বিশ্বে যে ১০টি আশ্চার্য পরিবর্তন আনবে করোনাভাইরাস

বর্তমান বিশ্ব সমাজটি সংহতি, সহমর্মিতা, দূরদৃষ্টি ও সমবেদনায় মোড়ানো নয়। বরং লোভ, প্রতারণা ও ক্রুদ্ধ প্রতিযোগিতাময় ছিল। সেটাই টের পেল সবাই সুপারশপগুলোর খালি তাকের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। কোভিড–১৯ পুরো সমাজকে তাই আয়নার সামনে নগ্ন করে ফেলেছে।

২০১৯–এর ডিসেম্বরের পরের পৃথিবী আগের মতো আর থাকবে না। পরিবর্তনটা হবে অস্বাভাবিকভাবে। নতুন অনেক কিছুর জন্য প্রস্তুত হতে হবে মানব প্রজাতিকে। কিছু কিছু পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে উঠবে।

১. শুরু হবে অটোমেশনের যুগ: ভাইরাস–ঝড় থামার পরই পুঁজি তার পুনরুত্থানের জন্য অটোমেশনের ওপর জোর দেবে। কারখানা ও সাপ্লাই চেইন দুটোর অটোমেশন করা গেলে হবু ভাইরাস যুদ্ধগুলোকে এড়ানো সহজ হতে পারে।

২. সংকুচিত হবে শ্রম বাজার: অটোমেশন যুগের ব্যাপকতা বাংলাদেশের মতো শ্রমজীবীনির্ভর দেশগুলোর জন্য খারাপ খবর। বিশ্বজুড়ে এশিয়া-আফ্রিকার শ্রমিক গ্রহণে স্বাস্থ্য বিবেচনা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পেতে থাকবে এখন। অপ্রশিক্ষিত শ্রমিক গ্রহণের হারও কমে আসবে।

৩. দোকানদারদের কাছ থেকে ‘বাজার’ চলে যাবে: উৎপাদন ও বিপণনের ব্যাপকভিত্তিক এক অনলাইন যুগে ঢুকছে পৃথিবী। দোকানদারদের কাছ থেকে ‘বাজার’ চলে যাবে ‘ই-কমার্স’-এর দুনিয়ায়। ‘মল’গুলোর জন্য এটা দুঃসংবাদের মতোই শোনাবে। ঘরে ‘কাজ’ এবং অনলাইনে ‘বিক্রি’ শিখতে চলেছে শিগগিরই বিপুল শ্রমশক্তি।

৪. পাল্টে যাবে সামাজিক মূল্যবোধ: করোনাভাইরাস কেবল বিশ্বব্যবস্থার ধরনই নয়, হয়তো অনেক সামাজিক মূল্যবোধই আমূল পাল্টে দিতে পারে। নতুন ‘স্বাভাবিক’-এর পথে ২০১৯-এর ডিসেম্বরের আগের স্বাভাবিক অবস্থা হারিয়ে ফেলব আমরা। মহামারির অতীত ইতিহাস অন্তত আমাদের তেমন ধারণাই দেয়। তবে সামাজিক পরিবর্তনের ভবিষ্যৎটি অনুমান করা এখনো কঠিন। কারণ ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের অতিপ্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বিশ্ব।

৫. বাড়বে রাষ্ট্রীয় নজরদারি: ইতোমধ্যে করোনা রাষ্ট্রীয় নজরদারি বাড়ার ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে। কেবল বর্তমান ধাঁচের বায়োমেট্রিক কলাকৌশলই নয়, মানুষের হাত ধোয়া পর্যন্ত নজরে রাখার দিকে যাবে ‘রাষ্ট্র’। কোনো কোনো দেশে কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক হতে পারে ভবিষ্যতে।

৬. বাড়বে নিয়ন্ত্রণ: চলাচল ও সমাবেশে স্বাধীনতার ধারণা আগের মতো আর শর্তহীন থাকবে না। মানুষের নিরাপত্তা এবং ‘নিরাপদ সমাজ’ গড়ার কথা বলেই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তাদের শারীরিক সংঘ এড়িয়ে অনলাইনভিত্তিক করার উদ্যোগ চলবে। অনেক দিন ধরে প্রযুক্তির রাজনীতি এ রকম উদ্যোগ চালাচ্ছিল। এবার সেটা প্রাতিষ্ঠানিকতা পাবে খানিকটা।

৭. কতৃত্ববাদী শাসন মডেল: চীনের কর্তৃত্ববাদী শাসন মডেল করোনা প্রতিরোধে কার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ওপর অবশ্যই নতুন করে বিশেষ চাপ তৈরি হলো। উদারনৈতিক ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য সামনের সময়টা হবে কঠিন। তাকে রক্ষণশীল নতুন অনেক আইনের মুখে পড়তে হবে তাড়াতাড়ি।

৮. বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনার নতুন যুগ: অনেক ভাষ্যকার করোনা–পরবর্তী বিশ্বে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের দিকে মানুষের বাড়তি মনোযোগেরও ইঙ্গিত করছেন। এটা বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনার নতুন এক যুগের দিকে নিয়ে যেতে পারে সভ্যতাকে। উপাত্ত-বিশ্লেষণই যখন মানুষকে প্রতিদিনকার করণীয় সম্পর্কে জানাবে।

৯. অনলাইনে শিক্ষা: একই অবস্থা শিক্ষায়। প্রায় ৭৫টি দেশে স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক দেশেই এ রকম বন্ধ বর্তমান মেয়াদ শেষে আরও বাড়াবে। করোনার পরও উচ্চশিক্ষা ক্রমে অনলাইনভিত্তিক হতে চলেছে।

১০. করোনা-জাতীয়তাবাদের কাল শুরু: করোনার সংক্রমণে রাষ্ট্রগুলো যেভাবে নিজ নিজ সীমান্ত নিয়ে সচেতন হয়ে গেল, তাতে স্পষ্ট, রাষ্ট্র উবে যাওয়ার প্রচারণা আর এগোবে না। ইতিমধ্যে এই প্রবণতাকে ‘করোনা-জাতীয়তাবাদ’ বলা শুরু হয়েছে। এর আরও গোছানো রূপ দেখতে শুরু করব আমরা শিগগিরই। আন্তর্দেশীয় খোলামেলা সীমান্তগুলো আর আগের মতো থাকবে না।