বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব: সত্যি নাকি গল্প!

এইচ কে জনি: বেশ কয়েকদিন যাবৎ পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল আচরণ করছে। দু-তিন কমলে একদিন নামমাত্র উত্থান, ফের পতনে লেনদেনের সমাপ্তি। এতোদিন অবশ্য এর কারণ সবারই অজানা থাকলেও এখন যোগ হয়েছে নতুন ইস্যু। তাও আবার যেনো-তেনো ইস্যু না, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ। অবশ্য সবাই না, তবে অধিকাংশ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কিংবা কিছু কিছু গণমাধ্যমে ফলাও করে বলা হচ্ছে যে, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে পড়ছে। আসলেই কি তা সত্যি না মনগড়া কোনো গল্প?

যেকোনো ঘটনার প্রভাব অবশ্যই সে সম্পর্কিত বা সে ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে। তবে তা স্থান, কাল পাত্রভেদে। সেই হিসেবে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবও একটি দেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে পড়তে পারে যদি না এর সুবিধা-অসুবিধা আমাদের জানা থাকে। বিষয়টি আরেকটু পরিস্কার করে যদি এইভাবে বলি যে, এ যুদ্ধের কারণে আমার দেশ বা আমি ব্যক্তিগতভাবে কোন বিষয়ে লাভবান হবো অথবা আমার কি লোকসান হবে- তা যদি আমি না-ই জানি তবে তাতে আমার কিছুই আসবে যাবে না। আর যদি জানি যে এ কারণে আমার জীবনে ঠিক কোন জায়গাটি প্রভাবিত হবে তবে আমি ঠিক সেই জায়গায়ই নজর দেবো। তার মানে হচ্ছে- এ যুদ্ধ বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের কোন কোন বিষয়কে প্রভাবিত করছে তা না জেনে শুধুমাত্র ভাবাবেগে যুদ্ধকে শেয়ারবাজারে পতনের কারণ বলাটা কতটুকু যৌক্তিক?

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

‘যুদ্ধের প্রভাবেই শেয়ারবাজারে পতন হচ্ছে’ কথাটা বলার আগে আমাদের অর্থনীতি বা ব্যবসা-বানিজ্যে এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে হবে। হয়তো আমার ধারণা ভূলও হতে পারে, তবুও আমি মনে করি আমাদের দেশের অধিকাংশ বিনিয়োগকারী এমনকি অধিকাংশ জনগণই জানেন না যে রাশিয়া বাংলাদেশের অর্থনীতিটা কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। অর্থ্যাৎ রাশিয়া-বাংলাদেশের বানিজ্যে কোন কোন খাত অন্তর্ভূক্ত। এটা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে হলে ভিন্ন কথা ছিল। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটটা একটু ভিন্ন। আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীরা এখনও কান কথায় বা হুজুগে বছরের পর বছর লোকসান দেয়া ১০ টাকার ফেসভ্যালুর শেয়ার ৫ গুন, সাত গুন বেশি দামে কেনা-বেচা করে।

এবার জেনে নেই রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কোন কোন খাতে বানিজ্য বা ব্যবসায় হয়ে থাকে। ইউক্রেনের ওপর হামলার জের ধরে এরমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপানসহ একাধিক দেশ রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যার বেশিরভাগই অর্থনৈতিক। এই যুদ্ধের প্রভাবে এরমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম।

এছাড়া সূর্যমুখী তেল, ভুট্টা, গম ইত্যাদি খাদ্য পণ্যের বাইরে প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় রফতানিকারক দেশ রাশিয়া। ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পে কাজ করছে রাশিয়া। সেইসঙ্গে বাংলাদেশ সামরিক সরঞ্জাম, খাদ্যপণ্য ইত্যাদি রাশিয়া থেকে আমদানি করে থাকে। এছাড়া এখন তৈরি পোশাক শিল্পের নতুন বাজার হিসাবেও বিবেচনা করা হচ্ছে রাশিয়াকে।
বিশেষ করে গমের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। এই দুটি দেশ থেকে ভুট্টার ২০ শতাংশ আসে। আবার তৈরি পোশাক রফতানির নতুন বাজার হিসাবে রাশিয়াকেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে থেকে রাশিয়ায় রফতানি হয়েছে ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক। আমদানি হয়েছে ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের পণ্য, যার বেশিরভাগটাই খাদ্য পণ্য।
এবার আসি মূল প্রসঙ্গে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে মোট ২২ খাতের ৬২১টি সিকিউরিটিজ/কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। ট্রেজারি বন্ড বাদে ২১ খাতে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ/কোম্পানির সংখ্যা ৩৯৯টি। আর এই ২১ খাতের মধ্যে মাত্র কয়েকটি খাত রাশিয়া ও ইউক্রেনের ব্যবসা-বানিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত। সেগুলো হলো- খাদ্য ও আনুষঙ্গিক, বিদ্যুত ও জ্বালানি এবং পোষাক ও বস্ত্র। কাজেই প্রভাব যদি পড়েই তবে এই কয়েকটি খাতে পড়বে, ব্যবসায় খারাপ হলে এ খাতগুলোরই খারাপ হবে। তাহলে কেন পুঁজিবাজারের সব খাতের শেয়ারের ঢালাও দরপতন হচ্ছে।

ডিএসইর তথ্যানুযায়ী, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রোববার প্রায় ৯৬ শতাংশ বা ৩৬৫ কোম্পানির শেয়ার দর কমেছিল, বেড়েছে মাত্র ১০টির। আজ বুধবারও (৩ মার্চ ২০২২) মাত্র ৫৮টি কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে, কমেছে ২৮৮টি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ২৮৮টি কোম্পানির সবগুলোই কি ওই তিন খাতের মধ্যে পড়ে?

সব বাদ দিলাম, আজকের খাতভিত্তিক লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যাংক খাতে তালিকাভুক্ত ৩৩ কোম্পানির মধ্যে মাত্র দুইটি কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে। এখন প্রশ্ন হলো- ব্যাংক খাতের সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কি সম্পর্ক?

আমরা যদি উন্নত বিশ্বের অর্থ্যাৎ ইউরোপ-আমেরিকার পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের আচরণের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে, সমস্যাটা যেখানে সেটাই তারা এভয়েড বা এড়িয়ে চলে। কোনো খাতে কোনো নেগেটিভ তথ্য থাকলে সে খাতেই এর প্রভাব পড়ে এবং লোকসান কমাতে যেসব খাতে বিনিয়োগ করলে মুনাফার সম্ভাবনা রয়েছে সেসব খাতে বিনিয়োগ স্থানান্তর করে। আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীদের মতো হুজুগে সব শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগ গুটিয়ে নেয় না।

আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- যেখানে এই যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও বিশ্বের অধিকাংশ পুঁজিবাজারের সূচক বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল আচরণ করছে। এতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে সমস্যাটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ না, সমস্যাটা আমাদের মনস্তাত্ত্বিক। ‘গাছে কাঠাল রেখে গোফে তেল’ দেয়ার অভ্যেস আমরা যতোদিন না ছাড়তে পারবো, ততোদিন ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে মতো কল্প-কাহিনি তৈরি করে নিজেদের লোকসান হজম করার পাশাপাশি মনকে সান্ত্বনা দিয়েই যাবো। তবে আপনার কষ্টার্জিত যে বিনিয়োগ আপনি আবেগের বশে খোঁয়ালেন তা কিন্তু আর ফেরত আসবে না-এটাই সত্য।

এটা দিবালোকের মতো সত্য যে, দেশের পুঁজিবাজারে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব্য গ্রহণের পর বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আমরা এটাও জানি বাজার উন্নয়নে বর্তমান কমিশন নিরলস কাজ করে যাচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। তবে বাজারে কারা কোন কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কিভাবে কারসাজি করছে, তাও এখন ওপেন সিক্রেট। পুঁজিবাজারের সকল স্টেকহোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি আমিও একজন সাংবাদিক হিসেবে কারসাজি ও অনিয়মের বিষয়ে বিএসইসির জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তব প্রতিফলণ দেখবো বলে বিশ্বাস করি।

আর যদি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ও এর নিরাপত্তা নিয়ে বলতে গেলে এতোটুকুই বলবো, বিনিয়োগের মূল উদ্দ্যেশ্যই মুনাফা করা। তবে তা হতে হবে যৌক্তিক পর্যায়ে। এজন্য প্রয়োজন সুচিন্তিত ও বিশ্লেষনধর্মী বিনিয়োগ। আপনি যেকোন ব্যবসায়ই করেন না কেন- আপনি যদি না জেনে, হুজুগে বা কান কথায় বিনিয়োগ করেন তবে আপনাকে লোকসানের সম্মুখীন হতে হবে। আর সেটা যদি হয় পুঁজিবাজার তাহলেতো আর কথায় নেই। বিনিয়োগের জন্য এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি খাত। একটু হের-ফের হলেই আপনি এবং আপনার পুরো পরিবারকে পথে বসতে হতে পারে।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির যেকোন অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের দায়ভার অবশ্যই নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর। তবে বিনিয়োগকারীরাও তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। তবে পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়-দায়িত্ব সবার কাঁধেই পড়ে।

মনে রাখতে হবে, পুঁজিটাতো আপনার। সেটার নিরাপদ বিনিয়োগ নিশ্চিত করার দায়িত্ব্যও আপনারই। আপনার ভূলে যদি তা হারিয়ে যায়, তাহলে তার দায় কারও নয়। আর তাই যেকোন কোম্পানিতে বিনিয়োগের পূর্বে কারও কথায় নয়, বরং ভালো করে যাচাই-বাছাইপূর্বক ভেবে-চিন্তে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ করুন।

বিজনেস জার্নাল/ঢাকা