নতুন এই প্লাটফর্ম উদ্বোধন করা হবে। এটি চালু করার জন্য ডিএসই প্রস্তুত বলে জানান তিনি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্টক এক্সচেঞ্জে সেকেন্ডারি মার্কেট নামে স্বল্প মূলধনি কোম্পানির প্লাটফর্ম চালু রয়েছে। দেশে এ ধরনের বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের কাছ থেকে ধারণাপত্র চায় বিএসইসি। ধারণাপত্রে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এ প্লাটফর্মকে ‘জুনিয়র মার্কেট’ হিসেবে নামকরণের প্রস্তাব করেছিলো। আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) একে বলছে ‘অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেট’।

এর বাইরে এ ধরনের প্লাটফর্মকে ‘এসএমই বোর্ড’ হিসেবেও অভিহিত করার প্রস্তাব করে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ।স্বল্প মূলধনির সংজ্ঞায় কমিশন বলছে, পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণের ভিত্তিতে স্বল্প মূলধনি কোম্পানির সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হবে। ৩০ কোটি টাকার কম পরিশোধিত মূলধনি কোম্পানিকে স্বল্প মূলধনি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সঙ্গে আনুষঙ্গিক কয়েকটি উপাদানও যোগ করা হবে।

এই বাজারে কোম্পানির সচরাচর লেনদেনযোগ্য (ফ্রি-ফ্লোট) শেয়ার সংখ্যা কম এবং ঝুঁকি বেশি থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য সংশ্লিষ্ট শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ ছিলো না। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বড়ো বিনিয়োগকারীরা এ বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ নিতে পারবে বলে সিদ্ধান্ত ছিলো বিএসইসির। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ উন্মুক্ত ছিলো।

এ ধরনের আলাদা বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠলে প্রচলিত ব্যবস্থায় যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারছে না, তাদের জন্য একটি সুযোগ তৈরি হবে। এটি হবে এক ধরনের প্রি-লিস্টিং ব্যবস্থা। ছোটো ছোটো কোম্পানি এ বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে যখন একটা পর্যায়ে আসবে এবং তখন মূল বাজারে তালিকাভুক্তির শর্ত পূরণ করতে পারবে।

স্বল্প মূলধনি বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলো যাতে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে, এমন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের সিএসই পর্ষদও স্বল্প মূলধনি কোম্পানিগুলোর জন্য আলাদা ব্যবস্থা গঠনের প্রস্তাব দেয়। যদিও পুঁজিবাজারে স্বল্প মূলধনি কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধিতে ২০১১ সাল থেকেই সংশ্লিষ্ট কোম্পানির জন্য আলাদা বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়। তবে সে সময় প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইর আলাদা বোর্ড গঠনে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকায় আলাদা বাজার ব্যবস্থা গঠনের বিষয়টি আর এগোয়নি। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ডিএসইর ট্রেডিং সিস্টেম আধুনিকীকরণ করায় আলাদা বাজার গড়ে ওঠার বাধা দূর হয়।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে ন্যূনতম ৩০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন না হলে কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে না। পরিশোধিত মূলধনের এ শর্তের কারণে দেশের অধিকাংশ কোম্পানিই পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে না। এসব কোম্পানি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাচ্ছে। এখন আলাদা মার্কেট হলে বাজারের বাইরে থাকা ছোটো মূলধনের কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হয়ে পুঁজিবাজারে লেনদেনে অংশগ্রহণ করতে পারবে। ফলে অধিক সংখ্যক কোম্পানির তালিকাভুক্তির ফলে বাজারে শেয়ার সরবরাহ বাড়বে।