বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত স্বল্পমূলধনী কোম্পানিগুলোর দর প্রতিনিয়তই রেকর্ড করছে। এক বছরের ব্যবধানে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও ফান্ডগুলোর মধ্যে ৭০টির শেয়ার দর বেড়েছে ১০০ শতাংশের বেশি। আর ৫০ শতাংশের বেশি দর বেড়েছে ১৩৮টি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে বীমা খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো শেয়ার দরের উল্লম্ফন ছিল বেশি। পাশাপাশি উৎপাদন বন্ধ থাকা, লোকসানি কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরও ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের স্বাভাবিক উত্থান বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক। কিন্তু কোন কারণ ছাড়াই ২০ টাকার শেয়ারের দাম ২০০ টাকা হওয়ায় বাজারের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অশনি সংকেত দিচ্ছে। এখনই এই ইঙ্গিত বুঝতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তারা বলেন, বাজারের কারসাজি খুঁজে বের করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর নিজস্ব সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার রয়েছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর এ সফটওয়্যার ব্যবহারে উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। নতুবা, বাজারের লোকসানি ও দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার দরের এমন উল্লম্ফন রুখে দেয়া সম্ভব হতো।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ২০২০ সালের ৮ জুন থেকে ২০২১ সালে ৯ জুনের সমাপনী বাজার দর বিশ্লেষণ দেখা যায়, বিগত ১ বছরের ব্যবধানে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ৩৬৮টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৩০০টির। এ সময় দর অপরিবর্তিত ছিল ১০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও দর কমেছে ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর (নতুন তালিকাভুক্ত, ওটিসিতে যুক্ত ও ওটিসি থেকে মূল মার্কেটে ফিরে আসা কোম্পানিগুলো ব্যতিত)।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে তালিকাভুক্ত ৭০টি কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে ১০০ শতাংশের বেশি। এ সময় ৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর বেড়েছে ৫০০ শতাংশের বেশি। ৫০০ শতাংশ বেশি দর বাড়া কোম্পানিগুলো হলো- প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, বেক্সিমকো ও এশিয়া ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড।

১০০ শতাংশের বেশি দর বাড়া শীর্ষে থাকা ৫০টি কোম্পানির মধ্যে হলো পাইনিওর ইন্স্যুরেন্স, বিডি ফাইন্যান্স, ঢাকা ডাইং, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স, ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স, ঢাকা ইন্স্যুরেন্স, ফারইস্ট ইন্স্যুরেন্স, পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, ন্যাশনাল ফিড, নর্দান ইন্স্যুরেন্স, প্রিমিয়ার ইন্স্যুরেন্স, এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স, রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স, ম্যাকসন স্পিনিং, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স, শাহিনপুকুর সিরামিক, রূপালি ইন্স্যুরেন্স, প্রগতী ইন্স্যুরেন্স, ইসলামিক ইন্স্যুরেন্স, ফনিক্স ইন্স্যুরেন্স, সিএপিএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, জনতা ইন্স্যুরেন্স, গোল্ডেন ইন্স্যুরেন্স, জিল বাংলা সুগার, ডেল্টা স্পিনিং, সেন্টাল ইন্স্যুরেন্স, লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স, নিটল ইন্স্যুরেন্স, আরডি ফুড, বেক্সিমকো ফার্মা, জিবিবি পাওয়ার, আরামিট সিমেন্ট, বিডি থাই, কাট্টালি টেক্সটাইল, বিজিআইসি, মুজাফ্ফর হোসেন স্পিনিং, বে-লিজিং, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, সন্ধানী ইন্স্যুরেন্স, কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স, কেয়া কসমেটিকস ও আমান কটন ফেব্রিকস লিমিটেড।

প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স : পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ৩৬৮টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দর বেড়েছে প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের। বিগত ১ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার দর ১৯.৪ টাকা থেকে বেড়ে গতকাল সর্বশেষ ১৯২.৩ টাকায় লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ ১ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ১৭২.৯ টাকা বা ৮৯১.২৩ শতাংশ।

৩৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনধারী বীমা কোম্পানিটির সর্বমোট শেয়ারের ৩০.০৩ শাতংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের নিকট। বাদবাকি শেয়ারের ৮.৭৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিকট ও ৬১.২০ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিকট রয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে কোম্পানিটির ১২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড প্রদান করলেও ২০২০ সমাপ্ত বছরে কোম্পানিটি ১৭ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড প্রদান করেছিল।

দর বৃদ্ধির প্রসঙ্গে প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানি সচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের কোম্পানির ব্যবসায়িক এমন কোন উল্লম্ফন হয়নি যার কারণে শেয়ার দর এমন বাড়বে। বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে এজেন্ট কমিশন বন্ধ করা হয়েছে। এটা এমন কোন খবর নয় যার কারণে শেয়ার দর এমন বাড়বে। কোম্পানির কোন অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কোন অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নাই।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স : বিগত ১ বছরের ব্যবধানে পুঁজিবাজারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দর বেড়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের। এ সময় কোম্পানিটির শেয়ার দর ১৭.১ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২৯.৪ টাকায় লেনদেন হতে দেখা গেছে। এ সময় কোম্পানিটির শেয়ার ১১২.৬ টাকা বা ৬৫৮.৪৭ শতাংশ বেড়েছে।

৪৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা মূলধনধারী কোম্পানিটি ২০১৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। তালিকাভুক্তির পর ২০১৮ সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিটি সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটির সর্বমোট শেয়ারের ৫৯.৫৪ শতাংশ উদ্যোক্তা পরিচালকদের নিকট, বাদবাকি শেয়ারের ১৭.২৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিকট রয়েছে। এছাড়া ২৩.১৮ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিকট রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানি সচিব উত্তম কুমার দে বলেন, বীমা খাতের অধিকাংশ শেয়ারের দরই বেড়েছে। মূলত চাহিদা ও যোগানের সমন্বয়হীনতার কারণেই বাজারে এ খাতের শেয়ারের চাহিদা বেড়েছে। বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও এ খাতে সেই অনুযায়ী যোগান না থাকায় শেয়ারের দর বাড়ছে।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, বাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কারসাজি রোধে অনলাইন ও অফলাইন উভয় প্রক্রিয়ায় তদারকি করা হচ্ছে। কোন সন্দেহজনক লেনদেন হলেই এনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোর শেয়ার কারসাজির ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ব্যবহারের প্রচেষ্টা করা হয়। তাই আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে কারসাজি রোধে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে কাজ করছি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, সার্বিকভাবে পুঁজিবাজারের অনেক কোম্পানির শেয়ার দর এখনও প্রত্যাশিত মূল্যের নিচে রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতিক সময়ে বীমা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরে অপ্রত্যাশিত বাড়ছে। এগুলোর পিছনে কারসাজি রয়েছে কিনা তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে খুঁজে বের করা উচিত।

ঢাকা/এসআর