০৭:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

ফ্যাসিস্টের ডিজিটাল অর্থ পাচারকারী, শত শত কোটি টাকা পাচার করেও বহাল তবিয়তে মুনতাকিম আহমেদ (পর্ব-১)

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ০১:০৫:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
  • / ১০২১৭ বার দেখা হয়েছে

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন, কর অব্যাহতি এবং সরকারি প্রণোদনার ওপর ভর করে বাংলাদেশ যখন ডিজিটাল বিপ্লবের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই এই খাতটিকে অর্থ পাচারের সবচেয়ে নিরাপদ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আর এই পুরো মাস্টারপ্ল্যানের নেপথ্যে ছিলেন ডিগ্রিধারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মুনতাকিম আহমেদ। প্রথাগত আর্থিক অপকর্মের বাইরে গিয়ে মুনতাকিম আহমেদ তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে ব্যবহার করেছিলেন অবৈধ বিষয়কে বৈধ রূপ দেওয়ার কাজে। তিনি মূলত উল্কা গেমস (Ulka Games) নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মূল আর্থিক পরিকল্পনাকারী বা আর্কিটেক্ট ছিলেন, যা আসলে ছিল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একটি অনলাইন জুয়া সিন্ডিকেটের সম্মুখভাগ।

আইটি-এনাবেল্ড সার্ভিসেস (আইটিইএস) বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সরকারি সুযোগ-সুবিধার ফাঁকফোকর গলিয়ে উল্কা গেমসকে সম্পূর্ণ করমুক্ত সুবিধা এনে দেন মুনতাকিম। ভুয়া সেলস বা বিক্রি দেখিয়ে এমন এক নিখুঁত আবরণ তৈরি করেন, যা দেশের আইনপ্রয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর রাডারের সম্পূর্ণ বাইরে ছিল।

এই বৈধতার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল মূল উদ্দেশ্য-অর্থ পাচার। উল্কা গেমসের মূল প্যারেন্ট কোম্পানিটি একটি প্রতিবেশী দেশে অবস্থিত হওয়ায়, মুনতাকিম মোহাম্মদ অত্যন্ত চতুরতার সাথে আইনি চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার বা রেপ্যাট্রিয়েট করেন। তিনি অবৈধ জুয়ার কার্যক্রম থেকে বিদেশে পাচার করা মুনাফার প্রতিটি অংশ থেকেই মোটা অঙ্কের কমিশন পেতেন।

আইটি খাতের সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করায় এই টাকার উৎস বা মানি ট্রেইল খুঁজে পাওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে উল্কা গেমসের জুয়া সংক্রান্ত সব খবর প্রকাশ্যে আসার পর র্যাব শেষ পর্যন্ত পুরো চক্রটির রহস্য উদ্ঘাটন করে এবং মুনতাকিম আহমেদকে গ্রেপ্তার করে। পরে ফ্যাসিবাদী সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি জামিন লাভ করেন এবং সময় নষ্ট না করে উত্তর আমেরিকার একটি দেশে পালিয়ে যান।

মুনতাকিম আহমেদ এই আর্থিক জালিয়াতির ইতিহাস কেবল উল্কা গেমসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে তিনি দেশের একটি নামী মার্চেন্ট ব্যাংক ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ফাইন্যান্স বিভাগের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড এবং পরবর্তীতে চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ব্র্যাক ইপিএল-এ থাকাকালীন সময়েই মনতাকি পুঁজিবাজারের কিছু কুচক্রী মহলের সাথে হাত মেলান এবং বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন। তার সময়েই ব্র্যাকের তহবিল থেকে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার মার্জিন ঋণ দেওয়া হয়, যার প্রায় পুরোটাই পরবর্তীতে মন্দ ঋণে পরিণত হয়।

পুঁজিবাজারের বিপর্যয় ও ছাঁটাই: ‘জেনারেশন নেক্সট’- এর বহুল আলোচিত স্ক্যান্ডালের পেছনে মুনতাকিম আহমেদের সরাসরি ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে জেনারেশন নেক্সট-এর আর্থিক বিবরণী জালিয়াতি ও উইন্ডো ড্রেসিং করার মূল কারিগর ছিলেন তিনি। তার তৈরি করা ভুয়া রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানিটিকে লিস্টিংয়ের অনুমতি দেয়। পরবর্তীতে এই কোম্পানিটি বাজারে ধসে পড়ে এবং হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হন। এই কেলেঙ্কারির পর ব্র্যাক কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে।

অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকিং খাত থেকে বিতাড়িত হয়ে মুনতাকিম আহমেদ গড়ে তোলেন তার নিজস্ব কনসালটেন্সি ফার্ম ‘এইস অ্যাডভাইজরি’ (Ace Advisory)। দৃশ্যত এটি একটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হলেও, এর মূল কাজ ছিল বিদেশি কোম্পানিগুলোকে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া, স্থানীয় আইন ও নিয়মকানুন বাইপাস করা এবং গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অর্থ দিয়ে কাজ হাসিল করার বুদ্ধি দেওয়া। এছাড়া বিদেশি কোম্পানির ক্ষেত্রে যেখানে নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশি পার্টনার বা মালিকানা থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে এইস অ্যাডভাইজরি টাকার বিনিময়ে ভুয়া বাংলাদেশি মালিকানার (Fake Ownership) ব্যবস্থা করে দিত। মনতাকি নিজে এই সমস্ত বেনামী ও ভুয়া কোম্পানির বোর্ডে বসতেন।

একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়া সিন্ডিকেট চালানো, শেয়ারবাজারে শত কোটি টাকার জালিয়াতি করা কিংবা সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনায়াসে ২০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা—কোনো সাধারণ অপরাধীর পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক অভয়ারণ্য। আর মুনতাকিম আহমেদের ক্ষেত্রে সেই অসীম ক্ষমতার উৎস ছিলেন পূর্ববর্তী সরকারের প্রভাবশালী (মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল)।

আরও অভিযোগ রয়েছে, মুনতাকি তার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এইস অ্যাডভাইজরি’-কে কেবল কর ফাঁকি বা ভুয়া মালিকানা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং এই কোম্পানির আড়ালেই চলত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজ হাসিল করার মূল খেলা। উপশিক্ষামন্ত্রীর প্রভাবকে পুঁজি করে এইস অ্যাডভাইজরি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিগত জায়গায় লবিং করত। বিদেশি ও দেশি বিতর্কিত কোম্পানিগুলোকে আইনি ফাঁকফোকর গলে বের করে আনা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে চুপ করিয়ে রাখা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার চুক্তি পাইয়ে দেওয়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই প্রতিষ্ঠানটি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) হাসান হাবিব-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে উল্কা গেমস লিমিটেড (ভারতীয় কোম্পানি ‘মুনফ্রগ ল্যাবস’-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান, যা তিন পাত্তি গোল্ড গেমের জন্য পরিচিত) এর বিরুদ্ধে একটি নিবিড় ও কঠোর তদন্ত পরিচালিত হয়।

অক্টোবর ২০২২ সালে মহাখালী ও উত্তরা থেকে র‌্যাব মুনতাকিম আহমেদসহ চক্রের ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে ছবি: সংগৃহীত

তদন্তে দেখা যায়, কোম্পানিটি সরকারের দেওয়া আইটি এনাবল্ড সার্ভিসেস (আইটিইএস) খাতের শতভাগ কর অব্যাহতির সুযোগ নিয়েছিল। কিন্তু এর আড়ালে তারা মূলত গেমের ‘ইন-অ্যাপ পারচেজ’ ও চিপস বিক্রির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় করে তা লুকিয়ে রাখছিল এবং সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছিল।

হাসান হাবিবের জোরালো তৎপরতায় উল্কা গেমসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয় এবং তদন্তের মাধ্যমে তাদের এই মহাদুর্নীতি উন্মোচন করে প্রতিষ্ঠানটি থেকে বিপুল পরিমাণ বকেয়া ট্যাক্স ও জরিমানা আদায় করা হয়।

এই সফল অভিযানের পর, আইটি খাতের আড়ালে যেন কেউ কর ফাঁকি দিতে না পারে, সেজন্য এনবিআর কর অব্যাহতি প্রাপ্ত অন্যান্য আইটিইএস কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি ও স্ক্রুটিনি কঠোরভাবে বাড়িয়ে দেয়।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ওয়াহিদুন্নবী বিপ্লব বলেন, অনলাইন গ্যাম্বলিং বা জুয়া শুধু তরুণ সমাজকে ধ্বংস করছে না, এর মাধ্যমে হুন্ডির সাহায্যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতি যখন একটা চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে, তখন এই ধরনের অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। জামিনে থাকা একজন অপরাধী কীভাবে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ পায় এবং ব্যবসা গুছিয়ে দেশ ছাড়ার প্রিপারেশন নেয়, তা সত্যিই বড় প্রশ্ন। জামিন মানেই তো খালাস নয়; এই সময়ে তাদের ওপর কঠোর নজরদারি থাকা উচিত ছিল। সরকার যদি সত্যিই অনলাইন গ্যাম্বলিংয়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে থাকে, তবে তার আসল পরীক্ষা কিন্তু এখনই। মুখের কথার চেয়ে মানুষ এখন অ্যাকশন দেখতে চায়।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু ওই ব্যক্তির কাছে কানাডার বৈধ কাগজপত্র রয়েছে এবং তিনি যেকোনো মুহূর্তে পালিয়ে যেতে পারেন, তাই অবিলম্বে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা এবং পাসপোর্ট জব্দ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের উচ্চমহল থেকে যে শতভাগ আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, সেটি যেন কেবল কাগজে-কলমে বা বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। এই ধরনের “মূল হোতা”দের যদি এখনই শক্ত হাতে দমন করা না যায়, তবে এই অবৈধ সিন্ডিকেটগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আশা করি, সংশ্লিষ্ট আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা বিভাগ দ্রুত এই বিষয়ে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে।

এই প্রসঙ্গে বিএফআইইউ, দুদক এবং এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন। (চলবে…)

ট্যাগঃ

শেয়ার করুন

ফ্যাসিস্টের ডিজিটাল অর্থ পাচারকারী, শত শত কোটি টাকা পাচার করেও বহাল তবিয়তে মুনতাকিম আহমেদ (পর্ব-১)

আপডেট: ০১:০৫:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন, কর অব্যাহতি এবং সরকারি প্রণোদনার ওপর ভর করে বাংলাদেশ যখন ডিজিটাল বিপ্লবের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই এই খাতটিকে অর্থ পাচারের সবচেয়ে নিরাপদ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আর এই পুরো মাস্টারপ্ল্যানের নেপথ্যে ছিলেন ডিগ্রিধারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মুনতাকিম আহমেদ। প্রথাগত আর্থিক অপকর্মের বাইরে গিয়ে মুনতাকিম আহমেদ তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে ব্যবহার করেছিলেন অবৈধ বিষয়কে বৈধ রূপ দেওয়ার কাজে। তিনি মূলত উল্কা গেমস (Ulka Games) নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মূল আর্থিক পরিকল্পনাকারী বা আর্কিটেক্ট ছিলেন, যা আসলে ছিল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একটি অনলাইন জুয়া সিন্ডিকেটের সম্মুখভাগ।

আইটি-এনাবেল্ড সার্ভিসেস (আইটিইএস) বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সরকারি সুযোগ-সুবিধার ফাঁকফোকর গলিয়ে উল্কা গেমসকে সম্পূর্ণ করমুক্ত সুবিধা এনে দেন মুনতাকিম। ভুয়া সেলস বা বিক্রি দেখিয়ে এমন এক নিখুঁত আবরণ তৈরি করেন, যা দেশের আইনপ্রয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর রাডারের সম্পূর্ণ বাইরে ছিল।

এই বৈধতার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল মূল উদ্দেশ্য-অর্থ পাচার। উল্কা গেমসের মূল প্যারেন্ট কোম্পানিটি একটি প্রতিবেশী দেশে অবস্থিত হওয়ায়, মুনতাকিম মোহাম্মদ অত্যন্ত চতুরতার সাথে আইনি চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার বা রেপ্যাট্রিয়েট করেন। তিনি অবৈধ জুয়ার কার্যক্রম থেকে বিদেশে পাচার করা মুনাফার প্রতিটি অংশ থেকেই মোটা অঙ্কের কমিশন পেতেন।

আইটি খাতের সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করায় এই টাকার উৎস বা মানি ট্রেইল খুঁজে পাওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে উল্কা গেমসের জুয়া সংক্রান্ত সব খবর প্রকাশ্যে আসার পর র্যাব শেষ পর্যন্ত পুরো চক্রটির রহস্য উদ্ঘাটন করে এবং মুনতাকিম আহমেদকে গ্রেপ্তার করে। পরে ফ্যাসিবাদী সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি জামিন লাভ করেন এবং সময় নষ্ট না করে উত্তর আমেরিকার একটি দেশে পালিয়ে যান।

মুনতাকিম আহমেদ এই আর্থিক জালিয়াতির ইতিহাস কেবল উল্কা গেমসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে তিনি দেশের একটি নামী মার্চেন্ট ব্যাংক ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ফাইন্যান্স বিভাগের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড এবং পরবর্তীতে চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ব্র্যাক ইপিএল-এ থাকাকালীন সময়েই মনতাকি পুঁজিবাজারের কিছু কুচক্রী মহলের সাথে হাত মেলান এবং বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন। তার সময়েই ব্র্যাকের তহবিল থেকে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার মার্জিন ঋণ দেওয়া হয়, যার প্রায় পুরোটাই পরবর্তীতে মন্দ ঋণে পরিণত হয়।

পুঁজিবাজারের বিপর্যয় ও ছাঁটাই: ‘জেনারেশন নেক্সট’- এর বহুল আলোচিত স্ক্যান্ডালের পেছনে মুনতাকিম আহমেদের সরাসরি ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে জেনারেশন নেক্সট-এর আর্থিক বিবরণী জালিয়াতি ও উইন্ডো ড্রেসিং করার মূল কারিগর ছিলেন তিনি। তার তৈরি করা ভুয়া রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানিটিকে লিস্টিংয়ের অনুমতি দেয়। পরবর্তীতে এই কোম্পানিটি বাজারে ধসে পড়ে এবং হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হন। এই কেলেঙ্কারির পর ব্র্যাক কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে।

অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকিং খাত থেকে বিতাড়িত হয়ে মুনতাকিম আহমেদ গড়ে তোলেন তার নিজস্ব কনসালটেন্সি ফার্ম ‘এইস অ্যাডভাইজরি’ (Ace Advisory)। দৃশ্যত এটি একটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হলেও, এর মূল কাজ ছিল বিদেশি কোম্পানিগুলোকে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া, স্থানীয় আইন ও নিয়মকানুন বাইপাস করা এবং গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অর্থ দিয়ে কাজ হাসিল করার বুদ্ধি দেওয়া। এছাড়া বিদেশি কোম্পানির ক্ষেত্রে যেখানে নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশি পার্টনার বা মালিকানা থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে এইস অ্যাডভাইজরি টাকার বিনিময়ে ভুয়া বাংলাদেশি মালিকানার (Fake Ownership) ব্যবস্থা করে দিত। মনতাকি নিজে এই সমস্ত বেনামী ও ভুয়া কোম্পানির বোর্ডে বসতেন।

একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়া সিন্ডিকেট চালানো, শেয়ারবাজারে শত কোটি টাকার জালিয়াতি করা কিংবা সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনায়াসে ২০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা—কোনো সাধারণ অপরাধীর পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক অভয়ারণ্য। আর মুনতাকিম আহমেদের ক্ষেত্রে সেই অসীম ক্ষমতার উৎস ছিলেন পূর্ববর্তী সরকারের প্রভাবশালী (মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল)।

আরও অভিযোগ রয়েছে, মুনতাকি তার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এইস অ্যাডভাইজরি’-কে কেবল কর ফাঁকি বা ভুয়া মালিকানা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং এই কোম্পানির আড়ালেই চলত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজ হাসিল করার মূল খেলা। উপশিক্ষামন্ত্রীর প্রভাবকে পুঁজি করে এইস অ্যাডভাইজরি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিগত জায়গায় লবিং করত। বিদেশি ও দেশি বিতর্কিত কোম্পানিগুলোকে আইনি ফাঁকফোকর গলে বের করে আনা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে চুপ করিয়ে রাখা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার চুক্তি পাইয়ে দেওয়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই প্রতিষ্ঠানটি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) হাসান হাবিব-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে উল্কা গেমস লিমিটেড (ভারতীয় কোম্পানি ‘মুনফ্রগ ল্যাবস’-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান, যা তিন পাত্তি গোল্ড গেমের জন্য পরিচিত) এর বিরুদ্ধে একটি নিবিড় ও কঠোর তদন্ত পরিচালিত হয়।

অক্টোবর ২০২২ সালে মহাখালী ও উত্তরা থেকে র‌্যাব মুনতাকিম আহমেদসহ চক্রের ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে ছবি: সংগৃহীত

তদন্তে দেখা যায়, কোম্পানিটি সরকারের দেওয়া আইটি এনাবল্ড সার্ভিসেস (আইটিইএস) খাতের শতভাগ কর অব্যাহতির সুযোগ নিয়েছিল। কিন্তু এর আড়ালে তারা মূলত গেমের ‘ইন-অ্যাপ পারচেজ’ ও চিপস বিক্রির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা আয় করে তা লুকিয়ে রাখছিল এবং সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছিল।

হাসান হাবিবের জোরালো তৎপরতায় উল্কা গেমসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয় এবং তদন্তের মাধ্যমে তাদের এই মহাদুর্নীতি উন্মোচন করে প্রতিষ্ঠানটি থেকে বিপুল পরিমাণ বকেয়া ট্যাক্স ও জরিমানা আদায় করা হয়।

এই সফল অভিযানের পর, আইটি খাতের আড়ালে যেন কেউ কর ফাঁকি দিতে না পারে, সেজন্য এনবিআর কর অব্যাহতি প্রাপ্ত অন্যান্য আইটিইএস কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি ও স্ক্রুটিনি কঠোরভাবে বাড়িয়ে দেয়।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ওয়াহিদুন্নবী বিপ্লব বলেন, অনলাইন গ্যাম্বলিং বা জুয়া শুধু তরুণ সমাজকে ধ্বংস করছে না, এর মাধ্যমে হুন্ডির সাহায্যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতি যখন একটা চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে, তখন এই ধরনের অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। জামিনে থাকা একজন অপরাধী কীভাবে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ পায় এবং ব্যবসা গুছিয়ে দেশ ছাড়ার প্রিপারেশন নেয়, তা সত্যিই বড় প্রশ্ন। জামিন মানেই তো খালাস নয়; এই সময়ে তাদের ওপর কঠোর নজরদারি থাকা উচিত ছিল। সরকার যদি সত্যিই অনলাইন গ্যাম্বলিংয়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে থাকে, তবে তার আসল পরীক্ষা কিন্তু এখনই। মুখের কথার চেয়ে মানুষ এখন অ্যাকশন দেখতে চায়।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু ওই ব্যক্তির কাছে কানাডার বৈধ কাগজপত্র রয়েছে এবং তিনি যেকোনো মুহূর্তে পালিয়ে যেতে পারেন, তাই অবিলম্বে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা এবং পাসপোর্ট জব্দ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের উচ্চমহল থেকে যে শতভাগ আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, সেটি যেন কেবল কাগজে-কলমে বা বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। এই ধরনের “মূল হোতা”দের যদি এখনই শক্ত হাতে দমন করা না যায়, তবে এই অবৈধ সিন্ডিকেটগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আশা করি, সংশ্লিষ্ট আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা বিভাগ দ্রুত এই বিষয়ে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে।

এই প্রসঙ্গে বিএফআইইউ, দুদক এবং এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন। (চলবে…)