ঋতুর পালাবদলে বর্তমানে শীতকাল চলছে। হিমশীতল ঠাণ্ডায় প্রকৃতি জবুথবু হয়ে আছে।  শীত মানেই দিন ছোট, রাত বড়। এইজন্য শীতকালে রোজা রাখলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হয় না। কষ্ট করতে হয় না অন্য সময়ে রোজা রাখার মতো। তাই শীতকালের অন্যতম করণীয় হলো, কারো যদি কাজা রোজা বাকি থাকে, সেগুলো এই শীতকালে আদায় করে নেওয়া। এছাড়া নফল রোজা রাখারও এটি একটি উত্তম সময়।

হাদিসে এসেছে, হযরত আমের ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘শীতল গণিমত হচ্ছে শীতকালে রোজা রাখা।’ -তিরমিজি, হাদিস নং ৭৯৫।

মুসলমানদের প্রিয় ঋতু শীত। এ ঋতুতে ইবাদতের অবারিত সুযোগ পাওয়া যায়। বিশেষ করে রোজা রাখা এ ঋতুতে খুবই সহজ। কারণ দিনের সংক্ষিপ্ততা ও আবহাওয়ার শীতলতা রোজা রাখার কষ্ট দূর করে দেয়। দূর্বলতা কিংবা ক্লান্তির ছাপ থাকে না শরীরে।

এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘শীতের রাত দীর্ঘ হওয়ায় মুমিন রাত্রিকালীন নফল নামাজ আদায় করতে পারে এবং দিন ছোট হওয়ায় রোজা রাখতে পারে।’- বায়হাকি,হাদিস নং ৩৯৪০।

শীতকালকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেককারদের বসন্তকাল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাই ঈমানদারের জন্য শীতকাল ইবাদতের বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) হতে বর্ণিত। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘শীতকাল মুমিনের বসন্তকাল।’ -মুসনাদে আহমাদ,হাদিস নং ১১৬৫৬।

শীতকাল নফল রোজা রাখার সর্বোত্তম উত্তম মৌসুম। কারণ এ ঋতুতে রোজা রাখলে গ্রীষ্মকালের মতো তৃষ্ণার্ত হতে হয় না। এইজন্য হযরত হাসান বসরি বলেন, শীতকাল মুমিনের জন্য কতই না উত্তম। রাত দীর্ঘ হওয়ায় নামায পড়া যায় এবং দিন ছোট হওয়ায় রোজা রাখা যায়।
শীতকালে অনায়াসেই রোজা রাখা যায়। তেমন কোন কষ্ট করতে হয় না। রোদের প্রখরতা না থাকায় পিপাসাও তেমন লাগে না। তাই যাদের রমজানের কাজা রোজা আছে তাদের সেগুলো আদায় করা এ সময়ের প্রধান কর্তব্য। তাছাড়া শীতকালে বেশি বেশি নফল রোজা রাখার মোক্ষম সুযোগ রয়েছে।

হাদিসে এসেছে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ইরশাদ করেছেন, ‘বিশুদ্ধ নিয়তে যে ব্যক্তি এক দিন রোজা রাখল,আল্লাহ প্রতিদানস্বরূপ জাহান্নাম এবং ওই ব্যক্তির মাঝখানে ৭০ বছরের দূরত্ব তৈরি করে দেবেন।’-বুখারি,হাদিস নং ২৮৪০।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখতেন। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘আইয়ামুল বিদ’-এর রোজা। বিদ শব্দের অর্থ সাদা ও আলোকিত। এই তিনদিনের রজনীগুলো চাঁদের আলোয় ধবধবে সাদা ও আলোকিত থাকে বলে এগুলোকে আইয়ামুল বিদ বলা হয়।

এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আবু জর, যদি তুমি প্রতি মাসে তিনদিন রোজা রাখতে চাও তাহলে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে তা পালন করো।’ – তিরমিজি, হাদিস নং ৭৬১।

এছাড়াও শীতকালের প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবারও রোজা রাখা। কারণ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুই দিন রোজা রাখতে পছন্দ করতেন। শীতকালে দিন ছোট তাই প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে এ দু’দিন রোজা রাখা যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবারের রোজা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি এর উত্তরে বলেছিলেন, ‘এই দিনে আমার জন্ম হয়েছে এবং এই দিনে আমাকে নবুয়ত দেওয়া হয়েছে বা আমার ওপর কোরআন নাজিল হওয়া শুরু হয়েছে।’ – মুসলিম, হাদিস নং ১১৬২।

অন্য হাদিসে আরো এসেছে, রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সোম ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। কাজেই রোজাদার অবস্থায় আমার আমলগুলো আল্লাহর দরবারে পেশ করা হোক, এমনটি আমি পছন্দ করছি।’ – তিরমিজি, হাদিস নং ৭৪৭।

শীতকালে যেহেতু দিন ছোট তাই সবসময় রাখা আবার সুন্নত নয়। কারণ নফল রোজা লাগাতার রাখা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় নয়। হাদিসে এসেছে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘(নফল রোজার মধ্যে) আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা হলো দাউদ (আ.) এর রোজা। তিনি এক দিন রোজা রাখতেন আর এক দিন রোজা ত্যাগ করতেন।’ – বুখারি, হাদিস নং ৩৪২০।

লেখক : মুহাদ্দিস, খাদিমুল ইসলাম মাদরাসা, কামরাঙ্গীর চর, ঢাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here