আমানতকারীদের স্বার্থে সচেষ্ট গভর্নর: নিঃস্ব হলেন শেয়ারহোল্ডাররা
- আপডেট: ১২:০০:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫
- / ১০৩৯৯ বার দেখা হয়েছে
অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জর্জরিত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক বসিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় গভর্নর আশ্বস্ত করলেও বিনিয়োগকারীদের নিরাশ করেছেন। গতকাল বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটির মূল্য এখন নেগেটিভ। তাই শেয়ারের ভ্যালু জিরো বিবেচনা করা হবে। কাউকেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না।
ব্যাংকগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। পর্যায়ক্রমে এসব ব্যাংককে একীভূত করে একটি ইসলামী ব্যাংকে রূপ দেওয়া হবে। এতে সময় লাগবে প্রায় দুই বছর।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, এই পাঁচ ব্যাংকের মোট শেয়ারের প্রায় ১৭১ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোট শেয়ারের ৪৬ দশমিক ৩২ শতাংশ; গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৩১ দশমিক ১৪ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৩২ দশমিক ৯৪ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংকের ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২১ দশমিক ৬৯ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আমানতকারীর সুরক্ষা বিষয়ে গভর্নর জনসাধারণকে আশ্বস্ত করে বলেন, ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতকারীরা ১০০ শতাংশ টাকা তুলতে পারবেন। বড় অংকের আমানতের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে উত্তোলনের সুযোগ থাকবে। এর বিস্তারিত পরবর্তী সময়ে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। এ সময় শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের বোর্ড বাতিল হলেও গ্রাহকসেবায় কোনো বিঘ্ন ঘটবে না বলে জানিয়েছেন তিনি। ব্যাংকগুলোর পেমেন্ট, রেমিট্যান্স ও এলসিসহ সব ধরনের কার্যক্রম আগের মতোই চলবে।
জানা গেছে, একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকে ৭৫ লাখ আমানতকারীর বর্তমান জমা আছে এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে এক লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এক লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বা ৭৬ শতাংশ এখন খেলাপি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক্সিম ছাড়া পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে চারটিই ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ এস আলম গ্রুপের মালিকানায়। আর এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারও ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যমতে, আলোচিত পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ার দর অভিহিত মূল্যের (ফেস ভ্যালুর) নিচে অবস্থান করছে। গতকাল পাঁচটি ব্যাংক লেনদেনে অংশগ্রহণ করে। এ সময় তিনটি ব্যাংকের শেয়ার দর হারিয়েছে। বাকি দুটিতে দর অপরিবর্তিত ছিল। বাজারে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দাম ১ টাকা ৯০ পয়সা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দাম ১ টাকা ৭০ পয়সা, ইউনিয়ন ব্যাংকের শেয়ারের দাম দেড় টাকা, এক্সিম ব্যাংক এবং এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দাম ৩ টাকায় অবস্থান করছে। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য অংশীজন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে কাজ করছে। সাধারণ বিনয়োগকারীরা এসব ব্যাংকের শেয়ার কিনে তো কোনো অপরাধ করেননি। আমানতকারীদের স্বার্থ দেখার পাশাপাশি বিনয়োগকারীদের স্বার্থ দেখাও জরুরি।
এ প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সচিব এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশাসক নিয়োগ করেছে। এখনো একীভূত হয়নি। সমস্য রয়েছে বলেই ব্যাংকগুলোর বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। এসব ব্যাংকের সম্পদের (অ্যাসেট) থেকে দায় (লায়াব্যালিটি) বেশি রয়েছে। তবে সরকারের দিক নির্দেশনার প্রয়োজন আছে। শেয়ারের বাজার দর যাই হোক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শেয়ারের বিষয়ে একটা সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে হবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সরকারের সিদ্ধান্ত কি হয় দেখতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম গণমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য যে ঘোষণা হয়েছে, তা সংবাদ সম্মেলন থেকে বলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা পাইনি। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বিএসইসি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফিসিয়াল নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে।
জানা গেছে, চলতি বছর জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন, ছয়টি ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনার পর পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো ব্যাংক যদি একীভূত না হওয়ার জন্য যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারে, তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব ব্যাংক যৌক্তিকতা দেখাতে সক্ষম হবে না বলেও তখন তিনি মন্তব্য করেছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণের লক্ষ্যে ইতিপূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সম্পদের মূল্যায়ন করেছে। এতে সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংকের (এসআইবিএল) ২৩ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বা ৬২ দশমিক ৩০ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অপর চারটি ব্যাংকের মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৬ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ৮০ শতাংশ খেলাপি; ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংকের ৫৮ হাজার ১৮২ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ খেলাপি; গ্লোবাল ইসলামি ব্যাংকের ১৩ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা বা ৯৫ শতাংশ খেলাপি এবং এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ১০১ কোটি টাকা বা ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
ঢাকা/এসএইচ



































