বিনিয়োগের মূল উদ্দ্যেশ্যই মুনাফা করা। তবে তা হতে পারে যৌক্তিক পর্যায়ে। এজন্য প্রয়োজন সুচিন্তিত ও বিশ্লেষনধর্মী বিনিয়োগ। আপনি যেকোন ব্যবসায়ই করেন না কেন- আপনি যদি ভেবেচিন্তে বিনিয়োগ না করেন তবে আপনাকে লোকসানের সম্মুখীন হতে হবে। আর সেটা যদি হয় শেয়ারবাজার তাহলেতো আর কথায় নেই। বিনিয়োগের জন্য এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি খাত। একটু হের-ফের হলেই আপনি এবং আপনার পুরো পরিবারকে পথে বসতে হতে পারে।

দু:খজনক হলেও সত্য যে, এই বিষয়গুলো প্রায় সব বিনিয়োগকারীর মাথায় থাকলেও অধিকাংশ বিনিয়োগকারীই রাতারাতি কোটিপতি বনে যেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। যেসব শেয়ার ১০ টাকায় কেনার কথা না, সেসব শেয়ার কেনেন হাজার হাজার টাকায়। যদি লাখ টাকা হয়ে যায়। আর ঠিক তখনি ঘটে বিপত্তি। প্রতি ১০০ জনে দু’জন লাভবান হলেও পথে বসেন ৯৮ জন বিনিয়োগকারী।

কারসাজি’ এই শব্দটার সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। এটা কিভাবে হয়, তাও কমবেশ সবাই জানি। শেয়ারবাজারে কারসাজি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশে তা মাত্রাতিরিক্ত। যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যর্থতার গ্লানি বয়ে বেড়াচ্ছেন। হ্যা, এ কথা সত্য যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের দায়িত্ব্য বাজারকে মনিটরিং করা কিংবা কারসাজিরোধ করা। ঠিক যেমন রোগীকে সারিয়ে তোলার দায়িত্ব্য ডাক্তারের। কিন্তু আপনি যদি স্ব-ইচ্ছায় পচা শামুকে বারবার পা কাটেন সেখানে ডাক্তারের কি করার আছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কর্তা-ব্যক্তিদের পাশাপাশি পুঁজিবাজার বিশ্লেষক এমনকি পত্র-পত্রিকাগুলোতেও প্রতিনিয়তই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মৌলভিত্তির শেয়ারে, কিংবা কোম্পানির অবস্থান যাচাই করে বিনিয়োগের কথা বলা হচ্ছে। কারণ, এটা কোন জুয়া খেলার ঘর না, কেউ তার জমানো সঞ্চয় বা পুঁজি জুয়ায় লাগাবেন। যদি এমনটাই হয় তাহলে যেসব কোম্পানি বছরের পর বছর উৎপাদনে নেই অথবা লোকসানে রয়েছে অথবা ডিভিডেন্ড দেয় না, সেসব কোম্পানিতে আপনি ঠিক কি কারণে বিনিয়োগ করছেন? যেসব কোম্পানির শেয়ার প্রতি লোকসান ৪ টাকা, সেই কোম্পানির শেয়ার আপনি কি কারণে ৪০ অথবা ৪০০ টাকায় কিনছেন?

হ্যা, একটাই কারণ হতে পারে যে আপনি দুইদিনের মাথায় তা ৮০ অথবা ৮০০ টাকায় বিক্রি করার স্বপ্ন দেখছেন। একবার ভেবে দেখলেনও না যে শেয়ারটির ফেসভ্যালু বা অভিহিতমূল্য ১০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, টানা লোকসানের কারণে যে শেয়ারটির বাজার দর ৪ টাকাও হওয়ার কথা না, সে শেয়ারটি আপনার কাছ থেকে এতো টাকায় কে কিনবে? আপনি বোকা বনেছেন বা লোভে পড়েছেন বলে অন্য কেউ বোকা হবেন বা লোভে পড়বেন-এমনটি নাও হতে পারে। এবং না হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিছু হলেইতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে গালমন্দ করেন।

এখন যদি আপনার কাছে জানতে চাওয়া হয় যে এ ভূলের দায় কে নেবে- এর কি কোন জবাব আপনার কাছে আছে? এখানে আমি একবারও বলছি না যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসি কিংবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান তাদের দায়িত্ব্য শতভাগ পালন করেছে। এটাও বলছি না যে, তাদের কোন ভূল নেই। তবে এটাও সত্য পুঁজি আপনার, আর সেটা নিরাপদ ক্ষেত্রে বিনিয়োগের দায়িত্ব্যটাও আপনার। আপনি দরজা খোলা রেখে ঘুরতে যাবেন, আর কিছু চুরি হলে দোষ দেবেন প্রতিবেশি কিংবা পুলিশের তাতো হতে পারে না।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির যেকোন অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের দায়ভার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর। কেউই এ দায়িত্ব এড়াতে পারে না। তবে পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়-দায়িত্ব সবার কাঁধেই পড়ে।

এছাড়া উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোকে যথাসময়ে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা কিংবা সেসব কোম্পানির কর্মকান্ডের মনিটরিং করা এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত যেকোন অনিয়মরোধ করার দায়িত্ব বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর। তারা যদি সঠিক দায়িত্ব্য পালন করে তাহলে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ পদদলিত হবে না।

তথাপিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পুঁজিটাতো আপনার। সেটার নিরাপদ বিনিয়োগ নিশ্চিত করার দায়িত্ব্যও আপনারই। মনে রাখবেন আপনার ভূলে যদি তা হারিয়ে যায়, তাহলে তার দায় কারও নয়। সেজন্য যেকোন কোম্পানিতে বিনিয়োগের পূর্বে কারও কথায় নয়, বরং ভালো করে যাচাই-বাছাইপূর্বক ভেবে-চিন্তে বিনিয়োগ করুন।

লেখক: হাসান কবির জনি
নির্বাহী সম্পাদক,
শেয়ারনিউজ২৪.কম
ই-মেইল: [email protected]