বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে একই হারে কর কমানো হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, এতে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়বে। এক্ষেত্রে বর্তমানে মুনাফার দিক থেকে এগিয়ে থাকা কোম্পানিগুলোই সুবিধা পাবে সবচেয়ে বেশি। সে হিসেবে এ প্রস্তাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ওষুধ খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। এছাড়া রেনাটা লিমিটেড, তিতাস গ্যাস, পাওয়ার গ্রিড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সুবিধা পাবে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সর্বশেষ সমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত কর-পূর্ব মুনাফাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে বিদ্যমান ২৫ শতাংশ করপোরেট কর ও প্রস্তাবিত সাড়ে ২২ শতাংশ করপোরেট করের পরিমাণ পর্যালোচনা করেছে বণিক বার্তা। এক্ষেত্রে করপোরেট কর কমার কারণে কী পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হতে পারে, সেটির একটি প্রক্ষেপণ তুলে ধরা রয়েছে। এক্ষেত্রে চলতি ২০২০-২১ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত হওয়ার পরই কর হ্রাসের প্রকৃত পরিমাণ জানা সম্ভব হবে। কর কমানোর ফলে অর্থ সাশ্রয়ের তালিকায় থাকা শীর্ষ ২০ কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ওষুধ খাতের চারটি কোম্পানি রয়েছে। এছাড়া সিমেন্ট ও ইস্পাত খাতের তিনটি করে, জ্বালানি খাতের দুটি কোম্পানি রয়েছে এ তালিকায়। করপোরেট কর কমানোর ফলে এ শীর্ষ ২০ কোম্পানির মোট ১৫৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা সাশ্রয় হবে।

আড়াই শতাংশ করপোরেট কর কমানোর কারণে সবচেয়ে বেশি সাড়ে ৪২ কোটি টাকা অর্থ সাশ্রয় হবে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের। ২০১৯-২০ হিসাব বছরে কোম্পানিটি ১ হাজার ৬৯৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা কর-পূর্ব মুনাফা করেছে। সে হিসাবে বিদ্যমান ২৫ শতাংশ করহার অনুসারে কোম্পানিটিকে প্রায় ৪২৫ কোটি টাকার কর দিতে হয়। প্রস্তাবিত সাড়ে ২২ শতাংশ হারে করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৮২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

জানতে চাইলে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের হিসাব ও অর্থ বিভাগের প্রধান মো. কবির রেজা গণমাধ্যমকে বলেন, করপোরেট কর কমানোর ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসেরই সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে। এমনকি অর্থ সাশ্রয়ের তালিকায় থাকা আমাদের পরের তিন কোম্পানির যে পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে তার পরিমাণও স্কয়ারের তুলনায় কম। এ অর্থ সাশ্রয়ের ফলে কোম্পানির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশের পরিমাণও আনুপাতিক হারে বাড়বে। পুঁজিবাজারেও কোম্পানির বাজার মূলধন বাড়ার পাশাপাশি মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) কমে আসবে। সব মিলিয়ে পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের জন্য কর কমানোর বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক হয়েছে বলে আমি মনে করি।

ওষুধ খাতের আরেক কোম্পানি রেনাটা লিমিটেডের কর সাশ্রয় হবে ১৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। কর সাশ্রয়ের শীর্ষ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কোম্পানিটি। ২০১৯-২০ হিসাব বছরে কোম্পানিটির কর-পূর্ব মুনাফা হয়েছে ৫৮৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। সে হিসাবে ২৫ শতাংশ হারে ১৪৭ কোটি এবং সাড়ে ২২ শতাংশ হারে ১৩২ কোটি টাকার কর প্রযোজ্য হয়।

কর কমার কারণে অর্থ সাশ্রয়ের শীর্ষ কোম্পানির তালিকায় তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত দুই কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনস কোম্পানি লিমিটেড ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড। এর মধ্যে তিতাস গ্যাসের কর সাশ্রয় হবে ১২ কোটি ৬১ লাখ টাকা আর পাওয়ার গ্রিডের কর সাশ্রয় হবে ১২ কোটি টাকা।

দেশের ওষুধ খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড কর কমার কারণে অর্থ সাশ্রয় হওয়া শীর্ষ কোম্পানির তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। ২০১৯-২০ হিসাব বছরে কোম্পানিটির ৪৬৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা কর-পূর্ব মুনাফা হয়েছে। সে হিসাবে বিদ্যমান ২৫ শতাংশ হারে করের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত সাড়ে ২২ শতাংশের ভিত্তিতে যা ১০৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সে হিসাবে কোম্পানিটির কর কমবে ১১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

বেক্সিমকো গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ও কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, করপোরেট কর কমানোর বিষয়টি অত্যন্ত ব্যবসাবান্ধব হয়েছে। এতে আগের তুলনায় কর প্রদানের হার বাড়বে। কর কমানোর ফলে কোম্পানির যে পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে তাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশের পরিমাণও বাড়বে। সব মিলিয়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বিনিয়োগকারী এবং পুঁজিবাজারের ওপর কর কমানোর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে জানান তিনি।

করপোরেট কর কমানোর কারণে অর্থ সাশ্রয়ের তালিকায় থাকা শীর্ষ কোম্পানির মধ্যে ম্যারিকো বাংলাদেশের ৮ কোটি ৯২ লাখ, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের ৭ কোটি, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের ৬ কোটি ৯১ লাখ, এমজেএলবিডির ৬ কোটি ৪৯ লাখ, বিএসআরএম লিমিটেডের ৫ কোটি ৮২ লাখ, একমি ল্যাবরেটরিজের ৪ কোটি ৯৪ লাখ, বিএসআরএম স্টিলের ৪ কোটি ৫৬ লাখ, সিঙ্গার বাংলাদেশের ২ কোটি ৭২ লাখ, বেক্সিমকো লিমিটেডের ২ কোটি, বসুন্ধরা পেপার মিলসের ১ কোটি ১২ লাখ, জিপিএইচ ইস্পাতের ৯৯ লাখ, প্রিমিয়ার সিমেন্টের ৮৫ লাখ, এপেক্স ফুটওয়ারের ৫৩ লাখ এবং হাইডেলবার্গ সিমেন্টের ৪৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হবে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির পাশাপাশি অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারও একই অনুপাতে কমানো হয়েছে। কর কমানোর কারণে ব্যবসার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব অবশ্যই পড়বে। কিন্তু তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সুশাসন পরিপালনের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। অন্যদিকে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই। তাই তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির তুলনায় করহার বেশি কমানো প্রয়োজন ছিল। এতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো উৎসাহিত হতো। ব্যবসায় নতুন করে বিনিয়োগ করা হবে কিংবা পুনর্বিনিয়োগ হবে, সে প্রত্যাশায় সরকার করপোরেট করহার কমিয়েছে। তাই আমি আশা করব কোম্পানিগুলো কর সুবিধাকে ব্যবসা সম্প্রসারণে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে।

করপোরেট কর কমার কারণে কোম্পানির অর্থ সাশ্রয় হওয়ার প্রভাবে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়ে যাবে। আর কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বাড়লে কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশের পরিমাণও বাড়বে। তাছাড়া নিট মুনাফা বাড়লে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয়ও (ইপিএস) বাড়বে। এতে কোম্পানির পিই রেশিও কমে আসবে, যা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের জন্য আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তুলবে। তবে করপোরেট কর কমার সুবিধা সেই কোম্পানি সবচেয়ে বেশি পাবে যে কোম্পানির কর-পূর্ব মুনাফার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

করপোরেট করা কমার কারণে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও পুঁজিবাজারের ওপর এর প্রভাবের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. শাকিল রিজভী গণমাধ্যমকে বলেন, এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুই ধরনের প্রভাব রয়েছে। প্রত্যক্ষ প্রভাবের মধ্যে রয়েছে এতে কোম্পানির ইপিএস ও লভ্যাংশের পরিমাণ বাড়বে। যার প্রভাবে শেয়ারদর বাড়বে। অন্যদিকে ইপিএস বাড়ার কারণে পিই রেশিও কমবে। পরোক্ষ প্রভাবের মধ্যে রয়েছে কোম্পানির অর্থ সাশ্রয় হলে সেটি ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যয় হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির জন্য সুফল বয়ে আনবে। তাছাড়া করহার কমানোর কারণে ভালো কোম্পানিগুলো আগের তুলনায় আরো বেশি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহী হবে। যা পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি গভীরতা বাড়াতে সহায়ক হবে। সূত্র:বণিকবার্তা

ঢাকা/এনইউ

আরও পড়ুন্: