• কাজ শুরুর পর বন্দর কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের আপত্তি
• আপত্তির কারণে বদল হয়েছে নকশা
• শেষ হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ, কাজ ৪০ শতাংশ
• প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩ হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা

চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শুরুর পর আপত্তি জানায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তারও আগে আপত্তি জানায় পুলিশ। এতে থমকে আছে বহুল প্রতীক্ষিত এ প্রকল্পের কাজ। ইতোমধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে কাজ হয়নি অর্ধেকও। এদিকে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে হু হু করে।

কাজ শুরুর পর বিভিন্ন সংস্থার আপত্তিতে হতাশ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্প পাস করার আগে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নকশা নিয়ে সিডিএ কোনো কথা বলেনি বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘কাজ শুরুর পর বিভিন্ন সংস্থার আপত্তির মুখে প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। আপত্তির কারণে নকশাও বদল করা হচ্ছে। ফলে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে।’ 

‘কাজ শুরুর আগে কেন আপত্তি জানানো হয়নি’- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্প পাস করার আগে বন্দরের সঙ্গে কয়েকবার বৈঠক করেছি। তখন তারা নিরাপত্তার বিষয়টি তোলেনি। এখন তুলছে। যেসময় প্রকল্পটি পাস করা হয় তখন সবার সঙ্গে কথা বলেই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পাস করা হয়েছিল। তখন কোনো সংস্থা থেকে অভিযোগ বা কিছুই বলেনি। কাজ শুরুর পরপরই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নকশা পরিবর্তনের কথা বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে কাজের গতি কমে গেছে। সোমবার (২২ ফেব্রুয়ারি) এ বিষয়ে বৈঠক রয়েছে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উপব্যবস্থাপক (ভূমি) ও নকশা জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সদস্য জিল্লুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘নকশা তৈরি করে একনেকে প্রকল্প পাস করার আগে সিডিএর পক্ষ থেকে বন্দরের সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ করা হয়নি। সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান এম এ ছালাম এ কাজটি করেছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘নকশা জটিলতা নিরসনের লক্ষ্য গঠিত কমিটির সদস্যরা সম্প্রতি স্থান পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু কমিটির রিপোর্ট এখনও তৈরি হয়নি। বন্দর থেকে সিডিএকে বলা হয়েছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ডান দিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য।’

বন্দরের অবস্থান খুবই পরিষ্কার। সিডিএ যদি ট্রাক ব্যবস্থাপনা ঠিক রেখে কাজ করতে পারে তাতে বন্দরের আপত্তি নেই। যদি বন্দর ভবনের সামনের রাস্তায় ব্লক করে কাজ করে তাহলে বিরাট যানজটের সৃষ্টি হবে। বারেক বিল্ডিংয়ের কাছে গিয়ে রাস্তা ৬০ ফিটে নেমে এসেছে। সিডিএর কাজ করতে গিয়ে চল্লিশ ফুট ব্লক করে ফেলে। ২০ ফুট রাস্তা দিয়ে তো বন্দর এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা হবে না।

জিল্লুর রহমান

সিডিএ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১১ জুলাই একনেক সভায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে  প্রকল্পটি যখন অনুমোদন পায়, তখন তিন বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০২০ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়। নগরীর লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত চার লেনের এ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দৈর্ঘ্য হবে সাড়ে ১৬ কিলোমিটার। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী এর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। ২০২০ সাল পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় এসে নকশা জটিলতায় থমকে গেছে প্রকল্পের কাজ। 

জানা গেছে, শুরুতে বন্দর লাগোয়া সড়কের ওপর দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু বারিক বিল্ডিং থেকে সল্টগোলা অংশে মূল সড়কের পাশেই বন্দরের প্রধান জেটিগুলো থাকায় নিরাপত্তার কারণ ও কাজ শুরুর পর বন্দর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণ দেখিয়ে আপত্তি তোলে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এ অংশের প্রায় তিন কিলোমিটার নকশা এখনও চূড়ান্ত করতে পারেনি সিডিএ। নকশা চূড়ান্ত করার পর জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হবে বলে জানা গেছে।

সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, বন্দরের পার্শ্ববর্তী নগরীর বারিক বিল্ডিং থেকে সল্টগোলা ক্রসিং পর্যন্ত বিমানবন্দর সড়কের অংশ ঠিক রেখেই একপাশে ৩০ ফুট সরিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ করা হবে। এতে বন্দর কর্তৃপক্ষের ৭ একরসহ ১২ একর বাড়তি ভূমির দখল প্রয়োজন হবে। এতে করে এলিভেটড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে খরচ বাড়বে কমপক্ষে ৫শ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নগরীর বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে সল্টগোলা ক্রসিং পর্যন্ত এলাকার বিদ্যমান সড়কের ওপর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আপত্তি তোলে। বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদ্যমান বিমানবন্দর সড়কের এ অংশটিতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলে বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে যাতে বন্দরের ভেতরে দেখা না যায় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ সিডিএ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে। পরবর্তী সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে সিডিএ সংশ্লিষ্টরা আলোচনা শুরু করে। যা এখনও চলছে। নকশা জটিলতা এখনও কাটেনি। এ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়েছে। বন্দর এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তবু নকশা জটিলতা কাটেনি। আজ (২২ ফেব্রুয়ারি) বন্দর কর্তৃপক্ষের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়া যেতে পারে।

এর আগে কাজ শুরুর পর পুলিশের আপত্তির কারণে সল্টগোলা অংশে অনেকদিন কাজ বন্ধ ছিল। নির্মাণকাজের কারণে নগরীতে যানজট বেড়ে যাবে- কারণ দেখিয়েই পুলিশ কাজ বন্ধ রাখতে বলেছিল। সর্বশেষ ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক পশ্চিম বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, এক্সপ্রেসওয়ের কাজে বাদামতলী মোড় থেকে বনানী গ্যাপ পর্যন্ত মূল সড়কের মাঝখানে ফেন্সিং (বেড়া) স্থাপন করা হয়েছে। যার ফলে যানজট চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া দেওয়ানহাট এলাকায়ও ফেন্সিং বা বেড়া স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে। আর তা করা হলে বিমানবন্দর পর্যন্ত তীব্র যানজটের সৃষ্টি হবে। চিঠিতে আগ্রাবাদ বনানী গ্যাপে স্থাপিত ফেন্সিং বা বেড়ার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেওয়ানহাট এলাকায় বেড়া স্থাপন না করার জন্য অনুরোধ করে পুলিশ। 

আগ্রাবাদ এলাকায় বেড়া স্থাপনের ফলে সড়কে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে যা তাৎক্ষণিক মেরামত করা হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়। এছাড়াও সমন্বয়ের অভাবে ওয়াসা ও গ্যাসের পাইপ লাইনে লিকেজ ও ফাটল দেখা দিচ্ছে। এগুলোর মেরামতকাজ দিনের বেলা করার কারণে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ মেরামতকাজ দিনের বদলে রাতে করার কথা বলা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে।

কাজ শুরুর পর বিভিন্ন সংস্থার এমন আপত্তিতে বিরক্ত চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘যেখানেই কাজ করতে যাচ্ছি, সেখানেই বাধার সম্মুখীন হচ্ছি। পুলিশ বাধা দিচ্ছে, বন্দর বাধা দিচ্ছে। অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়েও বেগ পেতে হচ্ছে। আমাদের যন্ত্রপাতি বসে আছে। কিন্তু কাজ করতে পারছি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কাজটি শুরু করেছি ২০১৯ সালের জুন মাসে। মাঝখানে করোনার কারণে কাজে ধীরগতি ছিল। ২০২৩ সালের ভিতরে এলিভেটড এক্সপ্রেসওয়ে চালু করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।’

 

আরও পড়ুন: