বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স লিমিটেড যাত্রা করে ১৯৯৪ সালে। কোম্পানিটি রানী মার্কা নামে ঢেউটিন বাজারজাত করে। কোম্পানিটির প্রথম সিজিএল ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। দ্বিতীয় সিজিএল ইউনিট উৎপাদনে যায় ২০০২ সালে আর ২০০৫ সালে শুরু হয় সিআরএম ইউনিটের উৎপাদন।

২০১৩ সালে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স লিমিটেড। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সঙ্গে শেয়ারপ্রতি ১২ টাকা প্রিমিয়ামে বাজার থেকে ২২০ কোটি টাকার মূলধন উত্তোলন করে কোম্পানিটি। মূলত নতুন এনওএফ প্লান্ট স্থাপন ও ব্যাংকঋণ পরিশোধের জন্য পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করেছিল কোম্পানিটি।

কোম্পানিটির তালিকাভুক্তির সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) চিঠি দিয়ে আইপিও অনুমোদন না দেয়ার অনুরোধও করেছিলেন। তা সত্ত্বেও কমিশন কোম্পানিটির আইপিও অনুমোদন করে। অ্যাপোলো ইস্পাতের পারফরম্যান্সের অধোগতি শুরু মূলত ২০১৬ সালের শেষের দিকে।
ডিএসইকে দেয়া তথ্যানুসারে, ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জিংক পট (যেখানে গ্যালভানাইজিং করা হয়) ভেঙে যাওয়ার কারণে কোম্পানিটির সিজিএল-২ ইউনিটের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৭-১৮ হিসাব বছর থেকেই কোম্পানিটির বিক্রি ও মুনাফা ক্রমনিম্নমুখী। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে ৩৮৬ কোটি টাকা বিক্রির বিপরীতে মুনাফা হয়েছে মাত্র ২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত লোকসানে ছিল কোম্পানিটি। অবশ্য এর পর থেকে কোম্পানিটির বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন আর প্রকাশ করা হচ্ছে না। ফলে কোম্পানিটির সর্বশেষ আর্থিক তথ্য সম্পর্কেও অন্ধকারে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

অ্যাপোলো ইস্পাতের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির ৭০ কোটি টাকা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও ২৩৫ কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি ঋণ রয়েছে। তাছাড়া ৮১ কোটি টাকার ওভারড্রাফটও রয়েছে তাদের। অ্যাপোলো ইস্পাতকে ঋণ দেয়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে যমুনা ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, আইএফআইসি, মার্কেন্টাইল, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি), এনসিসি ও এসআইবিএল। আর ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, জিএসপি ফাইন্যান্স, ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, মাইডাস ও ইউনিয়ন ক্যাপিটাল।

অ্যাপোলো ইস্পাতের সার্বিক এ দুরবস্থার কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা দীন মোহাম্মদের মৃত্যুর পর তার ছেলে মোহাম্মদ শোয়েব এবং দুই মেয়ে মেহেরুন হক ও ইভানা ফাহমিদা মোহাম্মদ চাইছেন যেকোনোভাবেই হোক ঋণের দায় থেকে মুক্তি পেতে। অ্যাপোলো ইস্পাত ঋণখেলাপি হয়ে যাওয়ার কারণে সিআইবি প্রতিবেদন নেতিবাচক আসায় ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের পদ হারিয়েছেন তারা দুজন। তারা দুজনই কোম্পানিটির দুরবস্থার জন্য তাদের পিতার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে কতিপয় কর্মকর্তার লুটপাট ও দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন।

তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই দীন মোহাম্মদ ডিমেনশিয়ায় (স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া) ভুগছিলেন। আর এর সুযোগ নিয়ে কোম্পানিটির কয়েকজন কর্মকর্তা অর্থ লোপাট করেছেন। এর মধ্যে চলতি বছরের মার্চে কোম্পানিটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) রাজীব হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, জালিয়াতি, অনিয়ম ও প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগে রাজধানীর তেঁজগাও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করে অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ। এ মামলায় তাকে গ্রেফতারও করে পুলিশ।

দীন মোহাম্মদের ছেলে ও অ্যাপোলো ইস্পাতের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, অ্যাপোলো ইস্পাতের অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেভাবেই হোক আমরা এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চাই। রুগ্ণ এ কোম্পানির জন্য গ্রুপের অন্য কোম্পানিগুলো সমস্যায় পড়ুক সেটা চাই না। এরই মধ্যে আমরা ঋণদাতা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি। তাদের কাছে আমরা ঋণের সুদ মওকুফ করে আমাদের কিছুটা ছাড় দেয়ার দাবি জানিয়েছি। যদি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড় দেয় তাহলে কোম্পানির অবস্থা পরিবর্তন করা যাবে। বর্তমানে প্রতি মাসে ৯ কোটি টাকা ঋণের কিস্তি গুনতে হয়। অথচ যদি কোম্পানিটি পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতায় উৎপাদনে যায় তাহলে মাসে সাড়ে ৫ কোটি টাকা মুনাফা আসবে। এর পুরোটা দিয়ে দিলেও ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে না। তাই এক্ষেত্রে আমরা ছাড় চাইছি। তাছাড়া যদি কেউ কোম্পানিটির সব দায়দেনাসহ কিনে নিতে চায় তাহলে আমরা তাতেও রাজি আছি। যেভাবেই হোক ঋণের দায় থেকে আমরা মুক্ত হতে চাইছি।

জানতে চাইলে দীন মোহাম্মদের ছোট মেয়ে ও অ্যাপোলো ইস্পাতের পরিচালক ইভানা ফাহমিদা মোহাম্মদ বলেন, আমার বাবা বড় ভাইকে দেখাশোনার গুরুদায়িত্ব দিয়ে গেছেন। আমাকেও বলেছেন তাকে সহায়তা করার জন্য। বাবা মারা গেছেন বেশি দিন হয়নি। এখনো পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন হয়নি। তবে এ নিয়ে কোনো জটিলতা নেই। ইসলামী শরিয়াহ অনুসারেই সবকিছু বণ্টন করা হবে। ঋণের দায়দেনা থেকে মুক্তি পেতে উপযুক্ত ক্রেতা পেলে অ্যাপোলো ইস্পাত বিক্রি করে দিতে চাই। তালিকাভুক্ত কোম্পানি হওয়ার কারণে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব বিধিবিধান মেনেই বিক্রি করা।

জানা গেছে, ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজনে ব্যর্থ হওয়ার কারণে গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে স্টক এক্সচেঞ্জে বি ক্যাটাগরি থেকে জেড ক্যাটাগরিতে অবনমন হয় কোম্পানিটির। ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর এজিএম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও হাইকোর্টের কাছ থেকে আদেশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত এজিএম আয়োজন স্থগিত করেছে কোম্পানিটি।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্সের উদ্যোক্তা-পরিচালকদের কাছে কোম্পানিটির ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। সিকিউরিটিজ আইনানুসারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পর্ষদে এর উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক। এক্ষেত্রে শেয়ারধারণে ব্যর্থ হলে কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠন করার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে কমিশনের। সম্প্রতি এমন বেশ কয়েকটি কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনও করেছে বিএসইসি। শেয়ারধারণের বিষয়ে অ্যাপোলো ইস্পাতের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে কমিশনের। এক্ষেত্রে কমিশনের কাছে শেয়ারধারণে কোম্পানিটি কিছুটা সময় চেয়েছে।

সূত্র: বনিকবার্তা