বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: হেডলাইন দেখেই অনুমেয়- লেখাটি সাকিব আল হাসানকে নিয়ে। আরেকটু গভীরে গিয়ে বললে- সাকিবের সদ্য প্রস্ফুটিত (সংঘটিত) ঘটনা নিয়ে। অনেকে আবার ভাবতে পারেন, এমন ঘটনাকে ‘প্রস্ফুটিত’ বলে আমি নান্দনিক কিছু বলতে চাইলাম কি না। সে যাই হোক, বিষয়টি নান্দনিক নাকি বেগতিক- সেই হিসাব আমরা লেখার শেষ দিকে মিলিয়ে নেবো না হয়।

শুক্রবার দুই মহা প্রতাপশালী ক্লাব আবাহনী-মোহামেডান হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে কি ঘটেছে অথবা কেনো ঘটেছিলো- সেসব মেইন স্ট্রিম মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সবাই ইতোমধ্যে জেনে গেছে। আমিও এই মাধ্যমেই দেখেছি বা জেনেছি। এরমধ্যে দুই ভাগে বিভক্তও হয়ে গিয়েছে আম-জনতা। আমজনতা বাদ দিয়েও এই খেলাটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত অনেকেও দুই ভাগেই বিভক্ত-  ক্রীড়া বিশ্লেষক ও ক্রীড়া সাংবাদিকরাও রয়েছেন এতে।

এরমধ্যে দু’টো করে পক্ষ আছে-  যারা ঘটনার ঠিক-বেঠিক না বুঝেই কোনো এক দিকে অবস্থান নিয়ে নিয়েছে শুরুতেই। এদের একপক্ষের কাছে  সাকিব চিরায়ত বেয়াদব; তাকে আজীবন নিষিদ্ধ করা চাই। আরেক পক্ষের চোখে কেবল সাকিবই পারে এমন উচিত কাজ করতে; এটি আম্পায়ারদের প্রাপ্য।

পাঠক হিসেবে এই দুইপক্ষের কারও জন্য এই লেখা নয়। যারা বুঝে-শুনে ঘটনার ভেতরে গিয়ে ঘটনার পক্ষ-বিপক্ষ নিচ্ছেন- আমিও কিছুটা তাদের দলের। বিশ্বসেরা সাকিব কিংবা দেশের সর্ব ক্ষমতার আম্পায়ার-  কেউই এখানে আলোচনার বিষয়বস্তু না হয়ে আলোচনা হওয়া হওয়া উচিত কেবল ঘটনাটি।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

সাকিব আমাদের সেরা তারকা অথবা নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার বলে তিনি এমনটা করতে পারেন না কিংবা তার কাছে এটি প্রত্যাশিত নয়; বাকি অন্য ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে এটি মানানসই-  সেটাওতো নয় নিশ্চয়ই। আবাহনীর পক্ষে রায় গেল বলেই কেবল আম্পায়ার দোষী-  বাকি সব দলের ক্ষেত্রে গেলে নয়; ব্যাপারটা এমন নয়।

কথা হচ্ছে- আম্পায়ার আবাহনীর পক্ষে গিয়েও যদি এরকম পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত দিয়েই থাকেন, তবেও কি সাকিব এমন দৃশ্যমান অখেলোয়াড়সুলভ আচরণ করতে পারেন? নিশ্চয়ই পারেন না। এটি সাকিবকে অন্ধভাবে ফলোকারী ফ্যানরাও বুঝে ও জানে। কিন্তু পারফরম্যান্সের প্রশ্নে সাকিবের কড়া সমালোচনা করা অনেককেই দেখা যাচ্ছে-  অন্তত এই ঘটনায় কোনো না কোনো যুক্তিতে সাকিবকে সমর্থন করছেন। পাড়ার ক্রিকেটে এমনটিতো হরহামেশাই ঘটে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটিই যেন পাড়ার ক্রিকেটের শিল্প। কিছু একটা মনমতো না হলেই-  ‘খেলবো না’ বলেই স্ট্যাম্প ভেঙে (উপড়ে) ফেলা। কিন্তু সেখানেও যখন এমন আচরণ কেউ করে তাকেও দুই-তিনদিন খেলায় নেওয়া হয় না।

এই প্রেক্ষাপটে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসরে একই ম্যাচে পরপর দুইবার (একবার লাথি ও একবার দুইহাত দিয়ে) স্ট্যাম্প উপড়ে ফেলে সাকিব যে কঠিন শাস্তি পেতে যাচ্ছেন- এটি নিয়ে কারও বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। তাও যারা সাকিবের ফ্যান-ফলোয়ার নন, তারা কেনো সাকিবের পক্ষে একটা বড় অংশ যুক্তি দিচ্ছেন। এটা একটা জিজ্ঞাসা।

বাংলা সাহিত্যে একটি সর্বপরিচিত বচন রয়েছে, ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর’! তাই তর্কে এই ঘটনার সমাধান আসবে না। এই ঘটনায় ছোট্ট একটি পুরোনো বিষয় বড়ভাবে উঠে এলো- তা হলো বিশ্বাস হারিয়েছে এদেশের আম্পায়াররা। ঘরোয়া ক্রিকেটে আম্পারদের নানা নির্লজ্জ ঘটনা অনেকটা ওপেন-সিক্রেট। বোর্ডকর্তা কিংবা শক্তিশালী ক্লাব অফিসিয়াল অথবা হাই প্রোফাইল কোচদের একটা অংশ এই নির্লজ্জতার সঙ্গে সম্পৃক্ত- এটাও অনেক পুরোনো খবর। নতুন বলতে আজকের ঘটনাই, সাকিবের স্ট্যাম্প উপরে ফেলা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আজকের ঘটনা সাকিবকে পাড়ার ক্রিকেটের সৎ কিন্তু অভিমানী খেলোয়াড়ের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে, যার আম্পায়ারদের ওপর আস্থা-বিশ্বাস আগ থেকেই নেই!

পক্ষপাতমূলক আম্পায়ারিং এদেশের ক্রিকেটে ক্যান্সারের মতোই; উপরে গ্ল্যামার- ভেতরে ভেতরে নিঃস্ব হওয়ার মতো। আম্পায়াররা একান্ত নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে অথবা অল্প কিছু আর্থিক সুবিধার্থে এমন ঘটনা বারবার করবেন, আর তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ হবে না, তাতো হবার কিংবা মেনে নেওয়ার মতো নয়। তাছাড়া এতো ক্ষমতাবান আম্পায়ার আমাদের দেশে আছেন বলেও মনে হয় না। 

এটির সঙ্গে কারা এবং কী সমীকরনে জড়িত, এটি যারা জানার তারা ঠিকই জানেন। সমস্যা হচ্ছে- এভাবে চলতে দেওয়াকে তারা (সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ) প্রশ্রয় দেওয়া ভাবতেই নারাজ। তবে সাকিব যে প্রশ্রয় পাবেন না এটি নিশ্চিত। পাওয়া উচিতও নয়; এর আগেও পাননি। চোখের দৃষ্টিতে যে অসুন্দর ঘটনা রচনা করেছেন সাকিব, এতে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রত্যাশাই স্বাভাবিক।

আহ! সাকিব কেনো করলেন এমনটি- আফসোস লাগছে তাই। এর পাশাপাশি সাকিবকে ধন্যবাদ অথবা একটু বাহবা না দিলেও কেন যেন বেমানান লাগছে। বলতে ইচ্ছে হচ্ছে- ‘বাহ সাকিব! নিজের পায়ে কুড়াল মেরেই আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের ক্যান্সার ব্যাধিটির কথা একটু দারুণভাবেই সামনে নিয়ে এলেন।’

হয়তো সন্দেহপ্রবণতার কারণে কিংবা অতীতের তিক্ততা থেকে- সাকিব বলেই তো এতো দুশ্চিন্তা ও হাহাকার। যাই হোক, শুধুমাত্র সাকিবকে ‘অতটা’ ম্যাচ বসিয়ে রেখে এবং ম্যাচ ফির ‘অত’ শতাংশ কেটে রাখার মধ্য দিয়ে যেন এই ঘটনার সমাপ্তি না ঘটে। এদেশের ক্রিকেটের গভীরে চলে যাওয়া ‘ম্যাচ ফিক্সিং’ ও ‘আম্পায়ার কেলেঙ্কারি’-নামক ক্যান্সার নিয়েও যেনো প্রাসঙ্গিক ব্যবস্থা গৃহীত হয়। তাহলেই কেবল দেশসেরা অলরাউন্ডারের বেয়াদবি করা এবং বেয়াদবির বিচারের প্রক্রিয়ার সার্থকতা আসবে।

লেখক-সার্টিফায়েড ক্রিকেট আম্পায়ার, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্রিকেট আম্পায়ার অ্যান্ড স্কোরার অ্যাসোসিয়েশন, ফেনী জেলা।

ঢাকা/এনইউ

আরও পড়ুন: