সিকিউরিটিজ আইনের লঙ্ঘণ: ১৫ ব্যাক্তি-প্রতিষ্ঠানকে ১৩ কোটি টাকা জরিমানা

এইচ কে জনি: পুঁজিবাজারে অনিয়ম কিংবা কারসাজি নতুন কিছু নয়। তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে অনিয়ম কিংবা কারসাজির মাত্রা চরমে। নানা কৌশলে তালিকাভুক্ত কোম্পানি, সিকিউরিটিজ হাউজ কিংবা বড় ব্যাক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সর্বশান্ত করার উৎসবে মেতে থাকে। তবে আশার কথা পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন দায়িত্ব্য নেয়ার পর থেকেই পুঁজিবাজারে কারসাজি বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের প্রথম চার মাসে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করায় ১৫ ব্যাক্তি-প্রতিষ্ঠান ও সিকিউরিটিজ হাউজকে ১৩ কোটি ৯ লাখ টাকা জরিমানা করেছে কমিশন। বিএসইসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব 

তথ্য বিশ্লেষনে দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স ১৯৬৯ এর সেকশন ২২ লঙ্ঘণ করায় অ্যালায়েন্স হোল্ডিংস লিমিটেডকে ১ লাখ টাকা, আমান কটন ফাইব্রাসের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামকে ৩ কোটি টাকা (নির্দিষ্ট মেয়াদে অনাদায়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা), ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: রফিকুল ইসলামকে ৩ কোটি টাকা (নির্দিষ্ট মেয়াদে অনাদায়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা), পরিচালক তৌফিকুল ইসলামকে ৩ কোটি টাকা (নির্দিষ্ট মেয়াদে অনাদায়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা) ও পরিচালক তরিকুল ইসলামকে ৩ কোটি টাকা (নির্দিষ্ট মেয়াদে অনাদায়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা) এবং অডিটর কোম্পানি আটা খান অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

ফেব্রুয়ারি মাসে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স ১৯৬৯ এর সেকশন ২২ লঙ্ঘণ করায় ফ্যামিলি টেক্সের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাদের ফারুককে ১০ লাখ টাকা এবং মেঘনা ব্যাংক সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী মহিবুল্লাহ কবিরকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে বিএসইসি।

আরও পড়ুন: এপ্রিলে যেসব সিকিউরিটিজ হাউজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বিএসইসি

এছাড়া মার্চ মাসে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি অ্যাক্টিভ ফাইনের চেয়ারম্যান মো: জিয়া উদ্দিনকে ৫ লাখ টাকা (নির্দিষ্ট মেয়াদে অনাদায়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা), ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম সাইফুর রহমানকে ৫ লাখ টাকা (নির্দিষ্ট মেয়াদে অনাদায়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা), পরিচালক মো: আফজালকে ৫ লাখ টাকা (নির্দিষ্ট মেয়াদে অনাদায়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা) এবং কোম্পানি সেক্রেটারি মো: মাহবুবুর রহমানকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা (নির্দিষ্ট মেয়াদে অনাদায়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা) করে।

এপ্রিলে  সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স ১৯৬৯ এর সেকশন ২২ লঙ্ঘণ করায় আবদুল কাইয়ুম অ্যান্ড হিজ অ্যাসোসিয়েটসকে ৫০ লাখ টাকা, ইনসাইডার ট্রেডিংয়ে সম্পৃক্ততা থাকায় আইআইডিএফসি ক্যাপিটালের বিনিয়োগকারী মেহনাজ বিন তাজিয়া-কে ৫ লাখ টাকা, শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ে অনিয়ম করায় শ্যামল ইক্যুইটি ম্যানেজম্যান্টকে ৫ লাখ টাকা এবং গ্রাহক হিসাবে ৭৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার ঘাটতি থাকায় ওয়াইফাং সিকিউরিটিজকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

কমিশন সূত্রে জানা যায়, এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও প্রায় ২৮৪ প্রতিষ্ঠান ও ব্যাক্তিদের যথাযথ কারণ দেখিয়ে ক্ষমা চাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরণের আইন লঙ্ঘন যাতে না হয় সে বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: মার্চে যেসব সিকিউরিটিজ হাউজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বিএসইসি

এদিকে এই ১৫ ব্যাক্তি-প্রতিষ্ঠানের মতো আরও কিছু ব্যাক্তি-প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের নথি বিএসইসির হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যাক্তিদের মধ্যে অনেকেই নিজেরাই নিজেদের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ে ভূমিকা রেখেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএসইসি কর্মকর্তা বলেন, ‘আইন অমান্য করার কারণে বিএসইসি এরই মধ্যে বেশকিছু ব্রোকারেজ হাউজ ও ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, যা আমাদের নিয়মিত কাজ। ভবিষ্যতেও এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। ’

তবে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন অমান্য করার শাস্তি শুধুমাত্র সতর্ক করা কিংবা সামান্য জরিমানা হওয়া উচিত নয়। অনিয়মের মাধ্যমে যে পরিমাণ মুনাফা অর্জন করেছে, সে পরিমাণ বা তার বেশি অর্থ জরিমানা না করলে এসব কার্যক্রম থামানো যাবে না। কারণ, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হলে অনিয়ম চলতেই থাকবে।

বিএসইসির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ব্রোকার হাউজগুলোর অনিয়মের দৌরাত্ম্য প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। গ্রাহকের অর্থ এফডিআর করে শর্ট ফল করে রাখা, ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ার ক্রয়ে মার্জিন ঋণ প্রদান, নির্ধারিত অনুপাতের অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ প্রদান, ক্যাশ হিসাবে মার্জিন ঋণ সুবিধা প্রদান, গ্রাহকদের অর্থ ও শেয়ার প্রদান না করা, প্রদত্ত চেক প্রত্যাখান  হওয়া, শর্টসেল করাসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে অনেক সিকিউরিটিজ হাউজ। যেসব প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করে নিজেদের শেয়ারের বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর হ্রাস-বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে তাদের বিরুদ্ধে খুব শিগগির পদক্ষেপ নেওয়া হবে। 

বিজনেস জার্নাল/ঢাকা/এইচকে