বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে এবার ৩৩০ কোটি টাকার আয়কর না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে মোট ৩৩০ কোটি ৭৯ লাখ ৪৪ হাজার ৫৯৫ টাকা পাবে সরকার। এর আগে ৩৫ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতর।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বকেয়া আয়করের পরিমাণ ৫৫ কোটি ১৮ লাখ ৮০ হাজার ৮০ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৩ কোটি ৯৫ লাখ ৫৯ হাজার ৯৩৪ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৬৩ হাজার ২৩৮ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ৫১ কোটি ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৫৫২ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪৭ কোটি ১১ লাখ আট হাজার ৯৫৭ টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫৫ কোটি ৩৮ লাখ ১২ হাজার ৯২৭ টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪৭ কোটি পাঁচ লাখ ৩০ হাজার ৫০৪ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০ কোটি ৪৫ লাখ ৮৩ হাজার ৩০৫ টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ১১ কোটি দুই লাখ ৬৪ হাজার ১৫৩ টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১০ কোটি ৭৮ লাখ ৫৪ হাজার ৩২ টাকা এবং ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৩ টাকার আয়কর বাকি আছে। সবমিলে গত ১১ বছরে কোম্পানিটির পরিশোধযোগ্য বকেয়া আয়করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩০ কোটি ৭৯ লাখ ৪৪ হাজার ৫৯৫ টাকা।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আবিদা রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। তবে গত বুধবার (৮ জুন) বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কর্তৃক ডেল্টা লাইফে নিয়োগ দেওয়া নতুন প্রশাসক সুলতান-উল-আবেদিন মোল্লা আয়কর ফাঁকির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘বকেয়া আয়করের একটি চিঠি এনবিআর থেকে পাঠানো হয়েছে। এটি হাতে পেয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বকেয়া পরিশোধের অংশ হিসেবে এনবিআরকে দুই কোটি টাকা দিয়েছি। একই সঙ্গে বকেয়া পরিশোধের জন্য সময় চাওয়া হয়েছে। চলতি মাসের (জুন) শেষ সপ্তাহে এনবিআর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে। তারপর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করা হবে।’

গত ২৫ মে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট থেকে বকেয়া আয়কর পরিশোধের অনুরোধ জানিয়ে ডেল্টা লাইফের সিইও’র কাছে চিঠি দেন উপ-কর কমিশনার মো. আব্দুল বারী। এতে বলা হয়, ‘অত্র কার্যালয়ে রক্ষিত করদাতা কোম্পানির আয়কর নথি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, গত ১১ বছরে ৩৩০ কোটি ৭৯ লাখ টাকার আয়কর বকেয়া রয়েছে। কোম্পানিকে গত ২ জুনের মধ্যে সমুদয় অর্থ পরিশোধের জন্য অনুরোধ করা হলো।’

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘বকেয়া দাবি পরিশোধ হয়ে থাকলে কিংবা আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে, সেসব তথ্য ও প্রমাণাদি যথাসময়ে প্রদানে আপনাকে বিশেষ অনুরোধ জানানো হলো। অন্যথায় বকেয়া দাবির বিষয়ে বৃহৎ করদাতা কোম্পানির কোনো আপত্তি নেই মর্মে বিবেচনা করা হবে। আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ সালের ১৩৭ ধারায় অনাদায়ী বকেয়া কর আহরণের ক্ষেত্রে অনধিক বকেয়ার সমপরিমাণ পর্যন্ত অর্থ জরিমানা হিসাবে আরোপের বিধান রয়েছে। এমতাবস্থায় নির্ধারিত সময়ে বকেয়া পরিশোধ না করলে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর বিধানসমূহের আলোকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।’

এদিকে, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ থাকায় এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ) ‘এম এস হাওলাদার ইউনূস অ্যান্ড কো.’ ও ‘এম এস ফেমাস অ্যান্ড আর’ নামের দুটি অডিট ফার্মকে নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) একটি ফার্মকে বিশেষ নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।

উল্লেখ্য, এর আগে এনবিআরের ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতর ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রায় ৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকির তথ্য পায়। এরপর বিমা কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ভ্যাট আইনে মামলা দায়ের করা হয়।

ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগের ভিত্তিতে ভ্যাট গোয়েন্দার সহকারী পরিচালক সায়মা পারভীনের নেতৃত্বে একটি টিম বিমা কোম্পানিটির ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট পাঁচ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন তদন্ত করে। তদন্তে দেখা যায়, ডেল্টা লাইফ স্বাস্থ্য বিমার ওপর ৪০ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩ টাকার ভ্যাট পরিশোধ করেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত ভ্যাটের পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ২১ লাখ ৩৭ হাজার ৪১১ টাকা। অর্থাৎ বিমার প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আর তাতে অপরিশোধিত ভ্যাট বাবদ নয় কোটি ৮০ লাখ ৮২ হাজার ৩৩৯ টাকার ফাঁকি ধরা পড়ে। আইন অনুসারে নির্ধারিত সময়ে ভ্যাট না দেওয়ায় মাসভিত্তিক ২ শতাংশ হারে ১১ কোটি ৩০ লাখ ৪০ হাজার ৭৭৮ টাকা সুদ দিতে হবে ডেল্টা লাইফকে।

তদন্ত অনুসারে সিএ ফার্মের রিপোর্ট মোতাবেক উৎসে ভ্যাট ছয় কোটি ৩৪ লাখ সাত হাজার ৮০৩ টাকা পরিশোধ করেছে ডেল্টা লাইফ। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত ভ্যাটের পরিমাণ ছিল ১১ কোটি তিন লাখ ১৩ হাজার ২৪৯ টাকা। অর্থাৎ চার কোটি ৬৯ লাখ পাঁচ হাজার ৪৪৬ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছি প্রতিষ্ঠানটি। আইন অনুসারে সুদসহ পাঁচ কোটি ৫৭ লাখ ৭৫ হাজার ১৬৯ টাকা দিতে হবে ডেল্টা লাইফকে।

এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার বিপরীতে এক কোটি ৪৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৮০ টাকা পরিশোধ করেছে। অথচ ডেল্টা লাইফের এ খাতে প্রকৃত ভ্যাটের পরিমাণ ছিল তিন কোটি ২০ লাখ ৫৫ হাজার ১০১ টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি এক কোটি ৭৪ লাখ ৪০ হাজার ১২০ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। আইন অনুসারে মাসভিত্তিক ২ শতাংশ হারে সুদসহ দুই কোটি চার লাখ ৪৬ হাজার ৮৮১ টাকার ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে ডেল্টা লাইফকে।

তদন্ত মেয়াদে সবমিলে প্রতিষ্ঠানটির অপরিশোধিত ভ্যাটের পরিমাণ ১৬ কোটি ২৪ লাখ ২৭ হাজার ৯০৫ টাকা এবং সুদবাবদ ১৮ কোটি ৯২ লাখ ৬২ হাজার ৮২৮ টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির মোট সুদসহ অপরিশোধিত ভ্যাটের পরিমাণ ৩৫ কোটি ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৭৩৩ টাকা। সূত্র: ঢাকা পোস্ট