বর্তমান সময়ে বিশ্বময় সবচেয়ে আলোচিত ইসলামিক প্রডাক্টগুলোর একটি হলো ‘সুকুক’। বিশেষত বাংলাদেশে এর আলোচনা এখন তুঙ্গে। বছর দুয়েক আগেও এর তেমন আলোচনা ছিল না। সর্বপ্রথম ২০১৯ সালের ২৯ মে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি সুকুক বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করে।

এরপর গত ৮ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে সরকার কর্তৃক সুকুক ইস্যু ও ব্যবস্থাপনা সম্পৃক্ত গাইডলাইন প্রকাশিত হয়। সব শেষে গত ২৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয় প্রত্যাশিত বাংলাদেশ সরকারের ইনভেস্টমেন্ট সুকুকের প্রসপেক্টাস।

ওই প্রসপেক্টাস অনুযায়ী গত ২৮ ডিসেম্বর দেশে প্রথম সুকুক অকশন অনুষ্ঠিত হয়। কনভেনশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংকসহ ৩৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এতে অংশগ্রহণ করে। অকশনের প্রথম ধাপে ৪ হাজার কোটি টাকার সুকুকের জন্য আবেদন পড়েছে ১৫ হাজার ১৫৩ কোটি ১০ লাখ টাকার। অর্থাৎ প্রায় চার গুণ বেশি আবেদন। এ থেকে বাংলাদেশে এর তুমুল জনপ্রিয়তা অনুমান করা যায়।

জানা গেছে, সুকুকের মাধ্যমে অর্থায়নের জন্য সরকার মোট ৬৮টি প্রকল্পের তালিকা করেছে। এসব প্রকল্পের টাকার পরিমাণও নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং আশা করা যাচ্ছে ভবিষ্যতে আরো সুকুক ইস্যু হবে।

সরকার কেন এই সুকুকে আগ্রহী হলো, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ‘দেশের ব্যাংকিং খাতের অতিরিক্ত তারল্যের প্রায় ৪৫ শতাংশের বেশি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে রয়েছে। কনভেনশনাল ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের ইনস্ট্রুমেন্টে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তেমন কোনো বিনিয়োগের সুযোগ ছিল না। এতে তাদের অধিকাংশ তারল্যই অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে। সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে এই ধারার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তারল্য একদিকে যেমন সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যয় করা যাবে, তেমনি শরিয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের বিকল্প সুযোগ তৈরির পাশাপাশি আলোচ্য সুকুক তারা এসএলআর হিসাবেও ব্যবহার করতে পারবে।’

১. গণমাধ্যমে প্রকাশিত অর্থ বিভাগের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অংশীদারিত্ব প্রায় ২৫ শতাংশ। অথচ সরকারের ঘাটতি অর্থায়নে এদের ভূমিকা নেই (প্রথম আলো, ৩০ আগস্ট, ২০২০)। মোট কথা, সরকার অর্থ সংগ্রহের জন্য নতুন করে সুকুক ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করছে। সামনেও হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সুকুক প্রকারান্তরে সরকারের দায় বাড়িয়ে দেবে। দেশের চলমান অর্থনীতিতে সরকারের দায় বৃদ্ধি কতটা উপকারী, সেটি একটি আলোচনা হতে পারে। প্রবন্ধের শেষে এ বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা হবে।

সুকুক কী?

সুকুক আমাদের দেশে একেবারেই নতুন একটি ইসলামী বিনিয়োগ প্রডাক্ট। শব্দ যেমন নতুন, পাবলিক প্রডাক্ট হিসেবেও নতুন। সুকুক শব্দটি মূলত বহুবচন। এর একবচন ‘ছক্ক’। মূল শব্দটি ফার্সি। সেখান থেকে আরবি ‘ছাক্কুন’। এরপর এর বহুবচন ‘সুকুক’। এর শাব্দিক অর্থ সার্টিফিকেট। দলিল-দস্তাবেজ, যা কোনো সম্পদের প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন জমির দলিল (আল-মিসবাহুল মুনীর, পৃ. ১৮০)।

সুকুকের প্রায়োগিক ব্যবহার

প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঐতিহাসিকভাবে সুকুকের তিনটি অর্থ ও প্রয়োগ দেখা যায়। যথা: ক. কোনো সম্পদের ডুকুমেন্টস/সার্টিফিকেট। যেমন ওয়াকফ সম্পদের দলিল। হিজরি পঞ্চম শতাব্দীতে এর ব্যবহার পাওয়া যায় (রদ্দুল মুহতার, ১৩/৫৯২)।

খ. রাষ্ট্রীয় ভাতা প্রাপ্তির সার্টিফিকেট। এই ব্যবহারটি ৬৫ হিজরিতে উমাইয়্যাহ শাসনামলে পাওয়া যায়।

মদিনার গভর্নর তখন মারওয়ান ইবনে হাকাম (২-৬৫হি./৬২৩-৬৮ঈ.)। ওই সময়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভাতা প্রদান করা হতো। সেই ভাতা প্রাপ্তির জন্য বিশেষ সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছিল, যা ‘সুকুক’ নামে পরিচিত ছিল। এই সুকুক দিয়ে নির্ধারিত স্থান থেকে রাষ্ট্রীয় ভাতা হিসেবে খাদ্যলাভ করা যেত। এই সুকুক আবার সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেন হতো। যিনি এই সুকুক লাভ করতেন, তিনি সেটি দিয়ে ভাতা উত্তোলন না করে অন্যত্র বিক্রয় করে দিতেন। এতে যে সমস্যা হতো তা হলো, পণ্য হস্তগত করার আগেই তা বিক্রয় করা হয়। হাদিসে তা স্পষ্ট নিষিদ্ধ। তাই তত্কালীন সাহাবায়ে কেরাম এর বিরোধিতা করেছেন। ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে হাদিসের কিতাবগুলোয় উল্লেখ হয়েছে (সহিহ মুসলিম, ৩৭৩৯)।

গ. সুদি বন্ডের বিকল্প হিসেবে ‘বিশেষ সার্টিফিকেট’ এ অর্থেই বর্তমানে ব্যবহূত হয়। লক্ষ করুন, পূর্বোক্ত দুটি প্রয়োগ ও বর্তমান প্রয়োগে একটি বিশেষ মিল হলো, সুকুক সবসময় সম্পদের প্রতিনিধিত্ব করে। এর আন্ডারলায়িং অ্যাসেট থাকে। এটিই সুকুকের মূলকথা।

২. প্রচলিত বন্ড যেখানে হয় সুদভিত্তিক, সুকুক সেখানে সুদমুক্ত প্রডাক্ট। বন্ড একটি সুদভিত্তিক ফান্ড সংগ্রহের মাধ্যম। অন্যদিকে সুকুক সুদমুক্ত ফান্ড সংগ্রহের ইসলামী মাধ্যম। প্রকৃত অর্থে সুকুক সুনির্দিষ্ট কোনো আর্থিক চুক্তির নাম নয়। এর প্রকৃতি নির্ণীত হয় এর স্ট্রাকচারিংয়ের মাধ্যমে। কখনো এর অবকাঠামো তৈরি হয় মুরাবাহা ভিত্তিতে। কখনো ইস্তেসনা। কখনো ইজারা ভিত্তিতে। এসব অবকাঠামো প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত। যথা—অ্যাসেট বেজড ও অ্যাসেট ব্যাকড। সাধারণত ইজারা বা লিজভিত্তিক সুকুক হলো অ্যাসেট বেজড। আর বাকিগুলো অ্যাসেট ব্যাকড।

সুকুকের বৈশিষ্ট্য

সুকুকের মূল বৈশিষ্ট্য তিনটি। যথা—(১) এটি বিশেষ প্রজেক্টে হয়ে থাকে; (২) এর বিপরীতে সুনির্দিষ্ট অ্যাসেট থাকে। পরিভাষায় একে ‘আন্ডারলায়িং অ্যাসেট’ বলা হয়। সুকুক হোল্ডারদের মূলত সেই অ্যাসেট থেকে প্রফিট জেনারেট হয়। দেখুন সাধারণ ব্যাংক লোনের বিপরীতেও বন্ধকি হিসেবে অ্যাসেট রাখতে হয়। তবে সেটি ব্যবহূত হয় না। সেখান থেকে প্রফিট আসে না; (৩) এর অবকাঠামো গঠন হয় শরিয়াহর সুনির্দিষ্ট কোনো কন্ট্রাক্টের অধীনে।

প্রচলিত সুকুকের সূচনা

প্রচলিত সুকুকের সূচনা হয় ১৯৭৮ সালে জর্ডানে ‘সকুকুল মুকারাযা’/মুদারাবা’ দিয়ে। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৪ সালে তুরস্কে ‘মুশারাকা সুকুক’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ‘তার্কিশ রেভিনিউ শেয়ারিং সার্টিফিকেট’ নামে পরিচিতি ছিল। এটি ছিল সে দেশের প্রথম সরকারি সুদমুক্ত বন্ড। এরপর ১৯৯০-এ মালয়েশিয়ায় সর্বপ্রথম করপোরেট সুকুক ইস্যু করে (সুকুক প্রিন্সিপল অ্যান্ড প্র্যাকটিস, ইসরা, পৃ. ৬১)। এরপর বিভিন্ন দেশে সুকুক ইস্যু হয়।

আমাদের দেশের সরকারি সুকুক অবকাঠামো

সম্প্রতি প্রকাশিত সুকুক প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, বাংলাদেশ গভর্মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুকের অবকাঠামো হলো ইজারা (প্রকৃত অর্থে ইজারা অ্যান্ড লিজ ব্যাক)।

অবকাঠামোর পক্ষগুলো

প্রসপেক্টাস অনুযায়ী ওই সুকুকের পক্ষগুলো হলো—ক. অবলিগর (Obligor): এর অর্থ, শরিয়াহ নীতি অনুযায়ী সুকুক ইস্যুর প্রস্তাবকারী। এখানে সেই পক্ষ হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। এর পক্ষে কাজ করবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। একই সঙ্গে তারা ভাড়াগ্রহীতা (Lessee) ও সার্ভিসিং এজেন্ট।

৩. খ. ইস্যুয়ার: এর অর্থ, সম্পদের বিপরীতে সুকুক ইস্যু করার জন্য নিযুক্ত পক্ষ। এখানে সেই পক্ষ হলো ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগ। মূলত এ বিভাগে একটি স্বতন্ত্র সেকশন থাকবে, যার নাম হবে ইসলামিক সিকিউরিটি সেকশন। এর সদস্য সংখ্যা থাকবে পাঁচজন। প্রধান থাকবেন ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ডিজিএম। বাকি সদস্যরাও এ বিভাগেরই বিভিন্ন কর্মকর্তা। তাই অন্যভাবে বলা যায়, ‘ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট’ই ইস্যুয়ার। এ বিভাগ একই সঙ্গে ভাড়াদাতা ও এসপিভি (স্পেশাল পারপাস ভেহিকল) হিসেবেও কাজ করবে।

গ. ট্রাস্টি: এর অর্থ, এমন পক্ষ, যারা সুকুক ধারকদের স্বার্থ সংরক্ষণ, এসপিভির কার্যক্রম তত্ত্বাবধান কাজে নিয়োজিত থাকে। পাশাপাশি অবলিগর/অরিজিনেটরের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে প্রসপেক্টাসে বর্ণিত দলিলাদি ও গ্যারান্টির নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্বও পালন করে।

এখানে সেই পক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকেরই বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা। এর প্রধান ও চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ডেপুটি গভর্নর। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী এর সদস্য সংখ্যা ছয়জন। এর মধ্যে তিনজনই ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা।

শরিয়াহ বোর্ডএর অর্থ, যারা সুকুক ইস্যুর ক্ষেত্রে শরিয়াহ-বিষয়ক যেকোনো মতামত ও পরামর্শ প্রদান করবেন। সুকুক গাইডলাইন অনুযায়ী সরকারি সুকুকের ক্ষেত্রে এটি গঠন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী এর সদস্য সংখ্যা ১১ জন। এর চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট। ১১ জনের মাঝে মাওলানা আছেন মাত্র দুজন। মুফতি মাত্র একজন! শরিয়াহ ইস্যুতে বিজ্ঞ আলেম ও মুফতিদের মেজরিটি অনুপস্থিতি এর আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। শুধু তাই নয়, একে বাংলাদেশ ব্যাংকের (যারা ইস্যুয়ার) অধীনে রাখায় এর স্বাধীনতাও ক্ষুণ্ন হবে বলে মনে করছেন তারা। তাছাড়া শরিয়াহ বোর্ডকে বলা হয়েছে ‘অ্যাডভাইজরি কমিটি’। অথচ আন্তর্জাতিক শরিয়াহ গভর্ন্যান্স অনুযায়ী ‘সুপারভাইজরি কমিটি’ হওয়া জরুরি।

পাঠকদের জ্ঞাতার্থে এটিও উল্লেখ করা উচিত মনে করছি, ২০০৯-এ প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি ইসলামিক ব্যাংকিং গাইডলাইন, বিএসইসি কর্তৃক প্রকাশিত সুকুক গেজেট ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি ইসলামিক ব্যাংকিং গাইড লাইনের প্রস্তাবিত সংশোধিত কপি (২০২০) এসবে শরিয়াহ বোর্ড গঠনের যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, সেটি এখানে প্রতিফলিত হয়নি (এখানে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ নেই)।

স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ!

এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগই সবকিছুর মূলে নিহিত। এ বিভাগের কর্মকর্তারা একই সঙ্গে ইস্যুয়ার ও ট্রাস্টি। ট্রাস্টির মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ পদের ৫০ শতাংশই ইস্যুয়ার পক্ষের দখলে।

৪. শুধু তাই নয়, শরিয়াহ বোর্ডের মতো আরো গুরুত্বপূর্ণ পদের চেয়ারম্যানও এ বিভাগের কর্মকর্তাই। এটি স্পষ্ট ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ তৈরি করতে পারে। প্রসপেক্টাসে ট্রাস্টি ও শরিয়াহ বোর্ডের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে কাজ করার যে কথা বলা হয়েছে, সেটি কতদূর সম্ভব হবে তা সহসাই প্রশ্নবিদ্ধ। তদ্রূপ ইস্যুয়ার ও এসপিভিও অভিন্ন। এটিও আন্তর্জাতিক সুকুক অবকাঠামোর সঙ্গে যায় না।

সুকুক রূপরেখা

সুকুক অবকাঠামো বা সুকুক চুক্তির পক্ষগুলো আলোচনার পর সুকুক রূপরেখা সামনে আসে। সুকুক অবকাঠামো অনুযায়ী এর রূপরেখা যেভাবে আলোচিত হওয়া দরকার ছিল, প্রসপেক্টাসে সেভাবে তা হয়নি।

প্রসপেক্টাসটি বেশ সংক্ষিপ্ত। এতে বিস্তারিত রূপরেখা আসেনি। কিছুটা এসেছে। প্রসপেক্টাস ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে এর যে রূপরেখা ফুটে ওঠে তা হলো, ‘সারা দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা’ সরকারের একটি প্রজেক্ট। এ প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য মোটা অংকের ফান্ড দরকার। টাকার অংকে যার পরিমাণ ৮ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এ টাকা সংগ্রহের জন্য সরকার সুকুক ইস্যু করতে আগ্রহী। ওই প্রজেক্টের অধীনে সৃষ্ট সম্পদই আলোচিত সরকারি সুকুকের অ্যাসেট বলে বিবেচিত হবে।

ওই ফান্ড সংগ্রহের জন্য সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাঝে একটি সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষর হয়েছে। এটি অনুযায়ী অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক ফান্ড সংগ্রহ করবে। এর প্রক্রিয়া হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক ইস্যুয়ার হিসেবে সুকুক ইস্যু করবে। এরপর সুকুক ইনভেস্টরদের টাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রজেক্টের সম্পদ ক্রয় করা হবে। অতঃপর সেটি ইনভেস্টরদের পক্ষে অর্থ বিভাগের কাছে ভাড়ায় প্রদান করা হবে। অর্থ বিভাগ এর ভাড়া প্রদান করবে। মেয়াদ শেষে সম্পদটি অর্থ বিভাগ ক্রয় করে নেবে। সব শেষে ইনভেস্টররা তাদের মূল্য পুঁজিসহ মুনাফা লাভ করবেন। নিচের চিত্রটি লক্ষ করি—

 > _ অর্থ বিভাগ  বাংলাদেশ ব্যাংকের মাঝে এমওইউ > _  ঋণ বিভাগ সুকুক ইস্যুকারী/বিক্রেতা/এসপিভি > _  ঋণ বিভাগ কর্তৃক ভাড়া প্রদান > _  অর্থ বিভাগ কর্তৃক ভাড়া গ্রহণ _  অর্থ বিভাগ কর্তৃক ক্রয়সুকুক নিষ্পত্তি।

এক নজরে সরকারি সুকুকসংক্রান্ত তথ্যাবলি

সুকুকের নামইজারা সুকুক। তবে ভাড়াগ্রহীতা (অর্থ মন্ত্রণালয়) যেহেতু সেটি পুনরায় ক্রয় করে নেয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাই বাস্তব অর্থে এটি ‘ইজরা অ্যান্ড লিজ ব্যাক’ হবে।

৫. আন্ডারলায়িং অ্যাসেটনিরাপদ পানি প্রজেক্টের অধীনে বিদ্যমান সম্পদ ও ভবিষ্যৎ সম্পদের ভোগ ব্যবহার।

সার্ভিসিং এজেন্টস্বয়ং ভাড়াগ্রহীতা তথা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভাগ।

ভাড়া চুক্তি/প্রজেক্ট ডিউরেশন১১ জানুয়ারি, ২০২০-৩০ জুন, ২০২৫। মোট পাঁচ বছর।

অ্যাসেট ব্যয় হাজার ৮৫১ কোটি টাকা, যা মোটে ৮ হাজার কোটি টাকা।

ভাড়া বা রেন্ট হারবিজিআইইবির সঙ্গে ১ শতাংশ যুক্ত হয়ে মোট ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এটি সুনির্ধারিত। প্রতি বছরে তা শোধ করা হবে।

সুকুক গ্রাহকদের মাঝে রেন্ট বণ্টন করা হবেপ্রতি ছয় মাস পর।

সুকুক মূল্যন্যূনতম মূল্য প্রতি সুকুক ১০০ টাকা। তবে মিনিমাম লট ১০ হাজার টাকা।

কিস্তিমোট দুটি কিস্তি বা ধাপে ৪ হাজার কোটি টাকা করে ওই ৪ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হবে।

প্রথম নিলাম অনুষ্ঠিত হবে২৮ ডিসেম্বর, ২০২০। দ্বিতীয় ধাপের নিলাম হবে ২৮ জুন, ২০২১।

শরিয়াহ বিশ্লেষণ

সুকুক প্রসপেক্টাসের নিয়ম হলো, তাতে রেফারেন্সসহ বিস্তারিত শরিয়াহ বিশ্লেষণ উল্লেখ করা। শেষে তাতে শরিয়াহ কমিটির দস্তখত থাকা। (অ্যাওফি, সুকুক-বিষয়ক রেজুলেশন, ২০০৮, ধারা: ৬) কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের আলোচিত প্রসপেক্টাসে এগুলো নেই। সার্বিক বিশ্লেষণে যা দেখা যাচ্ছে, এখানে মূলত তিনটি চুক্তি হচ্ছে। যথা: ক. ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি; খ. ইজারা বা লিজ চুক্তি; গ. পুনরায় বিক্রয় চুক্তি।

নিম্নে এসব চুক্তি-সংক্রান্ত কিছু শরিয়াহ আপত্তি তুলে ধরা হলো:

শরিয়াহ ইস্যু পণ্য অজ্ঞাত/অনির্দিষ্ট

ইনভেস্টররা টাকা দিয়ে প্রথমে এসপিভির মাধ্যমে সুকুক আন্ডারলায়িং অ্যাসেট ক্রয় করবেন। এখানে সেই অ্যাসেট কী, সেটি স্পষ্ট নয়। প্রসপেক্টাসে শুধু এতটুকু উল্লেখ আছে—Sukuk Asset: Ownership of the existing and future asset including usufruct under the project ‘Safe Water Supply to the Whole Country’. এখানে Existing Asset কী, তা প্রসপেক্টাসে উল্লেখ নেই। অথচ যেকোনো ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার জন্য কী বিক্রয় হবে বা ক্রয় হবে, সেটি স্পষ্ট হওয়া একান্ত জরুরি। এ ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই, আলোচিত ইজারা সুকুকের জন্য সুকুক অ্যাসেটে ইনভেস্টরদের মালিকানা নিশ্চিত করা জরুরি। আর না হয় সেটি কেবল রেন্ট (প্রাপ্ত মুনাফা) বিক্রয় হবে। যা বৈধ নয় (মিলকিয়্যাতু হামালাতি সুকুক, ড. হামিদ হাসান মিরাহ, পৃ.৮৮, আস-সুকুক, ড. ফাহান বিনবাদী, পৃ. ৮২)।

৬. প্রকাশ থাকে যে আন্তর্জাতিকভাবে ইজারা সুকুক মৌলিকভাবে তিন প্রকার হয়ে থাকে। যথা—

Certificate of ownership in leased asset, 2. Certificate of ownership of usufruct. Certificate of ownership of services.

আমাদের দেশের ইজারা সুকুক মূলত Certificate of ownership in leased asset-এর অন্তর্ভুক্ত।

পাশাপাশি এটি লিজ ব্যাক ও আইএমবিটি (Ijarah Muntahia Bit-Tamlik)-ও বটে (ড. ফাহান বিন বাদী, পৃ. ১২৪, বিস্তারিত আসছে)। গবেষকদের মতে, একে যদিও ইজারা সুকুক বলা হয়, তবে প্রকৃত অর্থে এ ধরনের সুকুক মূলত ‘বাই সুকুক’ বা ‘বিক্রয় সুকুক’। কারণ এখানে সুকুকের মাধ্যমে মূলত আন্ডারলায়িং অ্যাসেট বিক্রয় করা হচ্ছে (ড. হামিদ হাসান মিরাহ, পৃ. ৩১৬, ড. ফাহান বিন বাদী, পৃ. ১১৬)।

শরিয়াহ ইস্যু ফিউচার সেল

উপরন্তু, এখানে ফিউচার অ্যাসেটকেও আন্ডারলায়িং অ্যাসেট হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা মূলত ফিউচার সেলের সন্দেহ সৃষ্টি করে। বিষয়টি প্রসপেক্টাসে স্পষ্ট করা হয়নি। তবে বাহ্যত ফিউচার সেল মনে হচ্ছে। এমনটি হলে এটি সম্পূর্ণ শরিয়াহ পরিপন্থী বলে বিবেচিত হবে (অ্যাওফি, স.১, ধা.২/২)।

উল্লেখ্য, Certificate of ownership in leased asset-এর আন্তর্জাতিক প্র্যাকটিস হলো, অবলিগর প্রথমে যে সম্পদ বিক্রয় হবে, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা পোর্টফোলিওতে সংরক্ষণ করতে হয়। এরপর সেটি এসপিভির কাছে হস্তান্তর করবে। এসপিভি সেটি ইনভেস্টরদের কাছে বিক্রয় করবে। স্বতন্ত্র বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার পর ইনভেস্টরদের পক্ষে এসপিভি সেটি ভাড়ায় প্রদান করবে। এক্ষেত্রে ভাড়াগ্রহীতা স্বয়ং বিক্রেতা হলে সেটি লিজ ব্যাক হবে। পাশাপাশি বিক্রয়ের ওয়াদা থাকায় সেটি এমআইবিটিও হবে (ড. ফাহান বিন বাদী, পৃ. ১২৪)।

দুঃখজনক হলো, এ প্রসেসগুলো আমাদের সরকারি সুকুক প্রসপেক্টাসে মোটেও স্পষ্ট নয়। পুরো প্রক্রিয়াটিই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। বিদ্যমান অ্যাসেট কী তা উল্লেখ নেই। বরং উল্টো ভবিষ্যৎ সম্পদকেও অ্যাসেট হিসেবে দেখানো হয়েছে, শরিয়াহ পরিপালনে যা বড় ধরনের সংশয় তৈরি করে।

শরিয়াহ ইস্যু ভাড়া পণ্য অজ্ঞাত

যেমনটি আগে আলোচনা হয়েছে, এখানে সম্পদের সংজ্ঞা স্পষ্ট না হওয়ায় কী ভাড়া দেয়া হচ্ছে, সেটি স্পষ্ট নয়। ইজারা চুক্তির জন্য এটি একটি মৌলিক শর্ত যে ভাড়াকৃত সম্পদ সুনির্দিষ্ট হতে হবে (অ্যাওফি, স.৯, ধা.৩/১)।

ইজারা সুকুক নাকি ইস্তেসনা সুকুক?

৭. আলোচিত সরকারি সুকুক পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ইনভেস্টরদের টাকায় ইস্যুয়ার মূলত নিরাপদ পানি প্রজেক্টের অধীনে বিভিন্ন অ্যাসেট তৈরি করবে। যেমন বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন, সোলার প্যানেল, গভীর নলকূপ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ইউনিট নির্মাণ, সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন ইত্যাদি। এগুলো তো ইজারা সুকুকের মধ্যে পড়ে না। বরং ইস্তেসনা সুকুকের মধ্যে যায়।

কেউ কেউ বলেছেন, এখানে জমি আছে। কিন্তু সেটিও অজ্ঞাত। যদিও ধরে নেয়া হয়, তাতে জমি জ্ঞাত। তাহলে বিষয়টি দাঁড়ায়, এসপিভির মাধ্যমে জমি ক্রয় করা হবে। এরপর তাতে এসব স্থাপনা তৈরি করা হবে। এগুলো Existing হওয়ার পরই কেবল তা ভাড়ায় দেয়া যাবে। এ বিষয়টিও প্রসপেক্টাসে স্পষ্ট নয়। বরং বাহ্যত তা কঠিনও বটে। কারণ প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হয়ে ভাড়ায় হস্তান্তর হওয়া সময়সাপেক্ষ। অথচ এর আগেই মুনাফা যুক্ত হয়ে যাবে। সুতরাং বাস্তব অর্থে এর সহজ স্ট্রাকচার হবে Istisna’a Sukuk। ইনভেস্টররা তাদের প্রদেত অর্থ প্রদানের অর্থ—তারা এসপিভির মাধ্যমে অরিজিনেটরকে বলেছেন সুকুক অর্থের বিনিময়ে এসব স্থাপনা তৈরি করে দিতে। তৈরি ও হস্তান্তরের পর সেটি অরিজিনেটরের কাছে বিক্রয় করা হবে। (Istisna’a+Sell based Sukuk) দুটি চুক্তি একটির সঙ্গে অন্যটি শর্তযুক্ত হবে না। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শরিয়াহ রুলিংও অনুসরণ করতে হবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরো ভেবে দেখা উচিত বলে মনে করি।

শরিয়াহ ইস্যু আন্ডারটেকিং টু রিপারচেজ

সরকারের অর্থ বিভাগ যে সম্পদ ভাড়ায় গ্রহণ করবে, সেটি মেয়াদ শেষে ক্রয় করে নেবে। এই শর্ত ও ওয়াদা থাকবে। বিষয়টি প্রসপেক্টাসে যেমন আছে, সুকুক গাইডলাইনে আরো স্পষ্টভাবে আছে—‘মেয়াদ পূর্তিতে সুকুক সম্পদ প্রসপেক্টাসে বর্ণিত মূল্য ও পদ্ধতিতে এসপিভির নিকট হইতে অরিজিনেটরের নিকট হস্তান্তরিত হইবে’ (ধারা: ১৩/৭)। প্রসপেক্টাসে ওই গাইডলাইন অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি সম্পূর্ণ শরিয়াহ পরিপন্থী। যে অ্যাওফির শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের কথা খোদ গাইডলাইনে বলা হয়েছে। সেই অ্যাওফির সুকুকবিষয়ক শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ড (১৭)-এর ধারায় (৫/১/৮/৭) বিষয়টি স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে। তাতে আছে—The prospectus must not include any statement to the effect that the issuer of the certificate accepts the liability to compensate the owner of the certificate up to the nominal value of the certificate. অন্যত্র আছে—It is not permissible for the issuer to undertake to purchase the sukuk at their nominal value. (৫/২/২)

৮. তাছাড়া আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি, জিদ্দাহ তাদের ১৭৮ রেজুলেশনেও বিষয়টি উল্লেখ করেছে। তাতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, প্রসপেক্টাসে সুকুক মূল্যের কোনো নিরাপত্তা প্রদান করা যাবে না। সুতরাং আমরা প্রত্যাশা করব, সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে।

শরিয়াহ ইস্যু সার্ভিসিং এজেন্ট

প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করা হয়েছে, খোদ ভাড়াগ্রহীতা তথা অরিজিনেটর (অর্থ বিভাগ) লিজ বস্তুর সার্ভিসিং এজেন্ট হবে। এটি একটি স্বতন্ত্র চুক্তি। ওয়াকালাহ চুক্তি। স্বতন্ত্রভাবে তা করতে হবে।

মূল লিজ চুক্তির সঙ্গে তা শর্তযুক্ত করা যাবে না। তাছাড়া সার্ভিসিং খরচ ভাড়াদাতার (বাংলাদেশ ব্যাংক/এসপিভি) বহন করতে হবে। কোনোভাবেই সব দায় ও রিস্ক ভাড়াগ্রহীতার ওপর দেয়া যাবে না (অ্যাওফি, স.৯, ধা.৭/১/৪)। এসব গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহ ইস্যু আলোচিত প্রসপেক্টাসে স্পষ্ট নয়। বাহ্যত মনে হচ্ছে, সার্ভিসিংয়ের সব দায় ও খরচ অরিজিনেটর স্বয়ং বহন করবে, যা স্পষ্ট শরিয়াহ লঙ্ঘন (অ্যাওফি, স. ৯, ধা. ৫/১/৮)।

শরিয়াহ ইস্যু বিক্রয় চুক্তি  লিজ ব্যাক শর্তযুক্ত

আলোচিত সুকুকে দেখা যাচ্ছে, প্রথমে সুকুক সম্পদ অরিজিনেটর কর্তৃক বিক্রয় হবে। এরপর তারাই সেটি ভাড়া হিসেবে গ্রহণ করবে। ইসলামী ফিন্যান্সে এটি ‘লিজ ব্যাক’ হিসেবে পরিচিত। প্রসপেক্টাসের ভাষ্যমতে, অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাঝে আগে থেকেই এমওইউ আছে যে অর্থ বিভাগ সেটি ভাড়া হিসেবে গ্রহণ করবে। লিজ ব্যাংকের ক্ষেত্রে এরূপ শর্ত ও সমঝোতা গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামী ফিন্যান্সে একটি চুক্তির সঙ্গে অন্য চুক্তি শর্তারোপ করা বৈধ নয়। অ্যাওফি শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ডে লিজ ব্যাংক বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ হয়েছে—An asset may be acquired by a party and then leased to the party. In this case, the Ijarah transaction should not be stipulated as a condition of the purchase contract by which the Institution acquires the asset. (৯-৩/২)

মোট কথা, এখানে তিনটি চুক্তি হচ্ছে (প্রসপেক্টাস অনুযায়ী)—প্র্রথমে সুকুক হোল্ডার কর্তৃক ক্রয়, অরিজিনেটর কর্তৃক ভাড়া গ্রহণ, অরিজিনেটর কর্তৃক ক্রয়। ওই তিনটি চুক্তি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে হতে হবে। আলাদা আলাদা পেপারে সাইন হবে। একটির সঙ্গে অন্যটি শর্তযুক্ত হতে পারবে না।

শরিয়াহ ইস্যু বিক্রয়যোগ্য (Tradable)

প্রসপেক্টাসে বলা হয়েছে, আলোচিত লিজ সুকুক পুনর্বিক্রয়যোগ্য। তবে কবে কখন থেকে হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। এক্ষেত্রে শরিয়াহ নীতি হলো, ৫০ শতাংশের অধিক ফিক্সড অ্যাসেট থাকতে হবে (ইসলামী ফিকহ একাডেমি জিদ্দাহ, রেজুলেশন)।

৯. অর্থাৎ নিরাপদ পানি প্রজেক্টের অধীনে যে অ্যাসেট গড়ে উঠবে, সেটি প্রথমে অস্তিত্বে আসতে হবে। মোট সুকুক অর্থের ৫০ শতাংশের অধিক অ্যাসেটে রূপান্তর হতে হবে। এরপর সেটি কম-বেশিতে পুনর্বিক্রয়যোগ্য হবে। এর আগে সেকেন্ডারি মার্কেটে বিক্রয় করা হলে তাতে ‘সরফ’ বিধান প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ কম-বেশিতে বিক্রয় করা যাবে না।

দুখঃজনক হলো, শরিয়াহর এসব গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় আলোচিত প্রসপেক্টাসে মোটেও উল্লেখ হয়নি। এতে সুকুক প্রডাক্টটি পদে পদে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

সার কথা

সুকুক একটি সম্পূর্ণ ইসলামী প্রডাক্ট। ইসলামী হওয়ার অর্থ শুধু নামে হওয়া নয়। বরং শরিয়াহ পরিপালন করে বাস্তবেও ‘ইসলামী’ হওয়া জরুরি। বাংলাদেশে সুদি বন্ড দীর্ঘদিন ধরে চলমান। এটি যে অনৈসলামিক, তা প্রায় সবাই জানে। কিন্তু সুকুক সবাই জানে এটি একটি ইসলামী প্রডাক্ট। এখন একে শুধু নামসর্বস্ব ইসলামীকরণ করা হলে মানুষ প্রতারিত হবে। ধোঁকায় পড়বে। পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে আলোচিত সরকারি সুকুক শরিয়াহ পরিপালনে বেশ পিছিয়ে আছে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত সুকুক এমন শরিয়াহ হতাশার শিকার হবে, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এত বড় বড় শরিয়াহ প্রশ্ন থাকলে মানুষ কীভাবে এতে আগ্রহী হবে?

সুতরাং আমরা মনে করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এর শরিয়াহ পরিপালন সুদৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করা। শুধু প্রসপেক্টাস নয়, প্রকাশিত গাইডলাইনও শরিয়াহ মানে উত্তীর্ণ নয়। এজন্য দেশের মূলধারার বিজ্ঞ আলেম ও মুফতিদের সংখ্যাধিক্য উপস্থিতি নিশ্চিত করে সুদৃঢ় শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড গঠনের বিকল্প নেই। আল্লাহ সুবহানাহু আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

পরিশিষ্ট

সুকুক: চলমান অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে কতটা সহনীয়?

সামগ্রিকভাবে বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা সংকটকাল অতিক্রম করছে। শুধু দেশের জন্যই নয়, বিশ্বব্যাপী এ সংকট বিরাজমান। এরই মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকার বিভিন্নভাবে ঋণ ও দায়ে জর্জরিত; যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করছে। সরকারের ঋণগ্রহণ ও দায়ের কিছু চিত্র দেখা যাক—

বিদায়ী অর্থবছরে (২০১৯-২০) ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। সেখানে নেয়া হয়েছে ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ দ্বিগুণের চেয়ে বেশি। ঋণ গ্রহণের এই মাত্রা হ্রাস করার পদক্ষেপ না নিয়ে চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। তাতে সেই মাত্রা বহাল রেখেই বর্ধিত কলেবরে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়েছে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ (৩০ জুলাই, ২০২০, নয়া দিগন্ত)।

১০. ব্যাংকিং খাতের অধিকাংশ অর্থ সরকারের কোষাগারে। চলতি অর্থবছরের জুন প্রান্তিকের সংবাদ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংকিং সেক্টরের মোট তরল সম্পদের ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশই সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে (১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ নয়া দিগন্ত)।

-চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তার মাঝে ৯৭ শতাংশই ছিল ঋণ। এর মধ্যে উচ্চ সুদহারে বিশ্বব্যাংকের ঋণ অধিক। জিডিপির তুলনায় এ ঋণের আকার ১৫ শতাংশের অধিক (২৪ নভেম্বর, ২০২০, যুগান্তর)।

এ তথ্যগুলো থেকে প্রতীয়মান হয়, সরকারের ঋণ ও দায় এরই মধ্যে অনেক হয়ে আছে। সরকারের অতিরিক্ত দায় বৃদ্ধি হলে অর্থনীতিতে সবচেয়ে ক্ষতিকর যে প্রভাব তৈরি হয়, তা হলো মুদ্রাস্ফীতি। এরই মধ্যে তা হয়ে আছে। বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার ব্যাংকিং আমানত সুদহারের চেয়ে অধিক।

এমন মুহূর্তে নতুন করে উন্নয়নের নামে সুকুকের মাধ্যমে সরকারের দায় বৃদ্ধি কি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য কল্যাণকর সিদ্ধান্ত? দেশের উন্নতি নিশ্চিতকরণের জন্য আমরা কি দায় ও ঋণের বোঝা বৃদ্ধি ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করতে পারি না?

আজকে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে চরম অনীহা প্রকাশ করছে। প্রণোদনার অর্থ বিতরণে ব্যাংকগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। পাবলিক ফিন্যান্স থেমে আছে। ফলে রাজস্ব আদায় কমে যায়। এর পেছনে সবচেয়ে বড় দায়ী খেলাপি গ্রাহক। টিআইবির গবেষণা অনুযায়ী, ৩ লাখ কোটি টাকা আটকে আছে গুটি কয়েক খেলাপি গ্রাহকের কাছে। মূলত এ কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে আগ্রহী নয়।

এমন মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল সম্মিলিতভাবে ইচ্ছাকৃত খেলাপি গ্রাহকদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করা। তাদেরকে অর্থ ফেরত দানে বাধ্য করা। এতে ব্যাংকিং খাত সচল হতো। ব্যাংকিং বিনিয়োগ গণমুখী হয়ে উঠত। রাজস্ব আদায়েও গতি বৃদ্ধি হতো। কিন্তু আসল সমস্যার সমাধানে না গিয়ে সরকার দায় বৃদ্ধির পথেই হাঁটল!

মোট কথা, সুকুক একটি শরিয়াহ প্রডাক্ট। সুদি বন্ডের বিরুদ্ধে এটি চালু হওয়া জরুরি। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটকালে যারা সংকট তৈরিতে সম্পৃক্ত, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে সংকট কাটানোর পথ বেছে নেয়া উচিত ছিল। এরপর হোম ওয়ার্ক করে অল্প ও সহজ মডিউলের মাধ্যমে সত্যিকার শরিয়াহ অনুশাসন মেনে সুকুক ইস্যু করা যেত। আর না হয় শুধু অর্থ সংগ্রহের একটি ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবে একে ব্যবহার করা হলে, শরিয়াহ ও অর্থনৈতিক সামগ্রিক কল্যাণকে গুরুত্ব না দিলে এটি দিন শেষে অর্থনীতিতে ফোঁড়া সৃষ্টি করবে। মাঝপথে বদনাম হবে ইসলামী প্রডাক্টের। আল্লাহ সুবাহানাহু আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। 

লেখকঃ

মুহাম্মাদ কবির হাসানযুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ ওয়ারল্যান্স ফিন্যান্সের অধ্যাপক; ইসলামিক ব্যাংকিং ও অর্থ ব্যবস্থা বিষয়ে ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) পুরস্কার বিজয়ী; অ্যাওফি এথিকস অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের পর্ষদ সদস্য

মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুমসিএসএএ, অ্যাওফি স্কলার

সংবাদ সূত্রঃ বনিক বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here