ক্রয় মূল্যে এক্সপোজার লিমিট গণনার নির্দেশ

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ মেনে শেয়ারের ক্রয়মূল্যকে বাজার মূল্য ধরে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্য দিয়ে পুঁজিবাজার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রক্ষণশীল নীতি পরিবর্তনের যে আভাস পাওয়া যাচ্ছিল, সেটি আরও স্পষ্ট হলো। আজ বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) এই নির্দেশ জারি করেছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। জানানো হয় এই নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

২০১০ সালে পুঁজিবাজারে মহাধসের পর নানা সময় ব্যাংকে বিনিয়োগের সীমা বা এক্সপোজার লিমিট গণনা পদ্ধতি পাল্টানোর দাবি ছিল। কোনো শেয়ারের ক্রয়মূল্য বা বাজার মূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেটি হিসাব করেই এই লিমিট গণনা করা হতো। এর ফলে শেয়ারের দর বেড়ে গেলে ব্যাংকগুলো তা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হতো। ফলে বাজারে শেয়ারের বিক্রয়চাপ তৈরি হতো।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

এ কারণে শেয়ারের ক্রয়মূল্য ধরে এক্সপোজার লিমিট নির্ধারণের দাবি ছিল। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিও এই সুপারিশ করে আসছিল। কিন্তু ফজলে কবির গভর্নর থাকাকালে এই বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।

আবদুর রউফ তালুকদার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার পর থেকেই পুঁজিবাজার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোভাব পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। এর মধ্যে গত ১৮ জুলাই এক্সপোজার লিমিটের হিসাব পরিবর্তনে মতামত চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। গত মঙ্গলবার মন্ত্রণালয় থেকে ফিরতি চিঠিতে একটি কৌশলী মতামত দেয়া হয়।

এতে শেয়ারের ক্রয়মূল্যকেই বাজার মূল্য হিসেবে বিবেচনার মত দেয়া হয়। এর ফলে এক্সপোজার লিমিটের সংজ্ঞায় বাজারমূল্য থাকলেও কার্যত ক্রয়মূল্যতেই সেটি নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও সেই মত মেনেই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আদেশে বলা হয়, সরকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, কোনো ব্যাংক কোম্পানির একক ও সমন্বিত উভয় ভিত্তিতে শেয়ার ধারণের ঊর্ধ্বসীমা নিধারণে সংশ্লিষ্ট শেয়ার করপোরেট বন্ড, ডিবেঞ্চার, মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য পুঁজিবাজার নিদর্শনপত্রে বাজারমূল্য হিসাবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ক্রয়মূল্যকেই বাজারমূল্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

এতদিন বাজারমূল্য বা ক্রয়মূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেটিকে ধরে এক্সপোজার লিমিট বিবেচনায় করায় বাজারে বিক্রয়চাপ দেখা দিত। কোনো ব্যাংক তার বিনিয়োগসীমার মধ্যে শেয়ার কিনলে সেটির দর বেড়ে গিয়ে সীমা অতিক্রম করে গেলেই তা বিক্রি করে দিতে হয়। এতে বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়। আর ব্যাংক যেহেতু বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে তাই বিক্রির চাপটাও বেশি থাকে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীর প্রাধান্য বেশি। ব্যাংকের বিক্রয় চাপ তারা সামাল দিতে পারে না।

গত ৩০ নভেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বিএসইসির এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে বৈঠক শেষে জানানো হয়, ডিসেম্বরের শেষে বা জানুয়ারির শুরুতে আরেক দফা বৈঠক হবে। এরপর দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। কিন্তু সেই বৈঠক আর হয়নি।

এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। ফজলে কবির অবসরে যাওয়ার পর গভর্নর হয়ে আসেন আবদুর রউফ তালুকদার। তিনি পদে আসার আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তাকে ১৯ বছর পর বদলি করা হয়, যাকে পুঁজিবাজার নিয়ে রক্ষণশীল নীতির জন্য দায়ী করা হয়।

এর মধ্যে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমার হিসাব গণনার পদ্ধতির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠি পুঁজিবাজার নিয়ে সংস্থাটির নীতি পরিবর্তনের আভাস হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কেউ সরাসরি কোনো বক্তব্য দিচ্ছিল না। যদিও গত রোববার বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম এক অনুষ্ঠানে নিশ্চিত করেন যে, এক্সপোজার লিমিট ক্রয়মূল্যে নির্ধারণ করা হবে।

সেদিন তিনি বলেন, ‘এটি এখন প্রক্রিয়াধীন। এটি করার জন্য বর্তমান গভর্নর সচিব থাকার সময় উদ্যোগ নিয়েছিলো। কিন্তু ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিচের কর্মকর্তাদের আপত্তির কারণে তা হয়নি। তবে এবার হয়ে যাবে।’

এক্সপোজার লিমিটের সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কৌশলী ভূমিকা নেয়া হতে পারে- এমন ইঙ্গিতও তিনি সেদিন দিয়ে রাখেন। বলেন, ‘এটি বাস্তবায়নে আইন পরিবর্তনের পরিবর্তে অন্য পথের কথা ভাবা হচ্ছে।’ এ বিষয়টির পাশাপাশি বিএসইসির আরও একটি সুপারিশ আছে। সেটি হলো বন্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগ এক্সপোজার লিমিটের বাইরে রাখা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে বলে আশ্বস্ত করেছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।

ঢাকা/এসএ