উপজেলা ও মফস্বল এলাকায় শিক্ষিত তরুণদের কর এজেন্ট বা কর প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে করের আওতায় বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি শারমীন রিনভী। বৃহস্পতিবার (২৫ মার্চ) এনবিআরের সঙ্গে ২০২১-২০২২ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় সংগঠনের পক্ষে তিনি এমন দাবি উপস্থাপন করেন।

শারমীন রিনভী বলেন, উপজেলা বা মফস্বল এলাকায় এনবিআরের নিজস্ব কোনো অফিস নেই। দেশে এখন ওই সব এলাকায় কর দানে সক্ষম ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেক্ষেত্রে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো কর এজেন্ট বা কর প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসনের আওতায় এলাকার শিক্ষিত তরুণ কর বা ভ্যাট সংগ্রহ করবে। এতে একদিকে রাজস্বের আওতা বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে তরুণদের কর্মসংস্থানও হবে।

তিনি বলেন, আমরা ডিজিটাল এনবিআরের স্বপ্ন দেখি। এখনও করদাতারা আয়কর কিংবা ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে হয়রানির স্বীকার হচ্ছেন। এজন্য আয়কর ও ভ্যাট রিটার্ন কিংবা প্রত্যায়নপত্র ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার প্রস্তাব করছি। এর ফলে এনবিআর ও করদাতার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়ন কমে আসবে।

এনবিআরে পৃথক মানি লন্ডারিং ইউনিট স্থাপনের দাবি জানিয়ে ইআরএফ বলছে, বন্ড লাইসেন্সের অপব্যবহার কিংবা মিথ্যা ঘোষণায় বিদেশে অর্থপাচার হরহামেশাই চোখে পড়ছে। বর্তমানে দেশ থেকে বাণিজ্যনির্ভর অর্থপাচার বেশি হয়। ২০১৫ সালে মানি লন্ডারিং আইনে ক্ষমতা পাওয়ার পর এনবিআরের কর্মপরিসর কেবল রাজস্ব আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং বিদেশে যারা টাকা পাচার করছে তাদের সাজা দেওয়ার ক্ষমতাও পেয়েছে। এ কারণে আমাদের প্রস্তাব থাকবে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানি লন্ডারিং ইউনিট গড়ে তোলা ও লোকবল নিয়োগ দেওয়া।

ভার্চুয়াল সভায় ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলাম বলেন, করদাতাদের সুবিধার্থে করসেবা সহজীকরণের প্রস্তাব করছি। বর্তমানে কর সেবা প্রদানে যেসব সার্ভিস সেন্টার আছে, সেগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব সহকারে উন্নত সেবা দানে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। রাজস্ব বোর্ডের ওয়েবসাইট হালনাগাদ করার প্রস্তাব করছি। এতে অনেক হালনাগাদ তথ্য ও পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। একইসঙ্গে রাজস্ব বোর্ডের গবেষণা সেলটি আরো কার্যকর ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। অনেক করদাতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে। তাই রাজস্ব কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা না গেলে কর ফাঁকির পন্থাগুলো উদঘাটন করা কঠিন।

সভায় আইআরএফর সিনিয়র সদস্য দৌলত আকতার মালা বলেন, করযোগ্য ব্যক্তিদের করের আওতায় আনতে এনবিআর প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে। সরকারের অন্যান্য সংস্থাগুলোর (যেমন বিআরটিএ, বিআরটিসি, সিটি করপোরেশন ইত্যাদি) সঙ্গে তথ্য শেয়ারে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে। এতে অনেক গতি এসেছে। তবে এনবিআরের অভ্যন্তরেই আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগের সঙ্গে ইনটিগ্রেশন ও সমন্বয় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শুধু বাজেটকেন্দ্রিক সভা না করে, তিন মাস পরপর কর কাঠামোর প্রয়োগে সমস্যা চিহ্নিত করা যেতে পারে। ঘরে ঘরে গিয়ে করদাতা শনাক্তকরণের পরিবর্তে বড় বড় খাতে যারা ব্যয় করেন, তাদের করের আওতায় আনা যায়। করদাতা সংগ্রহে সরকারের অন্যান্য মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

ইআরএফ সদস্য রিয়াদ হোসেন বলেন, অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা বিনিয়োগের বিদ্যমান সুবিধা নিয়ম মেনে কর প্রদানকারীদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনকারীরা উৎসাহ পাচ্ছেন। সরকারের নিয়ম মেনে একজন ব্যক্তি করদাতাকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়েছে। অথচ যিনি নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন বা অবৈধ পথে উপার্জন করেছেন, তার করহার ১০ শতাংশ। অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনের উৎস মুখ বন্ধ করতে শক্ত আইনি কাঠামো প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন (ভার্চুয়ালি) এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আপনারা বরাবর আমাদের সঙ্গে থেকে রাজস্ব আদায়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন। আমাদের লক্ষ্য রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও অটোমেশন ইত্যাদি অব্যাহত রাখা। আশা করছি করদাতারা এর সুফল পাবেন।

ভার্চুয়াল সভায় আরো বক্তব্য রাখেন সহ-সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দিন জসিম ও কোষাধ্যক্ষ রেজাউল হক কৌশিকসহ আরো অনেকে। সভায় যুক্ত ছিলেন এনবিআরের আয়কর নীতির সদস্য মো. আলমগীর হোসেন, সদস্য সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া, ভ্যাট নীতির সদস্য মো. মাসুদ সাদিকসহ বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিজনেসজার্নাল/এসএ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here