দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় মাত্র দেড় লাখ টাকা। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এর অর্ধেকেরও কম। উভয় ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ব্যয় বাজেটের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনা করে এই মাথাপিছু ব্যয় ধরা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আয়ের সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করছে না। আয়ের সামান্য অংশ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে ব্যয় করায় মাথাপিছু খরচ কমে গেছে। এতে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে যে ব্যয় হয়, তা দুটি খাত থেকে জোগান দেওয়া হয়। এর একটি নানা ধরনের ফি-র নামে শিক্ষার্থী পরিশোধ করে। অপরটি আসে সরকারি বরাদ্দ থেকে।

এ ছাড়া কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বৈদেশিক উৎস থেকেও তহবিল পেয়ে থাকে। মূলত দুই খাতে আয়ের টাকার ওপর ভিত্তি করে চাহিদার নিরিখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যয়-বাজেট তৈরি করে। যেটা থেকে মাথাপিছু ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অন্যান্য খরচ আছে। মাথাপিছু ব্যয়ের হিসাবে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত খরচ অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃত অর্থে উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর পেছনে মাথাপিছু ব্যয় আরও বেশি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা শিক্ষা বিশ্লেষক রাশেদা কে চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষকের জোগান বলি, আর সার্বিকভাবে দেশের জনপ্রশাসনসহ সব খাতের নেতৃত্ব বা দক্ষ জনবল সরবরাহের কথাই বলি, তা তৈরির দায়িত্ব উচ্চশিক্ষার। সে কারণে উচ্চশিক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে মাথাপিছু ব্যয়ের চিত্র বেরিয়ে এসেছে, সেটা প্রত্যাশিত পর্যায়ের নয়। কেননা, আমরা টেকসই উন্নয়নের কথা বলছি, সেটায় একটি বড় অংশ দখল করে আছে উচ্চশিক্ষা। আজ অনেক চাকরিরই প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে বৈশ্বিকভাবে। সেখানে আমাদের জনবলকে টিকে থাকতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতের বিকল্প নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, এর অধিভুক্ত কলেজ, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অধীভুক্ত মাদ্রাসা বাদে ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯ সালে শিক্ষার্থীদের মাথাপিছু ব্যয় এক লাখ ৪৯ হাজার ৯৪২ টাকা।

একই বছর ৯৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক ব্যয় ৭১ হাজার ৫৩৬ টাকা। অন্যদিকে আলোচ্য বছরে এই ১৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী ছিল ৪৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৫১ জন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর যদি বছরে গড়ে ৩৬ হাজার টাকা ব্যক্তিগত ব্যয় থাকে, তবে দেশে শিক্ষার্থীর মাথাপিছু ব্যয় দাঁড়াচ্ছে এক লাখ ৪৭ হাজার টাকা।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে অর্থ আদায় হয় তার পুরোটা তাদের পেছনে ব্যয় হয় না। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাথাপিছু ব্যয় নির্ধারণে শিক্ষকের বেতন ও গবেষণাসহ ৯টি খাতের খরচ ধরা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রচুর অর্থ আয় করলেও ব্যয় করেছে খুব কম। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা ও শিক্ষার অন্য খাতে ব্যয় করেছে সামান্য।

কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর প্রতি মাত্র চার হাজার টাকাও ব্যয় করেছে। এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি। আবার ইস্টওয়েস্টের মতো বড় এবং ভালো ইউনিভার্সিটি মাথাপিছু ব্যয়ের তথ্যই দেয়নি। বেসরকারি খাতে মাথাপিছু বেশি ব্যয় করা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নর্থসাউথ একটি। তারা শিক্ষার্থীপ্রতি এক লাখ ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় করে।

এভাবে ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি এক লাখ ৭০ হাজার, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ এক লাখ ৮৪ হাজার, ব্র্যাক এক লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় করে। নতুনগুলোর মধ্যে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্ট বাংলাদেশ (ইউল্যাব) এক লাখ ৫৩ হাজার, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এক লাখ ৭২ হাজার টাকা খরচ করে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ৫০ হাজার থেকে সোয়া লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় আছে।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বছর ভিত্তিতে মাথাপিছু ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এই হিসাবে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে প্রতি শিক্ষার্থীর পেছনে খরচ করা হয় তিন লাখ ৬৪ হাজার ৪৮৫ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে তিন লাখ ৫৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।

তৃতীয় অবস্থানে আছে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে দুই লাখ ৯১ হাজার ১৩৬ টাকা। ৪ ও ৫ নম্বরেও আছে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এগুলো হচ্ছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। যথাক্রমে দুই লাখ ৩৫ হাজার এবং দুই লাখ ২৬ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে উভয় বিশ্ববিদ্যালয়েপ্রতি শিক্ষার্থীর পেছনে।

৭, ৮ ও ৯ নম্বরে যথাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। তিনটিতেই সাধারণ, প্রকৌশল এবং কৃষিবিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণা চলে। আর বরাদ্দে দশম স্থানে আছে বুয়েট। এই চারটিতে মাথাপিছু ব্যয় যথাক্রমে দুই লাখ ১০ হাজার, দুই লাখ আট হাজার ৫১১ টাকা, এক লাখ ৮২ হাজার এবং এক লাখ ৭৭ হাজার ৭৭৫ টাকা। সবচেয়ে কম ব্যয় হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর পরিমাণ মাথাপিছু ৩৮৯ টাকা।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, উচ্চশিক্ষা হচ্ছে সার্বিকভাবে দেশ এগিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার। গবেষণায় ব্যয় করলে কী ফেরত পাওয়া যায় তার প্রমাণ কৃষি খাত। লবণ, তাপ, খরা, ঝড় সব ধরনের দুর্যোগসহিষ্ণু ধান আমরা পেয়েছি শুধু গবেষণার কারণেই। বিলুপ্ত প্রায় বিভিন্ন ধরনের মাছ ফের আমাদের খাবারের প্লেটে এসেছে গবেষণার বদৌলতে। সুতরাং আমি মনে করি, কৃষির পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল এবং কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানসহ উচ্চশিক্ষার সব ডিসিপ্লিনে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আয়ের তুলনায় যে ব্যয় কম করছে, সেটিও দেখা দরকার ইউজিসির। কেননা, আইনে এসব বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক। সুতরাং আয়ের অর্থ শিক্ষার পেছনে ব্যয় করাই যুক্তিযুক্ত। অথবা ব্যয় ধরে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ফি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here