শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়াত্ত্ব কোম্পানি ইস্টার্ন কেবলসের চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ১৯৭০ সালে ৩৭ দশমিক ৩৯ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠে । কোম্পানিটির বছরে ইলেকট্রিক কেব্ল উৎপাদনের ক্ষমতা সাড়ে চার হাজার টন। এই কোম্পানি ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত তিন অর্থবছরে শতকোটি টাকার বেশি পণ্য বিক্রি করেছে। কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উৎপাদন ও বিক্রি এক লাফে অর্ধেকের বেশি কমে যায়।

আর এটি সর্বশেষ মুনাফা করেছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে, তাও ১৭ লাখ টাকা। পরের দুই বছরে লোকসান দিয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে সাড়ে চার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। ইস্টার্ন কেবলসের ২০১৯-২০ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ৬.৪৬ টাকার মতো বড় লোকসান হয়েছে।

কিন্তু তারপরেও আর্থিক হিসাবে রয়ে গেছে নানা অনিয়ম। যার মাধ্যমে কোম্পানির প্রকৃত লোকসানের পরিমাণ আড়াল করা হয়েছে। কোম্পানিটির ২০১৯-২০ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষায় নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ব্যবসায় মন্দার মধ্যে থাকলেও ইস্টার্ন কেবলসের শেয়ার দর আকাশচুম্বি। দূর্বল কোম্পানিটির শেয়ার দর বুধবার দাড়িঁয়েছে ১৪০.১০ টাকায়। এই অস্বাভাবিক দরের পেছনে রয়েছে ফ্রি ফ্লোট শেয়ারের পরিমাণ কম ও কারসাজি।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ অনুযায়ি ইস্টার্ন কেবলসের ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ কোটি ৪২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৪৭ টাকা আয়কর সঞ্চিতি গঠন করা দরকার। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ মাত্র ৩৪ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫৬ টাকার গঠন করেছে। এর মাধ্যমে ওই অর্থবছরে ৩ কোটি ৮ লাখ ১৯ হাজার ৮৯১ টাকার নিট লোকসান কম দেখানো হয়েছে। একইসঙ্গে শেয়ারপ্রতি ১.১৭ টাকা কম লোকসান দেখানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক হিসাব মান (আইএএস)-১২ অনুযায়ি, ইস্টার্ন কেবলস কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে ডেফার্ড ট্যাক্স গণনা করেনি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

কোম্পানি কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে ক্যাপিটাল ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস (ব্যবহার উপযোগী করার আগের অবস্থান) হিসেবে ৪৭ লাখ ৮০ হাজার ৮৮৮ টাকার সম্পদ দেখিয়ে আসছে। কিন্তু এই সম্পদকে দীর্ঘদিন অন্য হিসাবে স্থানান্তর না করার মাধ্যমে ইমপেয়ারম্যান্টের (বাজার দর কমে গেছে) মাধ্যমে লোকসান হওয়ার ইঙ্গিত দেয় বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক। তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এই লোকসানের কোন প্রভাব আর্থিক হিসাবে দেখায়নি।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের কাছে ১ কোটি ৩১ লাখ ৭৪ হাজার ৬০০ টাকা পাওনা দেখিয়ে আসছে ইস্টার্ন কেবলস কর্তৃপক্ষ। যা আদায় নিয়ে শঙ্কা তৈরী হয়েছে। তারপরেও কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কোন সঞ্চিতি গঠন করেনি। এর মাধ্যমে নিট লোকসান ও শেয়ারপ্রতি লোকসান কমিয়ে দেখানো হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য পাওনা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৯৯০ টাকা দেখিয়ে আসছে। এর বিপরীতেও কোন সঞ্চিতি গঠন করা হয়নি।

এদিকে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পার্টির কাছে দীর্ঘদিন ধরে পরে থাকা অর্থ আদায়ে চিঠি দিলেও তা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক। কিন্তু ওই অর্থবাবদ আর্থিক হিসাবে ‘বেড ডেবট’ হিসেবে সঞ্চিতি গঠন করা হয়নি। এর মাধ্যমে কিছু ব্যয় কম দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

গ্রাচ্যুইটি হিসেবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ১০ কোটি ৬৮ লাখ ৮৫ হাজার ৯৪৫ টাকার দায় দেখিয়েছে। কিন্তু কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের হিসাব অনুযায়ি ২১ কোটি ৩৫ লাখ ৭ হাজার ২০ টাকার ফান্ড গঠনের দরকার। এ হিসাবে ১০ কোটি ৬৬ লাখ ২১ হাজার ৭৫ টাকার সঞ্চিতি ঘাটতি রয়েছে। যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে চার্জ বা হিসাব করা দরকার। কিন্তু তা না করার মাধ্যমে নিট লোকসান ও শেয়ারপ্রতি লোকসান কমিয়ে দেখানো হয়েছে।

পুঁজিবাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো লোকসান দিতে দিতে প্রতিষ্ঠানের শ্বেতহস্তীতে পরিণত হওয়ার ঘটনা এদেশে নতুন কোনো খবর নয়। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা বন্ধের নজিরও ভূরি ভূরি। উল্টোদিকে লোকসানি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পর লাভজনক হয়ে ওঠার অনেক দৃষ্টান্তও রয়েছে।

সরকারের পরিচালনাধীন একদা লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোও কেন একসময় লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, কীভাবে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের পাহাড় বাড়তে থাকে সেসব নিয়েও নানা সময়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা এই সংকট সমাধানে নানা পরামর্শ দিয়েছেন, সংকট কাটিয়ে উঠতে নানা সময়ে সরকার নানা উদ্যোগও নিয়েছে, হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকিও দেওয়া হয়েছে। কখনো কখনো রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ নিয়ে মাঠ গরম হয়েছে। সবই হয়েছে। কিন্তু জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সম্পদের অপচয় রোধ করা যায়নি; দেশের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের যথাযথ বিকাশ নিশ্চিত করা যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বিপুল লোকসানের পেছনে বড় কারণ অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা এবং অনিয়ম ও দুর্নীতি। অদক্ষ আমলাদের দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসান গুনছে। এজন্য সরকারের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন অনেক অর্থনীতিবিদ।

তারা বলে থাকেন, বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে লোকসান কমবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ভালোভাবে পরিচালিত হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। কিন্তু এই আলোচনায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে আমলাতন্ত্র ও অসাধু ব্যবসায়ী শ্রেণির যোগসাজশের অশুভ চক্রের কথা পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। একই কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের নানা আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি থেকে অলিখিত দায়মুক্তি পেয়ে থাকেন এই সংকটের জন্য দায়ীরা।

গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের বড় কারণ কয়েকটি। এর মধ্যে প্রথম হলো অদক্ষতা। এসব প্রতিষ্ঠান আমলা দিয়ে পরিচালনা করা হয়, যারা ব্যবসা পরিচালনার মতো যোগ্য নয়। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে সরকারের।

সরকারের শেয়ার রয়েছে এমন যেসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর সবই মুনাফা করছে। ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে লোকসান করছে শতভাগ সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত কোম্পানিগুলো। সরকার পরিচালিত বিভিন্ন কোম্পানি, সংস্থা বা করপোরেশনে দুর্নীতিও রয়েছে, যেখান থেকে বের হতে পারছে না।

তিনি বলেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলো সময়ের প্রয়োজনে পণ্য উৎপাদনে যে ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, সরকারি কোম্পানিগুলো তা পারছে না। পণ্য বিপণনেও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর তুলনায় বহু পেছনে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো। এসব কারণেই দিন দিন লোকসান বাড়ছে।

সরকারের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সরকার বেসরকারিকরণ বন্ধ রেখেছে। আমি মনে করি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া দরকার। এতে সরকারের লোকসান কমবে। প্রতিষ্ঠানগুলো ভালোভাবে পরিচালিত হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here