বিজনেস জার্নাল ডেস্কঃ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের পর্ষদ ও অফিস অবৈধভাবে দখলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটিরই সাবেক চেয়ারম্যান সামসুল ইসলাম ভরসার বিরুদ্ধে। আর এ অভিযোগ তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী জারিয়াব। সংবাদ সূত্রঃ সমকাল

ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, সামসুল ইসলাম ভরসার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদকে গত ২৯ মার্চ বিলুপ্ত করে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ওই আদেশে সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আশরাফুল মকবুলকে স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত পর্ষদে শেয়ারহোল্ডার পরিচালক হিসেবে যে তিনজনকে রাখা হয়েছে, তার মধ্যে সামসুল ইসলাম ভরসাও আছেন।

মোহাম্মদ আলী জারিয়াব বলেন, ‘সামসুল ইসলাম ভরসা শুধু পরিচালক পদ নিয়ে সন্তুষ্ট নন। তাই এমন করেছেন।’ বিএসইসি নিয়োগকৃত স্বতন্ত্র পরিচালকরা প্রত্যেকেই দক্ষ, তারা প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে পারবেন বলে আলী জারিয়াব মনে করেন।

তিনি আরও জানান, পুনর্গঠিত পর্ষদ সভা করে এরই মধ্যে কোম্পানির দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। কিন্তু সামসুল ইসলাম ভরসা ও তার অনুসারীরা গত ১৫ এপ্রিল লকডাউনের মধ্যে বনানীর প্রধান কার্যালয় দখলে নিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ অফিস নথিও সরিয়ে নিয়েছেন।

সামসুল ইসলাম ভরসা সাড়া না দেওয়ায় যোগাযোগ করা হয় ফারইস্ট ফাইন্যান্সের কোম্পানি সচিব নাজমুন নাহারের সঙ্গে। তিনি দাবি করেন, পর্ষদ পুনর্গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে রিট করা হয়েছে। রিট গ্রহণ করে কমিশনের বিরুদ্ধে রুলসহ আদেশটি স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। ফলে সামসুল ইসলাম ভরসার নেতৃত্বাধীন পর্ষদ বহাল আছে। ওই পর্ষদ গত ১৩ এপ্রিল ভার্চুয়ালি সভা করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী জারিয়াবকে অব্যাহতি দিয়েছে। পর্ষদ সভার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করে চিঠি দেওয়ার জন্য ১৫ এপ্রিল অফিস খোলা হয়। এটা সম্পূর্ণ আইনগতভাবে করা হয়েছে।

অফিস দখলের অভিযোগ ‘ডাহা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’ বলে উল্লেখ করেন নাজমুন নাহার। তবে হাইকোর্টের যে আদেশের বলে সামসুল ইসলাম ভরসার পর্ষদ বহাল আছে বলে দবি করেছেন, তার অনুলিপি দেখাতে পারেননি তিনি। নাজমুন নাহার বলেন, ‘আদেশের সার্টিফায়েড কপি এখনও পাইনি।’ আইনজীবীর মতামত নিয়ে সভা করা হয়েছে। আইনজীবীর নাম জানতে চাইলে তা-ও দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
হাইকোর্টের আদেশের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, কোম্পানি রিট করেছে, তা সত্য।

তবে হাইকোর্ট স্ট্যাটাসকো (স্থিতাবস্থা) আদেশসহ রুল দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, কমিশনের আদেশকে বাতিল করেননি; বরং পুনর্গঠিত পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ায় তা বহাল রয়েছে। বিএসইসির আইনজীবী এ এম মাসুমও বলেন, স্থিতাবস্থা আদেশ দেওয়ার সময় কোম্পানি যেভাবে চলছিল, সেভাবে চলবে। এখানে কেউ কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না। এর বাইরে কেন কমিশনের আদেশটি বেআইনি ঘোষণা করা হবে না- সে বিষয়ে শুনানির জন্য রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। এ অবস্থায় সাবেক পর্ষদের সভা করার সুযোগ আছে বলে মনে করি না।

হাইকোর্টের আদেশ বিষয়ে জানতে চাইলে সামসুল ইসলাম ভরসার পক্ষের আইনজীবী জোসনা পারভিন প্রথমে জানান, হাইকোর্ট ‘স্টে’ (স্থগিত) আদেশ দিয়েছেন।

কীসের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা পর্ষদ পুনর্গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলাম। ফলে হাইকোর্টের আদেশ বিএসইসির আদেশ বিষয়ে হয়েছে। এ বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশের অনুলিপি চাইলে তিনি বলেন, ‘অনুলিপি এখনও পাইনি।’ কিছু সময় পরে আগের বক্তব্য সংশোধন করে জানান, হাইকোর্ট ‘স্টে’ নয়, ‘স্ট্যাটাসকো’ আদেশ দিয়েছেন। তবে এ আদেশের ফলে আগের পর্ষদ বহাল হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

সামসুল ইসলাম ভরসা যে ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের পর্ষদ নিজের দখলে রাখতে চাচ্ছেন, তা এরই মধ্যে মন্দ ঋণ ও লোকসানের ভারে নিমজ্জিত। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ শোধ করতে না পেরে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। তার পরও প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চান না প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান সামসুল ইসলাম ভরসা।

প্রতিষ্ঠানটির অডিটর ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, তার কিছু অংশ গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর তার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। এতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের যে অংশ খেলাপি হয়েছে, তার বিপরীতে ৭৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকার মূলধন সংরক্ষণে ঘাটতি আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের মধ্যে বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে বার্ষিক কিস্তিতে পর্যাপ্ত প্রভিশনিং করার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাও রক্ষা করতে পারছে না। শুধু ২০১৯ সালে এ প্রতিষ্ঠানের নিট লোকসান ছিল ৭১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এ লোকসানের ফলে কোম্পানিটির সম্পদের তুলনায় দায় ১৫৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

আবার এর সহযোগী কোম্পানি ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ড নামের ব্রোকারেজ হাউসের নামে ২৭৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার কথা বলা হলেও অডিটর দেখেছেন, নথি অনুযায়ী প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ ২৫২ কোটি টাকা। এখানে ২৩ কোটি টাকার হিসাব পাওয়া যায়নি। দিন দিন খারাপ হতে থাকায় ২০১৯ সালের শেষেই কোম্পানিটির সম্পদমূল্য ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের বিপরীতে মাত্র দুই টাকা ৮৫ পয়সায় নেমেছিল।

এ বিষয়ে কোম্পানি সচিব নাজমুন নাহার বলেন, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সময় যে ঋণ অনিয়ম হয়েছে, তাতেই রুগ্‌ণ হয়েছে ফারইস্ট ফাইন্যান্স। সামসুল ইসলাম ভরসাকে বৈধ পর্ষদ চেয়ারম্যান দাবি করে তিনি বলেন, এ পর্ষদের সময় কোনো ঋণ অনিয়ম হয়নি; বরং আলী জারিয়াব উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোম্পানির সুনাম নষ্টের চেষ্টা করছেন। তিনি কোম্পানির কাজে দায়িত্ব নিতে চাননি। সময়মতো অফিস করেননি। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নথি নিজে সরিয়ে নিয়ে কর্মকর্তাদের হয়রানি করেছেন।

তবে সচিব নাজমুন নাহার স্বীকার করেন, সামসুল ইসলাম ভরসার নেতৃত্বাধীন পর্ষদই আলী জারিয়াবকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দিয়েছিল।

নাজমুন নাহারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আলী জারিয়াব সমকালকে বলেন, নাজমুন নাহারের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে সুদের টাকা পরিশোধের কথা বলে তার স্বাক্ষরসহ চেক ইস্যু হয়েছে, তবে সুদ পরিশোধ হয়নি।

তিনি বলেন, পর্ষদ পুনর্গঠন করে বিএসইসি আদেশটি কোম্পানির জন্যই ভালো। কয়েক বছর লভ্যাংশ দিতে না পারায় ফারইস্ট ফাইন্যান্স শেয়ারবাজারে জেড ক্যাটাগরির শেয়ার হিসেবে কেনাবেচা হচ্ছিল। কোম্পানির অবস্থা উন্নতির লক্ষ্যে সাবেক পর্ষদকে ডেকে তিন দফায় পরিকল্পনা চেয়েছিল। গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা দিতে না পারায় পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে বিএসইসি। এটা সবার মেনে নেওয়া উচিত ছিল। হয়তো সংঘটিত আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি উদ্ঘাটিত না হয়, তার জন্যই কেউ কেউ পর্ষদের নেতৃত্ব ছাড়তে চাচ্ছেন না।

ঢাকা/এসএ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here