বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদকঃ চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের শুরুতে করোনার আঘাত কিছুটা সামাল দিতে সক্ষম হলেও দ্বিতীয় ধাক্কায় ফের সংকটে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। আমদানি-রপ্তানি থেকে শুরু করে ব্যক্তি ও সরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং রাজস্ব আয়ে করোনার বিরূপ প্রভাব এরইমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। আর ভোক্তা ব্যয়ের বড় মৌসুম রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে যে বাণিজ্য হয় তাও লকডাউনে বন্ধ রয়েছে। যার প্রভাব পড়বে জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে। এমনটাই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ৮৯৩ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুুলনায় দশমিক ১২ শতাংশ কম। তবে শুধু মার্চে বাংলাদেশ থেকে ৩০৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেশি। এর আগে বছরের প্রথম দুই মাসে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়। ২০২০ সালের শুরুতে চীন থেকে সারা বিশ্বে করোনা ছড়িয়ে পড়ার পর মার্চে তা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকেও আক্রান্ত করে। তখন একের পর তৈরি পোশাক খাতের পণ্য রপ্তানির আদেশ বাতিল হয়েছিল। সেই সঙ্গে নতুন অর্ডারও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবার এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চান রপ্তানিকারকরা। বহির্বিশ্বে থেকে কিছুটা রপ্তানি আদেশ আসায় থেরি পোষাক খাতের ব্যবসায়ীদের অনুরোধে লকডাউনে পোশাক কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

দেশের এই প্রধান রপ্তানি খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, তৈরি পোশাক খাত চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় রপ্তানি হারিয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় রপ্তানি হারিয়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি কমেছে ওভেন খাতে। এ খাতে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে রপ্তানি কমেছে ১৭ দশমকি ৬২ শতাংশ। তার মধ্যে শুধুমাত্র মার্চেই কমেছে ২৪ দশমিক ৭০ শতাংশ (২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায়)। একই সঙ্গে সংগঠনটি বলছে, ২০২০ সালের এপ্রিলের শেষ নাগাদ ১ হাজার ১৫০টি সদস্য প্রতিষ্ঠানে ৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারের কার্যাদেশ বাতিল ও স্থগিতের মতো ঘটনা ঘটেছে। তবে পরে ৯০ শতাংশ বাতিল প্রত্যাহার হয়েছে। কিন্তু মূল্যছাড় ও ডেফার্ড পেমেন্ট মেনে নিতে হয়েছে এই খাতের ব্যবসায়ীদের। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত ডিসেম্বরে ইউরোপে খুচরা বিক্রি কমেছে ২৮ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে কমেছে ১৬ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার প্রথম ধাক্কা শুরু হওয়ার পরও চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাস থেকে সংকট কিছুটা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছিল। যদিও রপ্তানি এখনো নেতিবাচক ধারায় রয়েছে, রয়েছে বিনিয়োগে স্থবিরতা। তবুও একটু একটু করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল থাকায় উন্নতি হচ্ছিল। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে। যে হারে সংক্রমণ বাড়ছে, শিগগিরই নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে অর্থনীতিতে ভয়াবহ ধস নেমে আসবে বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে অর্থনীতি খাদে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে, রপ্তানি এখনো নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এই অবস্থায় দেশের অর্থনীতি যতটা উদ্ধার করার গতি ছিল, এখন এই গতিও থমকে যাবে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যে প্রবৃদ্ধির আভাস দিয়েছে, তাও অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

এই অথনীতিবিদ বলেন, জিডিপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ভোক্তা ব্যয়। দেশে ভ্যাট আদায়ের চিত্র দেখলে এর আভাস পাওয়া যায়। চলতি অর্থবছরের শুরুতে ভ্যাট আদায়ের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হলেও কিছুটা গতি ছিল। এই সময়ে দেয়া লকডাউনে এর ওপর প্রভাব পড়বে। সব কিছু বন্ধ থাকলে ভোক্তা ব্যয় কমবে। এর প্রভাব পড়বে জিডিপিতে। এছাড়া এডিপি বাস্তবায়নের হার কমছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নেমে আসবে বলেও মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, করোনার প্রভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকাণ্ড ধীরগতি হয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়েছে সার্বিক ব্যয়ের ওপর। আর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে ধীরগতির কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হার কমছে প্রায় ২৫ শতাংশ। ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার এডিপির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গত বছর একই সময়ে ব্যয় করা হয় ৪৪ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এডিপিতেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাস্তবায়ন হার কমেছে ২৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, করোনার প্রথম ধাপের ধাক্কা থেকে উত্তরণ করছিল দেশের অর্থনীতি। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ে অর্থনীতির গতি কতটা ঠিক রাখা যাবে তা চিন্তা করতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে হলে আগে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এজন্য লকডাউন সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই লকডাইনে অতিদ্ররিদ্র মানুষ কীভাবে বাঁচবে তা চিন্তা করতে হবে। ডিজিটাল সিস্টেমে তাদের নগদ টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন বাজেটে মানুষকে বাঁচানোর জন্য ব্যয় বাড়াতে হবে বলেও মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, করোনায় বেড়েই চলেছে বাণিজ্য ঘাটতি। ১৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে গত অর্থবছর শেষ করেছিল বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের ৬ মাসে অর্থাৎ জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে তা কমে ৬৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমে এসেছিল। গত বছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ৮২২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে সেই ঘাটতি বেড়ে ৯৭৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারে ওঠে। সর্বশেষ জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে তা আরো বেড়ে ১ হাজার ১৭৯ কোটি ৫০ লাখ (১১ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন) ডলারে উঠেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১০ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ ৭ মাসে অর্থাৎ জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় বেড়েছিল ১ দশমিক ০২ শতাংশ। আর আমদানি কমেছিল দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি বেড়েছিল দশমিক ৪৪ শতাংশ। আমদানি ব্যয় কমেছিল ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতিও বাড়ছে। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এ খাতে ঘাটতি ছিল ১০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে তা বেড়ে ১৩৭ কোটি ডলারে ওঠে। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে তা আরো বেড়ে ১৭০ কোটি ৫০ লাখ ডলার হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ২১৮ কোটি ১০ লাখ ডলার।

এ বিষয়ে বিকেএমইএ’র সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, লকডাউনে কল-কারখানা বন্ধ করে দিলে স্থবির হয়ে যেত অর্থনীতি। তাই অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রধানমন্ত্রী কল-কারখানা চালু রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি পরিপালন করে কারখানা পরিচালনা করা হচ্ছে। মোট কথা হলো- আমদানি-রপ্তানি লকডাউনের আওতামুক্ত আছে। হয়তো পুরো অর্থনীতি সচল করা যাবে না, কিন্তু অর্থনীতির চাকা চলমান থাকবে বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত (জুলাই-মার্চ) ৯ মাসে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৯৯৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে কাস্টমস খাতে আদায় হয়েছে ৫৩ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এ খাতে আহরণ প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ, যা তিন বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া ভ্যাট খাতে আদায় হয়েছে ৬৭ হাজার ৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আয়কর খাতে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৮০৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা, প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ভ্যাট আদায়ের গতি কমে যাওয়া মানে হলো ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া। ভোক্তা ব্যয় কমলে এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক জিডিপিতে।

ঢাকা/আ.ই