করোনাবর্জ্যে পরিবেশ হুমকির আশঙ্কা

রাজধানীর মিরপুরে ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশের সড়কে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ব্যবহূত মাস্ক। হাসপাতালের সামনে একটি সাধারণ বর্জ্যের বাক্সেই ফেলা হয়েছে করোনা সুরক্ষার সরঞ্জাম। রাজধানীর নয়াপল্টনে ড্রেনে ভাসছে মাস্ক। এলিফ্যান্ট রোডের একটি গাছকেও বইতে হচ্ছে ব্যবহার শেষে মানুষের ফেলে দেওয়া মাস্কের বোঝা। বায়োসেফটিক্যাল ব্যাগে না ভরেই মেডিকেল বর্জ্য ফেলা হয়েছে কমলাপুরের রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালের বাইরের ডাস্টবিনে।

সব মিলিয়ে রাজধানীর এমন কোনো সড়ক পাওয়া এখন দায়, যেখানে মাস্ক, গ্লাভস, ফেসশিল্ড ইত্যাদি বর্জ্যের দেখা মিলবে না। এমনকি পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্টের (পিপিই) মতো সংবেদনশীল সুরক্ষা সামগ্রীও ফেলা হচ্ছে যেখানে-সেখানে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের গত মাসের একটি গবেষণা প্রতিবেদনমতে, সব মিলিয়ে প্রতিদিন এ ধরনের বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে ২৮২ দশমিক ৪৫ টন। যার পুরোটাই অপসারণ করা হচ্ছে গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে। এই গবেষণা অনুযায়ী, সুরক্ষা সামগ্রী বর্জ্যের মাত্র ৬ দশমিক ৬ ভাগ সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসছে।

তবে এ চিত্রকে পূর্ণাঙ্গ বলা কঠিন। কারণ, ঢাকায় শুধু হাসপাতাল নয়, কভিড-বর্জ্যের বড় একটি অংশ আসছে বাসাবাড়ি, শপিংমল বা বেসরকারি অফিস থেকে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বর্জ্য সাবধানে এবং নির্দিষ্ট উপায়ে নষ্ট না করলে তা সংক্রমণ বাড়াতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে সচেতন নন কেউ। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্যও নেই আলাদা গাইডলাইন বা প্রশিক্ষণ। এসব কারণে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়াও কঠিন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে করোনাভাইরাসে গতকাল রোববার পর্যন্ত সংক্রমিত হয়েছেন চার লাখ ৪৭ হাজার ৩৪১ জন। আইইডিসিআরের হিসাব বলছে, দেশের মোট আক্রান্ত রোগীর ৫৭ শতাংশই ঢাকা মহানগরের বাসিন্দা। আবার রোগীদের একটা বড় অংশই চিকিৎসা নিচ্ছেন বাসায় অবস্থান করে। এভাবে প্রতিদিনই রোগী ও নাগরিকদের ব্যবহূত কভিড সুরক্ষা সামগ্রী থেকে উৎপন্ন হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য, যা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে পড়ছে নানা স্থানে।

মেডিকেল বর্জ্যকে ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে ২০০৮ সালে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা করা হয়েছিল। যদিও তা এক যুগেও বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৮ সালের জাতীয় পরিবেশ নীতিতেও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সব বর্জ্যের উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে বলা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, মেডিকেল বর্জ্যগুলো অটোক্লেভস মেশিনের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করে তা বায়োহ্যাজার্ড ব্যাগে ভরে রাখার কথা। যদিও অধিকাংশ হাসপাতালই মেডিকেল বর্জ্য জীবাণুমুক্ত করে বায়োসেফটিক্যাল ব্যাগে ভরে রাখছে না। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘প্রিজম বাংলাদেশ’ হাসপাতালগুলো থেকে মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহে কাজ করে। তবে বাসাবাড়ির ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য সংগ্রহে পৃথক ব্যবস্থাপনা নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও র‌্যাবিস ইন এশিয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বেনজির আহমেদ বলেন, ১০ কোটি মানুষ যদি দিনে একটি করেও মাস্ক-গ্লাভস ব্যবহার করেন, তাহলে ১০ কোটি বর্জ্য হচ্ছে। এমনকি এটা এক কোটি হলেও বিশাল। জীবাণুবাহী এসব বর্জ্য ড্রেন, রাস্তা ও নদীতে পড়লে সংক্রমণ হবে না বলা যাবে না। তাই এসবের ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ ও প্রতিরোধ টিম করা উচিত। বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।

করোনাভাইরাস উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর শুধু এক মাসে মাস্ক-গ্লাভসসহ সংশ্নিষ্ট প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ টন। শুধু ঢাকায় উৎপাদন হয়েছে তিন হাজার ৭৬ টন, যার বড় একটি অংশ মাটি ও পানিতে মিশছে। সম্প্রতি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এসডোর জরিপ অনুযায়ী, করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ঢাকায় প্রতি মাসে সার্জিক্যাল মাস্ক থেকে ৪৪৭ টন, পলিথিন গ্লাভস থেকে ৬০২ টন, সার্জিক্যাল গ্লাভস থেকে এক হাজার ৩১৪ টন ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল থেকে ২৭০ টন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া ফেসশিল্ড, গগলস, পিপিই, সাধারণ মাস্ক থেকেও উল্লেখযোগ্য বর্জ্য তৈরি হচ্ছে।

এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, যথাযথভাবে নিস্কাশন করা না হলে, কোনো নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এগুলো থেকে মাটি, পানি, বায়ুসহ পরিবেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে ভয়াবহ দূষণ দেখা দেবে। কারণ, এসব বর্জ্য নানাভাবে খাদ্যচক্রে মিশছে।

এ বিষয়ে দ্রুত গাইডলাইন তৈরি এবং আক্রান্ত বাসা ও হাসপাতালের বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করতে নতুন পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেন এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার রহমান।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার সমকালকে বলেন, ৯০ শতাংশ মাস্ক সিনথেটিক, যা পলিথিনেরই আরেক রূপ। আর গ্লাভস প্লাস্টিকের। এসব পচতে ৪০০-৫০০ বছর সময় লাগে। প্রতিদিন ঢাকায় উৎপাদিত হয় প্রায় ২০০ টন মেডিকেল বর্জ্য, যার অধিকাংশই গ্লাভস ও মাস্ক। এদিকে, করোনাবর্জ্য সংগ্রহের পদ্ধতিও মেডিকেল ওয়েস্ট রুল-২০০৮-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। করোনাবর্জ্য নানা মাধ্যম হয়ে জলাশয়ে যাচ্ছে। কয়েক মাস আগে আমাদের এক গবেষণায় রাজধানীর লেক ও নদীতে মাছের পেটে সিনথেটিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। করোনা সুরক্ষা সামগ্রীর বর্জ্য ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা করা না গেলে বড় রকমের ক্ষতি হবে। গুলশানের দু-একটি বাড়িতে করোনা বর্জ্যের জন্য আলাদা ব্যাগ দিয়ে সিটি করপোরেশন দায়িত্ব শেষ করেছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন বাসায় করোনা সুরক্ষা সামগ্রীর বর্জ্য আলাদা রাখার ব্যবস্থা নেই। আলাদা রাখলেও সিটি করপোরেশন সব একসঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার বর্জ্যের জন্য আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে ডাম্পিং স্টেশন রয়েছে। বাড়ি থেকে আলাদা করে নেওয়া না গেলেও সব বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে আলাদা করা যেতে পারে। সেখানে মেডিকেল বর্জ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পোড়ানোর ব্যবস্থা করলে ক্ষতি কমবে।

গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে কভিড সুরক্ষা সামগ্রী থাকলে তা নেওয়া হবে না বলে গত ২৩ জুন ঘোষণা দিয়েছিলেন ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। একই ধরনের ঘোষণা এসেছিল ডিএসসিসি থেকেও। এসব বর্জ্য আলাদা রাখার জন্য ডিএনসিসি থেকে তিন লাখ পচনশীল পলিথিন ব্যাগ বিতরণ করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ থেকেও কিছু ব্যাগ বিতরণ করা হয়। করোনাবর্জ্য আলাদাভাবে দেওয়ার জন্য ওয়ার্ডের প্রতিটি মসজিদে কাউন্সিলরদের মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মাইকিং ও প্রচারপত্র বিতরণও করা হয়।

ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. বদরুল আমিন বলেন, নগরবাসীকে সচেতন করার চেষ্টা করছি; কিন্তু এখন ৫০ শতাংশ বাসিন্দাও আলাদাভাবে সংক্রামক বর্জ্য দিচ্ছে না।

ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর এম সাইদুর রহমান বলেন, চেষ্টা করছি সচেতনতা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর। পলিব্যাগ সংগ্রহের চেষ্টাও চলছে।

মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকারী প্রতিষ্ঠান প্রিজম বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার আনিসুর রহমান বলেন, হাসপাতালগুলোকে আমরা বারবার বলছি, আপনারা মেডিকেল বর্জ্য বায়োহ্যাজার্ড ব্যাগে ভরে রাখুন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ড্রামের মধ্যে ফেলা হয়।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিটি হাসপাতালে এই বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলতে বলা হচ্ছে। সিটি করপোরেশনকে বলা হয়েছে গৃহস্থালির বর্জ্য আলাদা করতে। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকেই এ সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে।