বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স কয়েক বছর ধরেই নিম্নমুখী। উপরন্তু বেশকিছু ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এফডিআর হিসেবে রাখা ৫৫০ কোটি টাকাও আদায় করতে পারছে না কোম্পানিটি। বিআইএফএফএলের নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানও এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে মতামত দিয়েছে।

দেশের ব্যবসায়িক ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ২০১১ সালে যাত্রা করে বিআইএফএফএল। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বর্তমানে তা আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩০৮ কোটি টাকায়। মূলত অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যেই গড়ে তোলা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি বিআইএফএফএলের ২০১৯ সালের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করে সাইফুল শামসুল আলম অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। নিরীক্ষা ফার্মটি এর আগের দুই বছরও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করেছিল। আর্থিক বিবরণীতে বিআইএফএফএলের বিনিয়োগ ও সম্পদের বিষয়ে নিরীক্ষক এমফেসিস অব ম্যাটার হিসেবে তার মতামত দিয়েছে।

নিরীক্ষকের মতামত অনুসারে, তিন মাস মেয়াদি স্থায়ী আমানত হিসেবে ১২টি ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিআইএফএফএলের ৫৫৫ কোটি ৯০ লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে বিডি ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে ৮ কোটি ৫৯ লাখ, বিআইএফসি লিমিটেডে ৫৯ কোটি ৫৩ লাখ, পদ্মা ব্যাংক লিমিটেডে ১১২ কোটি ৭২ লাখ, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে ৬১ কোটি ৩১ লাখ, ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডে ২০ কোটি ৮৫ লাখ, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক লিমিটেডে ৪৪ কোটি ৩৩ লাখ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডে ৭৯ কোটি ৪৫ লাখ, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডে ৬০ কোটি ৭০ লাখ, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডে ২৯ কোটি ১৩ লাখ, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে ২৫ কোটি, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডে ১৬ কোটি ২১ লাখ এবং ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেডে ৩৮ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠির বরাত দিয়ে নিরীক্ষক জানিয়েছে, এফডিআরের অর্থ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার অবস্থার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এই এফডিআরে বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু দেশের বিদ্যমান ব্যবসায়িক ও আর্থিক খাতের পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব এফডিআরে বিনিয়োগের বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণ ছাড়াই ২০১৯ সালের আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করার অনুমোদন দিয়েছে। আর্থিক বিবরণীতে এফডিআরের বিপরীতে প্রাপ্য সুদকে অপরিশোধিত হিসেবে ইন্টারেস্ট সাসপেন্স হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকও সঞ্চিতি রাখার ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার পাশাপাশি এফডিআরের অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য বিআইএফএফএলকে পরামর্শ দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সের কাছ থেকে ১৪ লাখ ৭৫ হাজার, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের কাছ থেকে ৭ লাখ ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের কাছ থেকে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।

বিআইএফএফএলের স্থায়ী সম্পদের বিষয়ে নিরীক্ষক তার মতামতে জানিয়েছে, বিআইএফএফএল ২০১৬ সালে বোরাক ইউনিট হাইটসে অফিসের জন্য ১৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছে, যা প্রতিষ্ঠানটি তার স্থায়ী সম্পদ হিসেবে দেখিয়েছে। অথচ কোম্পানির নামে অ্যাপার্টমেন্টটি মিউটেশন করার প্রক্রিয়া এখনো চলমান। এটিকে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (আইএএস)-১৬-এর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে নিরীক্ষক।

বিআইএফএফএলের অন্যান্য বিনিয়োগের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি পাঁচটি বিদু্যুৎ কোম্পানির প্রেফারেন্স শেয়ারে ১৮৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে রাজ লংকা পাওয়ারে ২৪ কোটি ২৪ লাখ, ডরিন পাওয়ার হাউজ অ্যান্ড টেকনোলজিসে ৪০ কোটি, এসিই অ্যালায়েন্স পাওয়ারে ৩৫ কোটি, কুশিয়ারা পাওয়ারে ৫৭ কোটি, ভৈরব পাওয়ারে ২০ কোটি এবং সামিট গাজীপুর-২ পাওয়ারে ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। কম্পিউটার সোর্স লিমিটেডের কমার্শিয়াল পেপারে ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে বিআইএফএফএলের। অন্যতম শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় কম্পিউটার সোর্সের নাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিআইএফএফএলের বিনিয়োগের বিপরীতে কোনো ধরনের অর্থ পরিশোধ করছে না। এছাড়া আইডিএলসি জিরো কুপন বন্ডে ১৪ কোটি ৩৪ লাখ এবং আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের জিরো কুপন বন্ডে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে বিআইএফএফএলের।

প্রেফারেন্স শেয়ার, কমার্শিয়াল পেপার এবং জিরো কুপন বন্ডের বিপরীতে বিআইএফএফএলের মোট ১৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমার্শিয়াল পেপারে ৫ কোটি ৮৭ লাখ, কম্পিউটার সোর্সের কমার্শিয়াল পেপারে ৩ কোটি ৪১ লাখ এবং আইডিএলসি ও আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানির বন্ডে ৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।

কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন মানদণ্ডে বিআইএফএফএলের পারফরম্যান্স নিম্নমুখী। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের বিপরীতে রিটার্ন ২০১৫ সালে ছিল ৪ শতাংশ। যা সর্বশেষ ২০১৯ সাল শেষে কমে মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ইকুইটি বিনিয়োগ করা সরকারের রিটার্নের পরিমাণও ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির ইকুইটির বিপরীতে রিটার্নের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। যা ২০১৯ সাল শেষে কমে ১ দশমিক ৯১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিআইএফএফএলের মুনাফা মার্জিনের পরিমাণও ক্রমেই কমতির দিকে। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা মার্জিন ছিল ৫৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। যা ২০১৯ সালে এসে ২০ দশমিক ৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ ছিল না বললেই চলে। তবে ২০১৯ সালে এসে খেলাপি ঋণ বেড়ে ১ দশমিক ৩৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যেখানে এর আগের ২০১৮ সাল শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৯ সাল শেষে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ও লিজ পোর্টফোলিওর আকার দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকায়। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত বিআইএফএফএল ৯৫টি প্রকল্পে ৭ হাজার ১০৮ কোটি টাকার ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ৭০টি প্রকল্পে ৩ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা ছাড় করেছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইএফএফএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এসএম আনিসুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, কিছু এফডিআরের বিপরীতে আমরা কিছু অর্থ আদায় করতে সক্ষম হয়েছি। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। সব মিলিয়ে ২০১৯ সালের তুলনায় এফডিআর বাবদ পাওনা অর্থের পরিমাণ কমেছে। আমরা প্রতিনিয়তই অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছি। কম্পিউটার সোর্স আমাদের পাওনা অর্থ পরিশোধ করছে না। অর্থ আদায়ে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এফডিআরের অর্থ আদায় করতে না পারা এবং মিউটেশন হওয়ার আগেই অ্যাপার্টমেন্টকে স্থায়ী সম্পদে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে মতামত দিলেও কম্পিউটার সোর্সের কাছ থেকে পাওনা অর্থের বিষয়ে নিরীক্ষক তার পর্যবেক্ষণে কোনো কিছু উল্লেখ করেনি। নিরীক্ষার মূল বিষয়বস্তুর বিষয়ে নিরীক্ষক জানিয়েছে, তারা প্রতিষ্ঠানটির ৮০ শতাংশ ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ পর্যালোচনা করেছে ও কোম্পানিটির নিরীক্ষা কাজে ১ হাজার ৯২৬ কর্মঘণ্টা ব্যয় করেছে।

বিআইএফএফএলের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সাইফুল শামসুল আলম অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের বেশ কয়েকজন অংশীদার ও পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।সূত্র:বণিকবার্তা

ঢাকা/এনইউ

আরও পড়ুন: