বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান করোনার প্রভাবে দেশের অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার আরও নিচে চলে গেছে। শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার জীবনযাপন করছে। শুধু তাই নয় করোনার প্রভাবে চাকরি হারানো, আয় কমে যাওয়া, ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে শহরের অনেক মানুষ গ্রামে ফিরছে, অভিবাসীরা তাদের চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরছেন। এছাড়া সম্ভাব্য অভিবাসীদের অভিবাসন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় সম্প্রতি ঘোষিত প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ালেও করোনার কারণে নতুন যুক্ত হওয়া দরিদ্ররা এতে দৃশ্যমান নয়। বুধবার (৯ জুন) ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ আয়োজিত ‘বাজেট ২০২১-২২ : করোনাকালে জীবন ও জীবিকা’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা।

খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ ও পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে এবং খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলীর সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান।

আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়েমা হক বিদিশা।

আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, এবারের বাজেটে দারিদ্র্য ও ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যেখানে নাগরিক হিসেবে জনমানুষের চাহিদার প্রতিফলন ঘটেছে। তবে জীবনচক্রের কথা বিবেচনায় নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। আর কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়নে দরকার উপকারভোগীর সঠিক তথ্যভাণ্ডার।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

সভাপতির বক্তব্যে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করতে না পারলে বাংলাদেশের নড়বড়ে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ঘটবে না। গ্রামীণ অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়বে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন করতে হবে।

আলোচকের বক্তব্যে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, করোনা অতিমারি জীবন ও জীবিকার উপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে। ফলে নতুন দারিদ্র্য বেড়েছে এবং দারিদ্র্যের হার তিন দশক আগের হারে পৌঁছে গেছে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং যথাযথ ব্যবস্থার অভাবে যেকোনো দুর্যোগে আমাদের দারিদ্র্যের পরিমাণ বেড়ে যায়। জাতীয় খানাভিত্তিক তথ্যভাণ্ডারের অভাবে সঠিক জনগোষ্ঠীর কাছে সাহায্য যায় না। এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ বাড়ানো হলেও মাথাপিছু বরাদ্দ বাড়েনি। অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে এবারের বাজেটে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, পিছিয়ে পড়াদের জন্য প্রণোদনা, বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, জনগণকে সম্পৃক্তকরণ এবং সর্বপরি সঠিক তথ্যের পর্যাপ্ততার বিষয়গুলোয় গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে আগের বছরের চেয়ে বরাদ্দ ১৩ শতাংশ বেড়েছে। নতুন ১৪ লাখ মানুষকে এর আওতায় আনা হয়েছে। নগর দরিদ্রসহ আড়াই কোটি নতুন দরিদ্রের জন্য তা অপ্রতুল। তার ওপর বরাদ্দকৃত অর্থের বেশিরভাগ অংশ সরকারি কর্মচারীদের পেনশন, সঞ্চয়পত্রের সুদ প্রভৃতি প্রদানে ব্যয় হবে। সরকারি প্রতিবেদনই বলছে, যোগ্য না হয়েও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভাতা নেন ৪৬ শতাংশ সুবিধাভোগী। জনসংখ্যার সঠিক ডাটাবেইস না থাকায় এবং অনিয়মের কারণে অনেকে যোগ্য হয়েও এ কর্মসূচিগুলো থেকে বাদ পড়ছেন।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এবারের বাজেটে সরকার স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং স্টিমুলাস প্যাকেজকে মূল বিবেচনায় নিয়েছে। তবে বেশকিছু বরাদ্দের ক্ষেত্রে রিস্ট্রাকচারিং হলে ভালো হতো। যেমন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ছোট ছোট অনেক উপখাতের বরাদ্দ কমানো হয়েছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও পর্যাপ্ত বরাদ্দের সুযোগ নেই।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক ড. সায়েমা হক বিদিশা বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই করোনাকালে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য অধিকার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। অনেক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হয়েছে। মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু হার বৃদ্ধিসহ সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালের খানা জরিপে দেখা গেছে, ২৪.৩ % মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। আর দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি যে মানুষগুলো থাকে তারা যেকোনো দুর্যোগের কবলে পড়লেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। দেশের বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোয় নতুন করে দারিদ্র্য ঝুঁকি বেড়েছে। এ জন্য এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। বাজেটে সার্বিকভাবে দেখা যায়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ বেড়েছে। তবে মাথাপিছু বরাদ্দ বাড়েনি। জীবনচক্রের কথা চিন্তা করে কর্মসূচি সাজানো প্রয়োজন। সরকারের খাদ্য এবং কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ বছরের কর ছাড়ের বিষয়টি ইতিবাচক। যেখানে পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান তৈরির একটা প্রচেষ্টা রয়েছে। তবে এ সুবিধাগুলো কতটুকু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে তা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ।

ঢাকা/এনইউ

আরও পড়ুন: