করোনা পরিস্থিতিতে ভিড় এড়াতে ব্যাংকে যাওয়া কমিয়েছেন গ্রাহকরা। আর্থিক লেনদেনে আগের চেয়ে বাড়িয়েছেন অনলাইন নির্ভরতা। ফলে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারে আগের বছরের তুলনায় লেনদেনের সঙ্গে বেড়েছে গ্রাহক সংখ্যা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহক এখন ঘরে বসেই সব সেবা চান। মহামরির কারণে এ আগ্রহ আরও বেড়ে গেছে। গ্রাহক এখন ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রযুক্তির কল্যাণে প্রয়োজনীয় আর্থিক সেবা দিয়ে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো। গ্রাহক টানতে নেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোগ।

ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যখন-তখন যেকোনো জায়গা থেকে এক হিসাবের লেনদেন দেশের যেকোনো শাখায় সম্পন্ন করা যাচ্ছে। কম্পিউটার বা মুঠোফোনেই হিসাব পরিচালনা, টাকা পাঠানো, বিল পরিশোধ, অনলাইন কেনাকাটাসহ ব্যাংকের অনেক কাজই এখন করা যাচ্ছে ঘরে বসে। ফলে জীবনযাত্রাও হয়ে উঠছে অনেক সহজ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যাংক লেনদেন হয়েছে ৭৯ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ইন্টারনেট ব্যাংকিং বেড়েছে ২০ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এর আগে ২০১৯ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর সময়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যাংক লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬৫ লাখ ৮৮৪ হাজার কোটি টাকা। ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মধ্যে রয়েছে চেক ক্লিয়ারিং, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, ইন্টারন্যাশনাল কার্ড এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মতো উপাদান। 

ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে শুধু লেনদেন নয় গ্রাহক সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ই-সেবার আওতায় গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৩৩ জনে। যা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ছিল ২৪ লাখ ৭২ হাজার ১৫১ জন। সেই হিসাবে বছরের ব্যবধানে গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে ৭ লাখ ৭৩ হাজার ১৮২ জন বা ৩১ দশমিক ২৭ শতাংশ।

ইন্টারনেট ব্যাংকিং প্রসঙ্গে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী (সিইও) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, করোনার কারণে অনেক কিছুর পরিবর্তন এসেছে। মানুষ ব্যাংকের শাখায় শাখায় গিয়ে সেবা নেওয়ার চেয়ে ঘরে বা অফিসে বসে সেবা পেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যার কারণে আগের চেয়ে কার্ড ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার বাড়ছে।

তিনি বলেন, এখন খরচ কমানো এবং ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য বাধ্য হয়ে সবাই অটোমেশনে যাচ্ছে। আমরা এ খাতে কর্মীদের দক্ষতা বাড়াচ্ছি। সবকিছু ডিজিটাল পদ্ধতিতে আনার পরিকল্পনা করছি। এতে করে খরচ কমবে গ্রাহকের সেবার মানও বাড়বে।

এদিকে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে বেড়েছে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক লেনদেন হয়েছে আট হাজার ৪০০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। গত বছরের (২০১৯) একই সময়ে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। তথ্য বলছে, বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর মাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহক সর্বোচ্চ লেনদেন করেছেন। ২০২০-এর ডিসেম্বরে গ্রাহক ২৬ লাখ ২৬ হাজার বার লেনদেন করেছেন ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে। আগের বছরে (২০১৯) একই মাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ২৫ লাখ ৪২ হাজার বার লেনদেন হয়েছিল। বছরের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বেড়েছে দশমিক ৮৪ শতাংশ।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ডেবিট কার্ড ভিত্তিক লেনদেন বেড়েছে ১৬ দশমিক ০৮ শতাংশ, যার পরিমাণ ১৩ হাজার ৭৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক প্রথম এটিএম (অটোমেটেড টেলার মেশিন) সেবা চালু করে। এরপর ধীরে ধীরে অন্য ব্যাংকগুলো এ সেবা চালু করে। ২০০৪ সালে প্রথম ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা দেওয়া শুরু করে দেশের বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক লিমিটেড, ডাচ–বাংলা ব্যাংক লিমিটেড ও ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড। প্রথমে গ্রাহকেরা তাৎক্ষণিক নিজের হিসাব দেখার সুযোগ পান। পরে যুক্ত হয় অন্য সেবাও।

২০১৭ সালের ২ নভেম্বর থেকে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবায় নতুন মাত্রা যোগ হয় বাংলাদেশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের (এনপিএসবি) মাধ্যমে এক ব্যাংকের গ্রাহক নিজেই আরেক ব্যাংকের গ্রাহককে অর্থ স্থানান্তর করতে পারছেন। তহবিল স্থানান্তর ছাড়াও ঘরে বসেই ব্যাংকের বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। এই সেবার মাধ্যমে গ্রাহকরা এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য যেকোনো অ্যাকাউন্টে, অ্যাকাউন্ট থেকে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডে অথবা ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে অর্থ লেনদেন করতে পারেন। এতে ক্যাশলেস বা টাকাবিহীন লেনদেন বাড়ছে।

 

আরও পড়ুন: