করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি। জীবন-জীবিকার সংকট। কোটি কোটি মানুষের চাকরি হারানোর ভয়। ক্ষুধা-দারিদ্র্য নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে এক ধরনের হাহাকার। আয়ের পথ সংকুচিত কিন্তু ব্যয়ের খাত প্রশস্ত। অর্থাৎ টাকা নেই, তবুও খরচ করতে হবে। এমন প্রেক্ষাপটে আসছে ২০২০-২১ অর্থবছরের নতুন বাজেট। হতে পারে এটি স্মরণকালের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের বাজেট। সেটা সরকার কতটা বুঝতে পারছে জানি না। কারণ আয়ের পথ বন্ধ হলেও ব্যয়ের সব দরজা খোলা।

করোনা পরিস্থিতিতে আগামী বাজেট কেমন হওয়া উচিত- এমন প্রশ্নে যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে এসব কথা বলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। আসন্ন বাজেটের খাতওয়ারি অগ্রাধিকার, অর্থের জোগান, ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা প্রভাব ও করণীয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা আলাপ করেন এবং নানা পরামর্শ দেন তিনি।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বাজেটের একটি বাস্তব রূপরেখা দাঁড় করাতে হবে। বিশেষ করে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রানীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর লক্ষ্যমাত্রা যেন বাস্তবসম্মত হয়। সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির রূপরেখা হতে হবে বাস্তবের নিরিখে। অবাস্তব বা অলীক স্বপ্ন দেখিয়ে লাভ নেই। যা অতীতে দেখেছি।

জাহিদ হোসেন বলেন, একটি হতদরিদ্র পরিবারের কর্মসূচি হতে পারে এবারের বাজেটের পথনির্দেশিকা। পরিবারটি বেঁচে থাকার মৌলিক কয়েকটি উপকরণ ছাড়া কিছুই কিনবে না। সে পরিবারের অভিধানে অপচয় বলতে কোনো শব্দ থাকবে না। এক পয়সা খরচে হাজারবার ভাববে। ঠিক তেমনি আগামী অর্থবছরের জন্য গতানুগতিক বাজেট করলে প্রয়োজন মেটানো যাবে না। বাজেটে দুটো বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। টাকা কোথা থেকে আসবে, আর যাবে কোথায়। বাজেটে অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। সেখানে বর্তমান প্রয়োজন এবং অদূর ভবিষ্যতে কী প্রয়োজন হতে পারে, সেটা বিবেচনায় আনতে হবে। করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। তাই আগামী বাজেটে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া উচিত স্বাস্থ্য খাতে। এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এসবেও প্রাধান্য দিতে হবে। অন্যদিকে বাজেটের অর্থায়নও গতানুগতিক ধারায় হবে না। কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায় হবে না, বিদেশি সহায়তা বেশি নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। যদি বাজেটের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় এবং অর্থায়নও সঠিক হয়, তবে বাজেট ঘাটতি ৭-৮ শতাংশ হলেও ক্ষতি নেই।

তিনি বলেন, গতানুগতিক ধারা থেকে বের হতে না পারলে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। আর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে না এলে অর্থনীতিও সচল হবে না। যারা মনে করেন করোনাকে সঙ্গে নিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। করোনা সংক্রমণ রোধ করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যসেবা দুই ভাগে বিভক্ত। গণস্বাস্থ্য সেবা এবং ব্যক্তিক স্বাস্থ্যসেবা। উভয়ের উন্নয়নে বরাদ্দ রাখতে হবে। বরাদ্দের দিক থেকে স্বাস্থ্য এখনও জিডিপির ১ শতাংশের কম। আবার উন্নয়নে যা বরাদ্দ দেয়া হয়, তা পুরোটা খরচ করা সম্ভব হয় না। তাহলে স্বাস্থ্য বিভাগকে ঢেলে সাজানো হোক। যোগ্য ও অভিজ্ঞদের নিয়ে বিভাগটি পরিচালিত হতে পারে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাগুলো এবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে করোনার প্রাদুর্ভাব। আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) চূড়ান্ত হয়ে গেছে। সেখানে দেখা গেছে, উন্নয়ন বরাদ্দের দিক থেকে স্বাস্থ্য খাত এখনও নিচের দিকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি আশ্চর্যজনক। অথচ করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বেশি বরাদ্দ পাওয়ার কথা ছিল। এছাড়া আগামী অর্থবছরে করোনা প্রতিরোধে ভ্যাকসিন বের হলে তা কেনার জন্য বড় বরাদ্দ রাখা দরকার। কারণ অন্তত ১৭ কোটি ভ্যাকসিন তো লাগবে। প্রত্যেক নাগরিক এটি পাওয়ার অধিকার রাখেন। সে ক্ষেত্রে খরচের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

বেকারত্বের বিষয়ে জ্যেষ্ঠ এ অর্থনীতিবিদ বলেন, সামাজিক সুরক্ষায় আগের চেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। করোনার কারণে লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে গেছেন। তাদের জীবন চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে চার কোটি দরিদ্র মানুষ আছেন। অতিদরিদ্র দেড় থেকে দুই কোটি। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দৈনিক ১ ডলার ৯০ সেন্ট থেকে ৩ ডলার ৮০ সেন্টের মধ্যে আয় করা কর্মজীবী মানুষ ৫৫ শতাংশ। তারা এখন ঝুঁকির মধ্যে আছেন। তাদের অনেকেই নতুনভাবে গরিব হয়েছেন, অনেকেই গরিব হওয়ার আশঙ্কায় আছেন। এ মানুষগুলোর সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন। আগামী বাজেটে তাদের কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ কর্মসূচি থাকা উচিত। কারণ ক্ষুধার ঝুঁকির সম্মুখীন হলে তারা করোনার ঝুঁকিকে ভয় পাবেন না। অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা ও সুবিধাভোগী বাড়াতে হবে। এটি খুব দ্রুত করতে হবে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ, প্রকৃত সুবিধাভোগী দ্রুত চিহ্নিত করতে না পারলে সংকট বাড়বে। সরকারি সুরক্ষা দেয়া না হলে তারা করোনা পরিস্থিতি উপেক্ষা করেই রাস্তায় বেরিয়ে যাবেন, যা আরও ঝুঁকি বাড়াবে।

খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেছে, ওই সময় পর্যন্ত খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকবে। তবু বলা যাবে না যে খাদ্য সংকট হবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই কেউ খাদ্য আমদানি করতে চাইলেও নানা কারণে সমস্যায় পড়বে। পরিবহন ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি আরও কড়াকড়ি হবে। যেসব দেশ থেকে আমদানি করা হবে, সেসব দেশে হয়তো করোনা পরিস্থিতি সন্তোষজনক না-ও থাকতে পারে। এসব বিবেচনায় খাদ্য সংকটের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই আমাদের অভ্যন্তরীণ খাদ্যনিরাপত্তার দিকে বেশি জোর দিতে হবে। কৃষককে বীজ, সার, যন্ত্রপাতি প্রভৃতির ব্যবস্থা করতে হবে। ভর্তুকির টাকা যেন সঠিকভাবে দেয়া হয়। এসব কাজ করতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা দরকার। আবার পণ্য উৎপাদনের পর তা বাজারজাত করা এবং ন্যায্য দামের নিশ্চয়তাও থাকতে হবে। তা না হলে কৃষক ফসল ফলানোয় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। কৃষকদের সহজে কৃষিঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

বাজেটের অর্থসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য শিগগিরই স্বাভাবিক হবে না, এটা বোঝা যাচ্ছে। তাই আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ও খুব বেশি হবে না। এছাড়া করোনার কারণে আগামী অর্থবছরে এমনিতেই নানা ধরনের কর ছাড় দিতে হবে। তাই রাজস্ব ঘাটতি সীমিত রাখতে কর ফাঁকি প্রতিরোধে বেশি মনোযোগী হতে হবে। বাজেটের অর্থ জোগান দিতে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা- বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগী হতে হবে। কারণ এসব সংস্থা করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অনেক বড় তহবিল গঠন করেছে। তবে দাতা সংস্থাগুলোর করোনা তহবিল পেতে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে বাংলাদেশকে। সব দেশই এসব তহবিল থেকে অর্থ পেতে চাইবে। তাই করোনা প্রতিরোধ এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দ্রুত কিছু বাস্তবসম্মত কর্মসূচি ও প্রকল্প বানাতে হবে। কারণ অর্থ অনুমোদনের আগে সংস্থাগুলো জানতে চাইবে, করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এছাড়া নিয়মিত তহবিল থেকে অর্থ পাওয়া অব্যাহত রাখতে হবে। তারপরও বাজেট ঘাটতি হবে। এ মুহূর্তে বড় অংকের বাজেট ঘাটতি হলেও কিছু করার নেই। বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় দেশের অভ্যন্তরের ব্যাংক থেকে টাকা পাওয়া কঠিন হবে। কারণ ব্যাংক সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের জোগান দিচ্ছে।

বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক এ মুখ্য অর্থনীতিবিদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি দ্রুতই আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। রফতানি খাতে তৈরি পোশাকনির্ভরতা কমাতে হবে। রফতানি পণ্য বহুমুখী করতে হবে। তবে শঙ্কা হচ্ছে, দেশে করোনা পরিস্থিতি সন্তোষজনক না হলে বিদেশি ক্রেতারা বাণিজ্য করতে আগ্রহ দেখাবেন না। তাই অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য বহুমুখী ও বিস্তৃত করার সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে। যেখানে বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে। এমন প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে হবে। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলগঠনের পরিকল্পনা আছে। যেগুলোর মধ্যে অগ্রগতি বেশি; সেগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত। সব মেগা প্রকল্পে অগ্রাধিকার না দিয়ে যেখানে বরাদ্দ বাড়ালে দ্রুত কাজ শেষ হবে, ফল পাওয়া যাবে তাড়াতাড়ি, বাজেটে শুধু সেগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত। পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের কাজ অনেক এগিয়েছে। দুটি প্রকল্পে বরাদ্দ দিয়ে দ্রুত শেষ করা উচিত। কিন্তু এডিপিতে দেখলাম, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিশাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এটা যুক্তিসঙ্গত নয়। সর্বোপরি বাজেটের লক্ষ্য বাস্তবায়নযোগ্য হওয়া উচিত। অর্জন অযোগ্য লক্ষ্য কখনও বাস্তবায়ন হয়নি এবং হবেও না। এছাড়া উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে অদক্ষতা ও লালফিতার দৌরাত্ম্য ছিল সব সময়। যা দেশকে অনেক খানি পিছিয়ে দিয়েছে। মনে রাখতে হবে করোনার এ সময়ে সীমার মধ্যে অসীম কাজ করতে হবে। তাই আসন্ন প্রস্তাবিত বাজেট বরাদ্দে কোনোভাবে ভুল করা যাবে না।