০১:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের বাজেট আসছে

থাকছে বিনিয়োগ বাড়ানোর সকল সহায়ক নীতিমালা

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ১১:১৮:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
  • / ১০১৭২ বার দেখা হয়েছে

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে সামনে রেখেই নতুন সরকারের অধীনে প্রথম জাতীয় বাজেট প্রণয়ন হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করবেন।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর সবরকম সহায়ক নীতিমালা, বরাদ্দ ও সহযোগিতা চান ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, সরকারের জিডিপির যে লক্ষ্য তা পূরণ করতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। এজন্য জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বিদ্যুতের দাম কমানো, ব্যবসায়ের অনুকূল পরিবেশ তৈরি, ব্যবসা শুরুর জটিলতা কমানো ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সহায়তা যাতে থাকে, এমন বাজেট দরকার।

আর অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামী বাজেটে সবার আগে মনোযোগ দেওয়া উচিত মূল্যস্ফীতিতে। এ ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছেন তারা। তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে সুদের হার কমাতে হবে, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগেও সহায়ক হবে। এ ছাড়া বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে পারলে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে এবং দামও স্থিতিশীল হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

এ ছাড়া কর কাঠামো সংস্কার করে অর্থের সরবরাহ বাড়ানোর মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও বাজেটে থাকা দরকার বলে মনে করছেন তারা। কর কাঠামোর সংস্কার করে বাস্তবমুখী ও বাস্তবায়নযোগ্য বাজেটের পরামর্শ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদ সবারই। তারা বলছেন, রাজস্ব আয় বাড়াতে কর কাঠমোর সংস্কার করতে হবে। অন্যথায় বিপরীতে যারা কর দেয় তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে। এতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে।

আর সরকার বলছে অর্থনীতির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এটা টেনে তুলতে হলে অর্থের জোগান বাড়াতে হবে। তাই বড় বাজেট দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যও অর্থনীতিকে টেনে তোলা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকাই চলে যাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, ঋণের সুদ, মূলধনি ব্যয়সহ নানা পরিচালন ব্যয় হিসেবে। বাকি ৩ লাখ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে উন্নয়নমূলক কাজের (এডিপি) জন্য। এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। বাজেট ঘাটতি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। আগামী বাজেটে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের জিডিপির আকার প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা বর্তমানে ৯ শতাংশের বেশি।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান-উর-রহমান কালবেলাকে বলেন, জাতীয় বাজেটে আমাদের অনেক প্রত্যাশা থাকে। ব্যবসা ও বিনিয়োগে অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোতে নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সমস্যাগুলো সমাধান করা প্রয়োজন। তাদের কীভাবে নীতি সহায়তা দেওয়া যায়, ভোগান্তি-জটিলতাগুলো কীভাবে নিরসন করে ব্যবসায় গতি বাড়ানো যায়— সেদিকে জোর দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক নীতিমালাগুলো ঘন ঘন বদলায়, যা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বড় বাধা। এর পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থির নীতিমালা থাকতে হবে।

লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বিদেশ থেকে বিনিয়োগকারীরা যখন আসছে, তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে ভয় পায়। তার বড় কারণ হচ্ছে কর হার ও নীতির অস্থিরতা। কোনো নিশ্চয়তা নাই—আজকে ২০ শতাংশ তো কালকে ২২, পরশু ২৫ শতাংশ। তাদের কথা হলো—২০ পারসেন্ট নাও, সমস্যা নেই। বিনিয়োগকারীরা একটা প্রতিশ্রুতি চায়। এই জায়গা থেকে বের হতে হবে। বাজেটে স্থিতিশীল একটা করনীতি করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মোট যে কর আদায় হয়, তার ৭৮ শতাংশই উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) থেকে আসে। এটা যদি ৭০ শতাংশও হয়, যা অর্থনীতির জন্য অস্বাস্থ্যকর। এটা অর্থনীতির প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে। এতে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে। নতুন বাজেটে সব মিলিয়ে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হচ্ছে। এটা করতে গেলে আমরা কর সন্ত্রাসের শিকার হব। আর এনবিআরের সংস্কার হোক বা না হোক, নীতি ও বাস্তবায়ন শাখা আলাদা করা উচিত।

অর্থনীতিবিদরা যা বলছেন:

আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেটের দিকে যাচ্ছে, কারণ ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। মুদ্রানীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে পারলে দামও স্থিতিশীল হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

একই রকম মন্তব্য অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজের। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এটা বাড়তে থাকায় চাহিদা কমছে। ব্যবসা পরিচালনাও সমস্যা হচ্ছে।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের অর্থনীতির যে চাহিদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা—এগুলো নিশ্চিত করতে গেলে আমাদের অর্থ লাগবে। এবারের বাজেটে আমাদের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার জন্য বেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির দরকার হবে। এক্ষেত্রে কীভাবে আমরা প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়াতে পারি; সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। কর কাঠামোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যবসায়িক খরচ কমানো এবং উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে গতি আনার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে বলে মনে করছেন তিনি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনির মতে, আগামী বাজেট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ‘উচ্চাভিলাষী’ এবং কাঠামোগতভাবে অনেকাংশে ‘গতানুগতিক’। তিনি বলেন, বাজেটের আকার, উন্নয়ন ব্যয় এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সবই বড় পরিসরে নির্ধারণ করা হয়েছে; যেটির বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

তার মতে, এবার বাজেটের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করা। শুধু কথার আশ্বাস নয়, জনগণকে বাস্তবে দেখাতে হবে যে, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশে ব্যবসার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ করতে পেরেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, আমানতকারীরা দেখবে আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে আর বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীরা আশ্বস্ত হবেন যে, আর্থিক খাতে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হচ্ছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শন

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এবারের বাজেট সবার আগে বাংলাদেশ দর্শনের ওপরই ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্যের শেষে সেরকম বক্তব্যই যোগ করেছেন। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্য শেষ করছেন যে বক্তব্য দিয়ে তা হলো—‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে এই ব্যাপক সামাজিক পরিকল্পনা, মানুষের কর্মসংস্থান, সুশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, আইনের শাসন, এবং সামাজিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশকে বাস্তব উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

ঢাকা/আরএইচ

শেয়ার করুন

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের বাজেট আসছে

থাকছে বিনিয়োগ বাড়ানোর সকল সহায়ক নীতিমালা

আপডেট: ১১:১৮:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে সামনে রেখেই নতুন সরকারের অধীনে প্রথম জাতীয় বাজেট প্রণয়ন হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করবেন।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর সবরকম সহায়ক নীতিমালা, বরাদ্দ ও সহযোগিতা চান ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, সরকারের জিডিপির যে লক্ষ্য তা পূরণ করতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। এজন্য জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বিদ্যুতের দাম কমানো, ব্যবসায়ের অনুকূল পরিবেশ তৈরি, ব্যবসা শুরুর জটিলতা কমানো ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সহায়তা যাতে থাকে, এমন বাজেট দরকার।

আর অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামী বাজেটে সবার আগে মনোযোগ দেওয়া উচিত মূল্যস্ফীতিতে। এ ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছেন তারা। তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে সুদের হার কমাতে হবে, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগেও সহায়ক হবে। এ ছাড়া বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে পারলে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে এবং দামও স্থিতিশীল হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

এ ছাড়া কর কাঠামো সংস্কার করে অর্থের সরবরাহ বাড়ানোর মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও বাজেটে থাকা দরকার বলে মনে করছেন তারা। কর কাঠামোর সংস্কার করে বাস্তবমুখী ও বাস্তবায়নযোগ্য বাজেটের পরামর্শ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদ সবারই। তারা বলছেন, রাজস্ব আয় বাড়াতে কর কাঠমোর সংস্কার করতে হবে। অন্যথায় বিপরীতে যারা কর দেয় তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে। এতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে।

আর সরকার বলছে অর্থনীতির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এটা টেনে তুলতে হলে অর্থের জোগান বাড়াতে হবে। তাই বড় বাজেট দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যও অর্থনীতিকে টেনে তোলা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকাই চলে যাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, ঋণের সুদ, মূলধনি ব্যয়সহ নানা পরিচালন ব্যয় হিসেবে। বাকি ৩ লাখ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে উন্নয়নমূলক কাজের (এডিপি) জন্য। এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। বাজেট ঘাটতি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। আগামী বাজেটে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের জিডিপির আকার প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা বর্তমানে ৯ শতাংশের বেশি।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান-উর-রহমান কালবেলাকে বলেন, জাতীয় বাজেটে আমাদের অনেক প্রত্যাশা থাকে। ব্যবসা ও বিনিয়োগে অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোতে নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সমস্যাগুলো সমাধান করা প্রয়োজন। তাদের কীভাবে নীতি সহায়তা দেওয়া যায়, ভোগান্তি-জটিলতাগুলো কীভাবে নিরসন করে ব্যবসায় গতি বাড়ানো যায়— সেদিকে জোর দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক নীতিমালাগুলো ঘন ঘন বদলায়, যা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বড় বাধা। এর পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থির নীতিমালা থাকতে হবে।

লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বিদেশ থেকে বিনিয়োগকারীরা যখন আসছে, তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে ভয় পায়। তার বড় কারণ হচ্ছে কর হার ও নীতির অস্থিরতা। কোনো নিশ্চয়তা নাই—আজকে ২০ শতাংশ তো কালকে ২২, পরশু ২৫ শতাংশ। তাদের কথা হলো—২০ পারসেন্ট নাও, সমস্যা নেই। বিনিয়োগকারীরা একটা প্রতিশ্রুতি চায়। এই জায়গা থেকে বের হতে হবে। বাজেটে স্থিতিশীল একটা করনীতি করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মোট যে কর আদায় হয়, তার ৭৮ শতাংশই উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) থেকে আসে। এটা যদি ৭০ শতাংশও হয়, যা অর্থনীতির জন্য অস্বাস্থ্যকর। এটা অর্থনীতির প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে। এতে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে। নতুন বাজেটে সব মিলিয়ে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হচ্ছে। এটা করতে গেলে আমরা কর সন্ত্রাসের শিকার হব। আর এনবিআরের সংস্কার হোক বা না হোক, নীতি ও বাস্তবায়ন শাখা আলাদা করা উচিত।

অর্থনীতিবিদরা যা বলছেন:

আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেটের দিকে যাচ্ছে, কারণ ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। মুদ্রানীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে পারলে দামও স্থিতিশীল হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

একই রকম মন্তব্য অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজের। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এটা বাড়তে থাকায় চাহিদা কমছে। ব্যবসা পরিচালনাও সমস্যা হচ্ছে।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের অর্থনীতির যে চাহিদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা—এগুলো নিশ্চিত করতে গেলে আমাদের অর্থ লাগবে। এবারের বাজেটে আমাদের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার জন্য বেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির দরকার হবে। এক্ষেত্রে কীভাবে আমরা প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়াতে পারি; সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। কর কাঠামোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যবসায়িক খরচ কমানো এবং উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে গতি আনার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে বলে মনে করছেন তিনি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনির মতে, আগামী বাজেট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ‘উচ্চাভিলাষী’ এবং কাঠামোগতভাবে অনেকাংশে ‘গতানুগতিক’। তিনি বলেন, বাজেটের আকার, উন্নয়ন ব্যয় এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সবই বড় পরিসরে নির্ধারণ করা হয়েছে; যেটির বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

তার মতে, এবার বাজেটের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করা। শুধু কথার আশ্বাস নয়, জনগণকে বাস্তবে দেখাতে হবে যে, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশে ব্যবসার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ করতে পেরেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, আমানতকারীরা দেখবে আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে আর বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীরা আশ্বস্ত হবেন যে, আর্থিক খাতে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হচ্ছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শন

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এবারের বাজেট সবার আগে বাংলাদেশ দর্শনের ওপরই ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্যের শেষে সেরকম বক্তব্যই যোগ করেছেন। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্য শেষ করছেন যে বক্তব্য দিয়ে তা হলো—‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে এই ব্যাপক সামাজিক পরিকল্পনা, মানুষের কর্মসংস্থান, সুশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, আইনের শাসন, এবং সামাজিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশকে বাস্তব উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

ঢাকা/আরএইচ