কুষ্টিয়া ও যশোরে নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজেটিভ ধরা পড়া ৩৪ জনের মধ্যে ৩০ জনই করোনা আক্রান্ত নন। বৃহস্পতিবার রাতে পুন:পরীক্ষার পর আইইডিসিআর এমন প্রতিবেদন দিয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা: এএসএম মারুফ হাসান। তবে তিনি আগের পজেটিভ রিপোর্ট নিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল সমালোচনা ও বিতর্ক। অনেকে এ ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবি তুলছেন। গোটা বিষয়টি নিয়ে বিব্রত চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগও।

চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর গ্রামের একজন কিডনি রোগী গত ৬ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকাতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হন। বিষয়টি জানার পর হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের ১১ জন চিকিৎসক নার্সসহ ২১ জনের নমুনা সংগ্রহ করে গত ২২ এপ্রিল যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে পাঠানো হয়। পরদিন ২৩ এপ্রিল সেই ২১ জনের মধ্যে ৬ জনের করোনা পজেটিভ রির্পোট আসে।

একই ভাবে গত ২৬ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগ ৫১ জনের নমুনা সংগ্রহ করে কুষ্টিয়া মেডিকেলের পিসিআর ল্যাব পাঠান। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ ২৮ এপ্রিল তাদের প্রতিবেদন দেন। সেই প্রতিবেদনে চুয়াডাঙ্গার দুই জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও একটি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৭ চিকিৎসকসহ ২৮ জনের করোনা পজেটিভ রিপোর্ট আসে। একদিনে এত সংখ্যক করোনা আক্রান্ত রোগী ধরা পড়ার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে জেলাজুড়ে।

স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাড়িসহ আশপাশের এলাকাও লকডাউন করা হয়। একই সাথে আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৭ চিকিৎসকসহ ১৭ জন আক্রান্তের খবরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্ষ লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সেখানে থাকা রোগীদেরকেও স্থানান্তর করা হয় সদর হাসপাতালে।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: শামীম কবির জানান, ২৮ জনের করোনা পজেটিভ রিপোর্ট আসার ওই দিন রাত ১০টার দিকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ আরেকটি রিপোর্ট দেন। সেখানে ওই ২৮ জনের রিপোর্ট অমীমাংসিত বলে উল্লেখ করা হয়। একই সাথে জানানো হয় অমীমাংসিত রিপোর্ট নমুনাগুলো ঢাকা আইডিসিআরে পাঠানো হবে। তারা পুনরায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিবেন।

চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা: এএসএম মারুফ হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনে ৬ জন ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের প্রতিবেদনে করোনা পজেটিভ রিপোর্ট আসা ২৮ জনসহ মোট ৩৪ জনের নমুনা পুনরায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আইইডিসিআর চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়। দেখা গেছে যশোর থেকে পজেটিভ রিপোর্ট দেওয়া ৬ জনের মধ্যে ৩ জন ও কুষ্টিয়া থেকে পজেটিভ রিপোর্ট দেওয়া ২৮ জনের মধ্যে ২৭ জনই করোনা আক্রান্ত নন।

কুষ্টিয়া মেডিকেলে নমুনা পরীক্ষায় পজেটিভ আসা একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই সংকটময় মুুহূর্তে আমরা যাদের উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল সেই স্বাস্থ্য বিভাগের এমন তামাশা কখনো প্রত্যাশা করিনা আমরা।

কুষ্টিয়া মেডিকেলে নমুনা পরীক্ষায় পজেটিভ আসা আলমডাঙ্গা উপজেলার আরেকজন জানান, পজেটিভ আসার পর আমরা গোটা পরিবার মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলাম। সামাজিকভাবেও আমাদেরকে নানাভাবে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়েছে।

সুজনের চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাহাবুল ইসলাম সেলিম জানান,করোনা নিয়ে দুই বারে দুই রকম তথ্য আসার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোন ভাবেই ছোট করে ভাবার সুযোগ নেই। এখনই এসব বিষয়গুলো নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে করোনা পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে চলে যেতে পারে।

কুষ্টিয়া স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান (সিভিল সার্জন) ডা: এইচ এম আনোয়ারুল ইসলামের সাথে শুক্রবার দুপুরে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, আমরা বিব্রত।

করোনা পরীক্ষা নিরীক্ষায় ল্যাবের দায়িত্বরতদের কোন ত্রুুটি বা পরীক্ষার যন্ত্রপাতিতে কোন সমস্যা ছিল কিনা এমন প্রশ্নে তিনি জানান, সমস্ত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে আইইডিসিআর থেকে উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল এসেছে। তারা বিষয়গুলো দেখভাল করছে।

সূত্রঃ যমুনা টিিভি