বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদকঃ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৬৬টি কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বুধবার বিএসইসি জানিয়েছে, ফ্লোর প্রাইসে থাকা কোম্পানিগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। অনেকদিন ধরে ফ্লোর প্রাইসে আটকে থাকায় বাজারে এর কোন প্রভাব পড়েনি। তাই প্রথমে যেসব কোম্পানির শেয়ার দর ৫০ টাকার মধ্যে ফ্লোর প্রাইসে রয়েছে সেসব কোম্পানিগুলো থেকে ফ্লোর থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

বুধবারের হিসেবে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর পর যেসব কোম্পানির শেয়ার ১০০ টাকার মধ্যে ফ্লোর প্রাইসে রয়েছে সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।

তবে বিষয়টিকে ভালোভাবে নিতে পারেন নি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বিএসইসির এ নির্দেশনার পরই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। যার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককেন্দ্রীক শেয়ারবাজার সম্পর্কিত গ্রুপগুলোতে। সেখানে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীই বিএসইসির এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারেরও দাবি জানাচ্ছেন।

তাদের মতে, গত বছরে করোনা প্রাদুর্ভাব শুরুর সময়ে বাজারে ব্যাপক দরপতন হয়। এতে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পরিমাণ বিনিয়োগের ৫০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। আর সে সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সাবেক কমিশন সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের শেষ পুঁজিটুকু বাচাতে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দেন। এতে হয়তো ওইসব শেয়ারের পতন ধরে রাখা গিয়েছে, তবে সেই লোকসান গত এক বছরেও পুষিয়ে নিতে পারেননি তারা। কারণ এই এক বছরে বাজার সূচক ও লেনদেনের দৃশ্যমান বা উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

অধিকাংশ বিনিয়োগকারীই মনে করছেন, আলোচ্য সময়ে বাজারের কিছু উন্নতি হলেও তার স্থায়িত্ব ছিল না। এখন আবারও করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে লকডাউনকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আর ঠিক এই সময়ে ৬৬ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার এবং পর্যায়ক্রমে আরও কিছু কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে বাজার ও বিনিয়োগকারীদের জন্য হুমকিস্বরূপ তারা মনে করছেন।

জানতে চাইলে ওয়ান ব্যাংক সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী মহসিন আহমেদ বলেন, বিএসইসির এ সিদ্ধান্তে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়েছে, সেসব কোম্পানি সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের পুঁজি নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা রয়েই যায়। কারণ বাজারের আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় ফ্লোর প্রাইসে থাকা অনেক কোম্পানিরই ক্রেতা ছিল না। পরিণতিতে এসব কোম্পানির শেয়ারেই আটকে ছিলেন তারা।

মহসিন আরও বলেন, দ্বিতীয় ধাপে করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকা এবং লকডাউন ইস্যুতে এমনিতেই বিনিয়োগকারীরা এক ধরনের শঙ্কায় রয়েছেন, তার উপরে বিএসইসির এমন সিদ্ধান্তকে ‘মরার উপরে খাড়ার ঘা’ হিসেবে মনে করেন তিনি। সেই সাথে বাজারের এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কার স্বার্থে বিএসইসি হঠাৎ ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের মতো এমন সর্বনাশা সিদ্ধান্ত নিলো, তা আমার বোধগম্য নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান-উর-রশীদ চৌধুরী বলেন, বিএসইসি কারসাজি চক্রের পাতানো ফাদে পা দিয়েছেন। যারা এতোদিন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করতে ফ্লোর প্রাইস উঠানোর জন্য নানামহলে ঘুরাফেরা আর তদবির করে আসছিলেন তারা আজ সফল। বিএসইসি নিজেই তাদের সেই পথ তৈরী করে দিলো।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে বিএসইসির চেয়ারম্যান নিজেই বলে আসছিলেন যে, বাজার যতদিন স্ট্যাবল না হবে ততোদিন ফ্লোর প্রাইস উঠানো হবে না। তবে আজ কি ওনার কাছে বাজারকে স্ট্যাবল মনে হচ্ছে? কিভাবে এবং কোন কারনে তা আমার বোধগম্য নয়।

মিজান-উর-রশীদ বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বাচাতে ফ্লোর প্রাইসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর কমিশন তথাকথিত কারসাজি মহল তথা মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যই বাজার এই দুঃসময়ে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করেছেন- যা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
এ সময় তিনি বিএসইসির চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আমি মনে করি বাজার সূচক ১০ হাজারে না যাওয়া পর্যন্ত ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা উচিত হবে না।

কারণ এতে বড় বিনিয়োগকারীরা লাভবান হলেও আমাদের মতো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা শেষ সম্বল হারিয়ে আত্মহত্যা করা ছাড়া উপায় থাকবে না। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বাচাতে অবিলম্বে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ সম্মিলিত পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও আইসিবি ইনভেস্টরস ফোরামের এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট রুহুল আমিন আকন্দ বলেন, বিষয়টি বাজারের জন্য অশনি সংকেত। কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সাবেক কমিশন বাজারের স্থিতিশীলতায় ফ্লোর প্রাইসের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান কমিশন ঠিক কি কারণে বিনিয়োগকারীদের জন্য সর্বনাশী এমন সিদ্ধান্ত নিল, তা আমার মাথায়ও ঢুকছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, মানলাম সারাজীবনতো ফ্লোর প্রাইস রাখা যাবে না, কোন এক সময়তো এটাকে উঠাতেই হবে। সেক্ষেত্রে বিএসইসি ৬৬টি কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার না করে পরীক্ষামূলক ৫-১০টার প্রত্যাহার করে দেখতে পারতো। তবে তিনি মনে করেন বাজার তথা বাজারের প্রাণ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে অবশ্যই অবিলম্বে বিএসইসির এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা উচিত।

প্রসঙ্গত, বুধবার যেসব কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়েছে, সেগুলো হলো-
পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেড, আর এন স্পিনিং মিলস লিমিটেড, বাংলাদেশ সার্ভিস লিমিটেড, আইএফআইএল ইসলামিক মিউচ্যুয়াল ফান্ড, জাহিন স্পিনিং লিমিটেড, রিং সাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড, অলিম্পিক এক্সেসোরিজ লিমিটেড, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ফনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, নূরানী ডাইং অ্যান্ড সুয়েটার লিমিটেড, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, এসইএমএল এফবিএলএফএসএল গ্রোথ ফান্ড, ইভেন্স টেক্সটাইলস লিমিটেড, প্যাসিফিক ডেনিমস লিমিটেড, মেট্রো স্পিনিং লিমিটেড, ফার কেমিক্যালস লিমিটেড, দেশ বন্ধু পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ইয়াকিন পলিমার লিমিটেড, সাফকো স্পিনিং মিলস লিমিটেড, ওয়েস্টার্ণ মেরিন শিফইয়ার্ড লিমিটেড, সেন্ট্রাল ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেড, বীচ হেচারীজ লিমিটেড, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, হামিদ ফেব্রিক্স লিমিটেড, প্রাইম টেক্সটাইলস স্পিনিং মিলস লিমিটেড, সায়হাম টেক্সটাইলস লিমিটেড, গোল্ডেন হার্ভেস্ট এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এএফসি এগ্রো বায়োটিক লিমিটেড, বেঙ্গল উইন্ডসোর থার্মোপ্লাস্টিকস লিমিটেড, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, সিলভা ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেড, ইন্দোবাংলা ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেড, আরগন ডেনিমস লিমিটেড।

এছাড়াও রয়েছে কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, শাশা ডেনিমস লিমিটেড, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এস্কয়ার নিটিং কমপোজিট লিমিটেড, ভিএফএস থ্রেড ডাইং লিমিটেড, ফোনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টম্যান্ট লিমিটেড, এডভেন্ট ফার্মা লিমিটেড, আরএসআরএম লিমিটেড, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড, ওয়াউম্যাক্স ইলেক্ট্রোড লিমিটেড, রূপালী ব্যাংক লিমিটেড, সায়হাম টেক্সটাইলস মিলস লিমিটেড, সোনারগা টেক্সটাইলস লিমিটেড, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, গ্লোবাল হেভী কেমিক্যালস লিমিটেড, নাভানা সিএজি লিমিটেড, ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড, ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড ইন্সুরেন্স লিমিটেড, ফারইস্ট ইসলামি লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টম্যান্ট লিমিটেড উসমানিয়া গ্লাস সিট ফ্যাক্টরী লিমিটেড. খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, নাহী অ্যালোমিনিয়াম লিমিটেড, দুলা মিয়া কটোন স্পিনিং মিলস লিমিটেড, সিনোবাংলা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস লিমিটেড, এমএল ডাইং লিমিটেড।

ঢাকা/এইচকে

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here