করোনা মহামারিতেও ব্যাংকের মুনাফায় ‘চমক’

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপে অর্থনীতি ও জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও চমক দেখাচ্ছে দেশের ব্যাংক খাত। মহামারির মধ্যে বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে এলেও ব্যাংকে মুনাফা তরতর করে বাড়ছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক চিত্র পর্যালোচনা করে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে। করোনা মহামারির মধ্যে খরচ কমানো এবং বিতরণ করা ঋণ আদায়ে জোর দেয়ায় মুনাফা বাড়ছে বলে দাবি করেছেন ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি প্রভিশনে ছাড় দেয়া ব্যাংকের মুনাফা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলেও জানিয়েছেন তারা।

মহামারির মধ্যে ব্যাংকগুলোর এ মুনাফা বৃদ্ধির চিত্র নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মহামারির মধ্যে ব্যাংকগুলো মুনাফার যে প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে, তা যুক্তিসঙ্গত নয়। এখানে কিছু কারসাজি আছে। কিছু মুনাফা দেখানো হচ্ছে, যা শুধু কাগজে, বাস্তবে এই মুনাফা নেই।

তারা আরও বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছাড় দেয়ার কারণে অনেক ব্যাংক প্রভিশন কম রাখছে। ঋণের বিপরীতে সুদ আদায় না হলেও তা আয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ফলে মুনাফা বেড়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংক খাতের ওপর ঝুঁকি বাড়ছে। ভবিষ্যতে ব্যাংকের ওপর থেকে গ্রাহকের আস্থা উঠে যেতে পারে, যার ফল হবে মারাত্মক।

নিয়ম অনুযায়ী শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোকে প্রতি তিন মাস পরপর আর্থিক চিত্র প্রকাশ করতে হয়। তারই আলোকে তালিকাভুক্ত ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে ২৮টি ব্যাংক চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) আর্থিক অবস্থাও তুলে ধরেছে। রূপালী ব্যাংক, ন্যাশনাল ও ঢাকা ব্যাংক তাদের আর্থিক তথ্য এখনো (২ আগস্ট) প্রকাশ করেনি।

ব্যাংকগুলোর আর্থিক চিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২৮টি ব্যাংকের মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৪টি গত বছরের তুলনায় বেশি মুনাফা করেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের মুনাফা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এমনকি একাধিক ব্যাংকের মুনাফা বেড়ে প্রায় চারগুণ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

অবশ্য আইসিবি ইসলামী ব্যাংক বরাবরের মতো চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও লোকসান করেছে। চলতি বছরের ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারপ্রতি লোকসান করেছে ৩২ পয়সা। গত বছরও এ ব্যাংকটি শেয়ারপ্রতি ৩২ পয়সা লোকসান করে।

এ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে ব্যাংকের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। প্রভিশন না রাখলে একটা সময় ব্যাংক এমন পর্যায়ে পৌঁছবে যে তারা আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারবে না। এমনটা হলে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। আস্থা যদি নষ্ট হয় তবে পুরো ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর আঘাত আসবে। 

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের ব্যবসায় সব থেকে বড় চমক দেখিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা গত বছরের তুলনায় ২৮৩ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মাত্র ৬ পয়সা মুনাফা করা ব্যাংকটি চলতি বছর শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ২৩ পয়সা।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

মুনাফায় বড় চমক দেখানোর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে প্রাইম ব্যাংক। চলতি বছরের ছয় মাসে এ প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ১ টাকা ৮১ পয়সা, যা গত বছর ছিল ৫৫ পয়সা। অর্থাৎ মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২৯ শতাংশ।

মুনাফায় এমন প্রবৃদ্ধি হওয়ার বিষয়ে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রাইম ব্যাংকের কোম্পানি সচিব তানভির এ সিদ্দিকী কোনো মন্তব্য করতে চাননি। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের কোম্পানি সচিব মো. আলি রেজার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে শুধু স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক নয়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চমক দেখিয়েছে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ ব্যাংক। এনআরবিসি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এবং ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা গত বছরের তুলনায় ১০০ শতাংশের ওপর বেড়েছে।

মহামারির এ পরিস্থিতিতে আমাদের ব্যবসা বাড়েনি, খুব একটা মুনাফা করতে পারিনি। তবে আমরা খরচ কমিয়েছি এবং কালেকশনের (ঋণ আদায়) ওপর অনেক বেশি জোর দিয়েছি। সে কারণে মুনাফা বেড়েছে। 

এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক চলতি বছরের ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ১ টাকা ৮৫ পয়সা, যা গত বছর ছিল ৮৪ পয়সা। অর্থাৎ ব্যাংকটির মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২০ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে ১০৬ শতাংশ। গত বছর শেয়ারপ্রতি এক টাকা মুনাফা করা ব্যাংকটি এবার শেয়ারপ্রতি ২ টাকা ৬ পয়সা মুনাফা করেছে।

মার্কেন্টাইল ব্যাংক চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ২ টাকা ২ পয়সা, যা গত বছর ছিল ৯৭ পয়সা। এ হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০৮ শতাংশ। এনআরবিসি ব্যাংকের মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২৭ শতাংশ। চলতি বছরের ছয় মাসে ব্যাংকটি শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ১ টাকা ১১ পয়সা, যা গত বছর ছিল ৪৯ পয়সা।

ব্যাংকগুলোর মুনাফার এমন প্রবৃদ্ধির বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ব্যাংকের মুনাফায় এমন প্রবৃদ্ধি হওয়া খুবই সম্ভব। কারণ যে টাকা এখন পাচ্ছে না, সে টাকা তারা (ব্যাংক) ইনকাম হিসেবে দেখাচ্ছে। গ্রাহক সুদের টাকা না দিলেও ব্যাংক ওই টাকা পেয়েছে বলে দেখিয়েছে। আবার তাদের (ব্যাংক) প্রভিশন করতে হয়নি, কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে প্রভিশন করতে হবে না। তারা একদিকে টাকা পায়নি, অন্যদিকে প্রভিশন করেনি, ফলে তাদের মুনাফা বেড়ে গেছে।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘প্রভিশনে যে ছাড় দেয়া হচ্ছে তা ভবিষ্যতের জন্য খুবই খারাপ। গ্রাহকের আস্থা নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। আসলে ব্যাংকের বেশিরভাগ মালিক লভ্যাংশ নিয়ে ব্যাংকে ঢুকিয়ে ফেলেন, তারা ব্যাংক নিয়ে অত চিন্তিত নন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য প্রভিশনের ছাড় দেয়া বন্ধ করতে হবে। স্বাভাবিক সময়ের জন্য প্রভিশন যদি ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা হয়, তাহলে এ মহামারির সময় তা ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা করতে হবে। আসলে তো লোকসান বেশি। কিসের প্রফিট? সব ধান্দা।’

মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হওয়া অন্য ব্যাংকগুলোর চিত্র

এবি ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি মুনাফা ১৭ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩১ পয়সা। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি মুনাফা ৮৪ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ১৬ পয়সা হয়েছে। ব্যাংক এশিয়ার শেয়ারপ্রতি মুনাফা ১ টাকা ৩৭ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ টাকা ৭৫ পয়সা। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি মুনাফা ৩ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে ৩ টাকা ৫৭ পয়সা হয়েছে। ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি মুনাফা ১ টাকা ৬৫ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৫৬ পয়সা হয়েছে।

এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকের ৫১ পয়সা থেকে বেড়ে ৯১ পয়সা, ইসলামী ব্যাংকের ১ টাকা ৯৪ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৮ পয়সা, যমুনা ব্যাংকের ২ টাকা ৭ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৬৪ পয়সা, এনসিসি ব্যাংকের ১ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ৪৩ পয়সা, ওয়ান ব্যাংকের ৯৩ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ৪৬ পয়সা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ৫৮ পয়সা শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে।

পূবালী ব্যাংকের ১ টাকা ৪৪ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ৮০ পয়সা, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ১ টাকা থেকে বেড়ে ১ টাকা ৭২ পয়সা, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৪৮ পয়সা থেকে বেড়ে ৫৫ পয়সা, সাউথইস্ট ব্যাংকের ১ টাকা ৫৯ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৫৬ পয়সা, ট্রাস্ট ব্যাংকের ২ টাকা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪২ পয়সা, ইউসিবি’র ৭২ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ২ পয়সা এবং উত্তরা ব্যাংকের ১ টাকা ৪৪ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ৭৯ পয়সা শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে।

এদিকে বেশিরভাগ ব্যাংকের মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হলেও এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এবং মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের মুনাফা গত বছরের তুলনায় কমেছে। এর মধ্যে মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক চলতি বছরের ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ১ টাকা ৮ পয়সা, যা গত বছর ছিল ১ টাকা ৩৪ পয়সা।

এক্সিম ব্যাংক চলতি বছরের ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ৮৯ পয়সা, যা গত বছর ছিল ১ টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক চলতি বছরের ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা করেছে ৫৪ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮২ পয়সা।

ব্যাংকের এ চিত্র সম্পর্কে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংকের এ মুনাফা আমার কাছে খুব একটা যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না। তার কারণ হলো মহামারিকালে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের কিছু বেশি এবং ৯ শতাংশের কম। ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে না পারলে মুনাফা তো কম হওয়ার কথা।’

তিনি বলেন, ‘এখন খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো ঠিকমতো প্রভিশন রাখছে না। আবার খেলাপি ঋণের বিপরীতে যে সুদ হয়, তা তারা আয় হিসেবে দেখায়। এভাবে মুনাফা বাড়িয়ে দেখায়। আর্থিক প্রতিবেদন ম্যানুপুলেট করে। ফলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া মুশকিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে ব্যাংকের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। প্রভিশন না রাখলে একটা সময় ব্যাংক এমন পর্যায়ে পৌঁছবে যে তারা আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারবে না। এমনটা হলে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। আস্থা যদি নষ্ট হয় তবে পুরো ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর আঘাত আসবে।’

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি ও ইবিএল’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলী রেজা ইফতেখার বলেন, ‘মহামারির এ পরিস্থিতিতে আমাদের ব্যবসা বাড়েনি, খুব একটা মুনাফা করতে পারিনি। আমরা খরচ কমিয়েছি এবং কালেকশনের (ঋণ আদায়) ওপর অনেক বেশি জোর দিয়েছি। সে কারণে মুনাফা বেড়েছে।’ সূত্র:জাগোনিউজ

ঢাকা/এনইউ

আরও পড়ুন: