০৫:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪
পুঁজি ফেরতের শঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা

টানাপোড়েনের বাজারে বাড়ছে হাহাকার!

শফীউল সুমন
  • আপডেট: ০৫:৩৯:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ মার্চ ২০২৩
  • / ৪৫২৪ বার দেখা হয়েছে

বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য মুনাফার্জন, আর এ কারণেই বিনিয়োগকারীরা তাদের কষ্টার্জিত পুঁজি বিনিয়োগ করে থাকেন। কেউ বিনিয়োগ করেন পছন্দসই ব্যবসায় আবার কেউ বা নিশ্চিত মাধ্যম বিবেচনায় রাখেন ব্যাংকে। তবে বিশ্বব্যাপি বিনিয়োগের আকর্ষনীয় স্থান হচ্ছে পুঁজিবাজার, যদিও তা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করতে পারলে অন্য যেকোন উৎস থেকে এর রিটার্ণ অনেক ভালো আসে। এছাড়া একটি দেশের পুঁজিবাজার সে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। যে দেশের পুঁজিবাজার যতো বেশি শক্তিশালি, সে দেশের অর্থনীতি ততোটাই শক্তিশালি। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশই।

এ  কথা সত্য যে  পুঁজিবাজার ঝুঁকিপূর্ণ, উত্থান-পতনই পুঁজিবাজারের ধর্ম। তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে পতনই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পালাবদলে একমাত্র পুঁজিবাজারই উল্টোরথে চলছে। দিনবদলের পালাক্রমে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। কোনকিছুতেই পতনের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের পুঁজিবাজার ধসের পর বিনিয়োগকারীসহ সবশ্রেনীর মানুষ দেশের পুঁজিবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো। যদিও ২০২০ সালের মে মাসে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণ এবং সে সময় পুঁজিবাজার সংস্কারে কমিশনের তৎপরতায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুরনো ক্ষত ভুলতে শুরু করেছিল। পুরনো লোকসান কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে বিনিয়োগকারীরাও নতুন করে তাদের সর্বস্ব নিয়ে বিনিয়োগে আসে। অবশ্য এরও একটি গ্রহণযোগ্য কারণ ছিল। সে সময় কমিশনের চেয়ারম্যানসহ কমিশনাররাও বিনিয়োগকারীদের পাঁচ হাজার কোটি টাকা লেনদেনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলো।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

কিন্তু সে আশায়ও ‘গুড়েবালি’। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বর্তমান দায়িত্ব্য নেয়ার পর থেকে কমিশনের কর্তা-ব্যাক্তিরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে চটকদার মন্তব্য, রোডশো’র নামে বিদেশ ভ্রমন কিংবা বস্তাপঁচা কোম্পানির আইপিও অনুমোদনেই ব্যস্ত ছিলেন। তারা অভিযোগ করে বলেন, বাজারে একের পর এক কারসাজি চললেও সেখানে ভ্রুক্ষেপ ছিল না তাদের, বরং পরোক্ষভাবে খাতভিত্তিক বিনিয়োগের পরামর্শও দিয়েছিলেন কেউ কেউ। আর এতেই গুটিকয়েক খাত বা কোম্পানির ওপর ভর করে ফুলে-ফেঁপে ওঠেছিলো পুঁজিবাজার। এতে কারসাজি চক্র নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে শটকে যেতে পারলেও আটকে গেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষনেই যার প্রমাণ মেলে।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য বিশ্লেষনে দেখা যায়, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব্য নেয়ার সময় বা ২০২০ সালের ৩১ মে ডিএসই’র প্রধান ইনডেক্স ডিএসইএক্স ৪০৬০ পয়েন্টে। যা প্রায় দেড় বছরের ব্যবধানে (করোনাকালীন সময়ে লেনদেন বন্ধ বাদে) ২০২১ সালে সেপ্টেম্বরে ৭ হাজার পয়েন্টের ওপরে ওঠে আসে। সে সময় লেনদেনও হয়েছে ২৫০০ কোটি টাকার আশপাশে, যা ওঠেছিল প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায়। তবে বাজার উল্টোদিকে হাটতেও সময় নেয়নি বেশিদিন। বর্তমানে পুঁজিবাজারের লেনদেন ২’শ কোটির ঘরে, সূচকও নেমে এসেছে ৬ হাজারে। হঠাৎ করে কি কারণে লেনদেন তিন হাজার কোটিতে গেলো বা কেনোই বা ২’শ কোটিতে নেমে আসলো- তার হিসাব মেলাতে পারছেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। যদিও বাজারের পতন ঠেকাতে ২০২২ সালে জুলাই মাসে নতুন করে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেছে বিএসইসি। তবে এতে কাজের কাজ কিছু না হলেও প্রায় সাত মাসের বেশি সময়ে ধরে আটকে আছে বিনিয়োগকারীদের ভাগ্য।

একাধিক বিনিয়োগকারী ও ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাজার উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সময়োপযোগী পদক্ষেপের অভাব, কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়া বা লোক দেখানো শাস্তি প্রদান এবং স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারলে বাজারে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। পরিণতিতে প্রকট আকার ধারণ করেছে তারল্য সঙ্কট। যার প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। এর বাইরে করোনার প্রাদুর্ভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলার সঙ্কট কিংবা বিশ্বব্যাপি অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কারও নেতিবাচক প্রভাবে সবশ্রেনীর বিনিয়োগকারীরাও সাইডলাইনে রয়েছেন। তবে বিশ্ব পুঁজিবাজার সেসব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠতে পারলেও পরিবর্তন আসেনি এ দেশের পুঁজিবাজারে। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাতগুলোও এসব প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবেলা করতে পারলেও তলানীতে ঠেকেছে বাজারের লেনদেন।

সিকিউরিটিজ হাউজ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের এ পরিস্থিতির উত্তোরণ না ঘটলে ব্যবসা চালিয়ে নেয়া দুরুহ হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে অনেক হাউজে ছাটাই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।

অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরাও রয়েছেন ফোর্সসেল আতঙ্কে। কারণ গত বছর ফ্লোর প্রাইস আরোপে আগে অর্থ্যাৎ যখন বাজার পরিস্থিতি কিছুটা ইতিবাচক ছিল তখন অনেক বিনিয়োগকারীই মার্জিন ঋণ নিয়ে নতুন করে বিনিয়োগে এসেছিলেন। কিন্তু সূচক ও লেনদেনের ধারাবাহিকতা না থাকায় বিনিয়োগকৃত পুঁজি অর্ধেকে নেমে এসেছে। একদিকে ফ্লোর প্রাইস থাকায় যেমন নিটিং করতে পারছেন না অন্যদিকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার হলেও পড়বেন ফোর্স সেলের কবলে। এ অবস্থা পুঁজি আর ফেরত পাবেন কি না- এ নিয়েও দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন অধিকাংশ বিনিয়োগকারীরা।

আরও পড়ুন: ২০ হাজার শেয়ার ক্রয়ের ঘোষণা

এ প্রসঙ্গে আলাপকালে এডি হোল্ডিংস অ্যান্ড সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী রফিকুল ইসলাম বিজনেস জার্নালকে বলেন, পুঁজিবাজারে নতুন করে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম। একদিকে তা কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে, অন্যদিকে ফ্লোর প্রাইসের কারনে টাকার প্রয়োজন হলেও বিক্রি করতে পারছি না। তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজারই আমার একমাত্র অর্থ উপার্জনের মাধ্যম। কিন্তু প্রায় এক বছরের কাছাকাছি আমার বিনিয়োগ থেকে কোন রিটার্নই পাচ্ছি না। সংসারের খরচ, বাচ্চাদের লেখাপড়া চালিয়ে নেয়া আমার জন্য দুরুহ হয়ে পড়েছে। এখন আমি কি করবো, তা আমি নিজেও জানি না।

আরেক বিনিয়োগকারী সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বলেন, পুঁজিবাজারে কারসাজি থাকবে তা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তা মাত্রাতিরিক্ত। আর এ কারসাজি নিয়ন্ত্রনে বিএসইসি পুরোপুরি ব্যর্থ। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএসইসি সার্ভিল্যান্স সক্ষমতা যথেষ্ট শক্তিশালি, তবে সার্ভিল্যান্সের দায়িত্ব থাকা কর্তা-ব্যাক্তিদের স্বদ্বিচ্ছার অভাবে তা বিনিয়োগকারীদের কাজে আসছে না। এছাড়া ১০ কোটি টাকা অনিয়মের বিপরীতে ১০ লাখ টাকা জরিমানা-শাস্তির নামে প্রহসণ। এতে কারসাজি কমার বদলে উল্টো বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

পেনশনের পুরো টাকাই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন এএল সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী ইকরাম আলি। বিজনেস জার্নালের প্রতিবেদককে কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি  বলেন, পেনশনের পুরো টাকা এখানে বিনিয়োগ করা আমার জীবনের একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো। পুজিবাজারে উত্থান-পতন থাকেই, কিন্তু একদিন সূচক বাড়লে মাসের পর মাস কমে- শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। এমন যদি হয় মার্কেটের অবস্থা তাহলে আমাদের চলবে কীভাবে। তিনি অবিলম্বে বাজারের স্থিতিশীলতায় সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে কমিশনের প্রতি জোর দাবি জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সিকিউরিটিজ হাউসের কর্মকর্তারা জানান, বাজারের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সিকিউরিটিজ হাউসের ব্যয় বহন করাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। কিন্তু বাজারের এ করুন সময়ে বিএসইসি বাজার বাদ দিয়ে রোডশো আর সভা সেমিনার নিয়ে পড়ে আছে। এটা মানতেই হবে যে বিনিয়োগকারী ও সিকিউরিটিজ হাউজগুলো বাচলে বাজার বাচবে। অন্যথায় বিদেশ ঘুরে বিএসইসি যতোই উন্নয়নের গাল-গপ্প শোনান, তা কাজে আসবে না।

আরও পড়ুন: ক্যাশ ডিভিডেন্ড পাঠিয়েছে এইচ.আর টেক্সটাইল

জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বিজনেস জার্নালকে বলেন, লেনদেন ৫০০ কোটি হোক আর ২০০ কোটি হোক, ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে বাজার কখনো ভালো করা সম্ভব না। বর্তমান বাজার আটকে আছে ফ্লোর প্রাইসে। ফ্লোর প্রাইস না তুললে বিনিয়োগকারীরা আরও ক্ষতিগ্রস্থ হবে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে ফ্লোর  প্রাইস নেই বলেও তিনি জানান।

প্রসঙ্গত, পুঁজিবাজারে লেনদেনে গতি ফেরাতে তালিকাভুক্ত ১৬৯ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন মূল্যস্তর তুলে নেওয়া হয়েছিল গত বছরের ২১ ডিসেম্বর। একইসাথে এসব কোম্পানির শেয়ারদর এক দিনে সর্বোচ্চ কমায় সীমা নির্ধারিত হয়েছিল ১ শতাংশ। যদিও আজ বুধবার (১ মার্চ ২০২৩) এসব কোম্পানিতে ফের ফ্লোর প্রাইস পুনর্বহাল করেছে বিএসইসি।

শেয়ার করুন

x
English Version

পুঁজি ফেরতের শঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা

টানাপোড়েনের বাজারে বাড়ছে হাহাকার!

আপডেট: ০৫:৩৯:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ মার্চ ২০২৩

বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য মুনাফার্জন, আর এ কারণেই বিনিয়োগকারীরা তাদের কষ্টার্জিত পুঁজি বিনিয়োগ করে থাকেন। কেউ বিনিয়োগ করেন পছন্দসই ব্যবসায় আবার কেউ বা নিশ্চিত মাধ্যম বিবেচনায় রাখেন ব্যাংকে। তবে বিশ্বব্যাপি বিনিয়োগের আকর্ষনীয় স্থান হচ্ছে পুঁজিবাজার, যদিও তা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করতে পারলে অন্য যেকোন উৎস থেকে এর রিটার্ণ অনেক ভালো আসে। এছাড়া একটি দেশের পুঁজিবাজার সে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। যে দেশের পুঁজিবাজার যতো বেশি শক্তিশালি, সে দেশের অর্থনীতি ততোটাই শক্তিশালি। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশই।

এ  কথা সত্য যে  পুঁজিবাজার ঝুঁকিপূর্ণ, উত্থান-পতনই পুঁজিবাজারের ধর্ম। তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে পতনই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পালাবদলে একমাত্র পুঁজিবাজারই উল্টোরথে চলছে। দিনবদলের পালাক্রমে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। কোনকিছুতেই পতনের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের পুঁজিবাজার ধসের পর বিনিয়োগকারীসহ সবশ্রেনীর মানুষ দেশের পুঁজিবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো। যদিও ২০২০ সালের মে মাসে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণ এবং সে সময় পুঁজিবাজার সংস্কারে কমিশনের তৎপরতায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুরনো ক্ষত ভুলতে শুরু করেছিল। পুরনো লোকসান কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে বিনিয়োগকারীরাও নতুন করে তাদের সর্বস্ব নিয়ে বিনিয়োগে আসে। অবশ্য এরও একটি গ্রহণযোগ্য কারণ ছিল। সে সময় কমিশনের চেয়ারম্যানসহ কমিশনাররাও বিনিয়োগকারীদের পাঁচ হাজার কোটি টাকা লেনদেনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলো।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

কিন্তু সে আশায়ও ‘গুড়েবালি’। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বর্তমান দায়িত্ব্য নেয়ার পর থেকে কমিশনের কর্তা-ব্যাক্তিরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে চটকদার মন্তব্য, রোডশো’র নামে বিদেশ ভ্রমন কিংবা বস্তাপঁচা কোম্পানির আইপিও অনুমোদনেই ব্যস্ত ছিলেন। তারা অভিযোগ করে বলেন, বাজারে একের পর এক কারসাজি চললেও সেখানে ভ্রুক্ষেপ ছিল না তাদের, বরং পরোক্ষভাবে খাতভিত্তিক বিনিয়োগের পরামর্শও দিয়েছিলেন কেউ কেউ। আর এতেই গুটিকয়েক খাত বা কোম্পানির ওপর ভর করে ফুলে-ফেঁপে ওঠেছিলো পুঁজিবাজার। এতে কারসাজি চক্র নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে শটকে যেতে পারলেও আটকে গেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষনেই যার প্রমাণ মেলে।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য বিশ্লেষনে দেখা যায়, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব্য নেয়ার সময় বা ২০২০ সালের ৩১ মে ডিএসই’র প্রধান ইনডেক্স ডিএসইএক্স ৪০৬০ পয়েন্টে। যা প্রায় দেড় বছরের ব্যবধানে (করোনাকালীন সময়ে লেনদেন বন্ধ বাদে) ২০২১ সালে সেপ্টেম্বরে ৭ হাজার পয়েন্টের ওপরে ওঠে আসে। সে সময় লেনদেনও হয়েছে ২৫০০ কোটি টাকার আশপাশে, যা ওঠেছিল প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায়। তবে বাজার উল্টোদিকে হাটতেও সময় নেয়নি বেশিদিন। বর্তমানে পুঁজিবাজারের লেনদেন ২’শ কোটির ঘরে, সূচকও নেমে এসেছে ৬ হাজারে। হঠাৎ করে কি কারণে লেনদেন তিন হাজার কোটিতে গেলো বা কেনোই বা ২’শ কোটিতে নেমে আসলো- তার হিসাব মেলাতে পারছেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। যদিও বাজারের পতন ঠেকাতে ২০২২ সালে জুলাই মাসে নতুন করে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেছে বিএসইসি। তবে এতে কাজের কাজ কিছু না হলেও প্রায় সাত মাসের বেশি সময়ে ধরে আটকে আছে বিনিয়োগকারীদের ভাগ্য।

একাধিক বিনিয়োগকারী ও ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাজার উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সময়োপযোগী পদক্ষেপের অভাব, কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়া বা লোক দেখানো শাস্তি প্রদান এবং স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারলে বাজারে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। পরিণতিতে প্রকট আকার ধারণ করেছে তারল্য সঙ্কট। যার প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। এর বাইরে করোনার প্রাদুর্ভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলার সঙ্কট কিংবা বিশ্বব্যাপি অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কারও নেতিবাচক প্রভাবে সবশ্রেনীর বিনিয়োগকারীরাও সাইডলাইনে রয়েছেন। তবে বিশ্ব পুঁজিবাজার সেসব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠতে পারলেও পরিবর্তন আসেনি এ দেশের পুঁজিবাজারে। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাতগুলোও এসব প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবেলা করতে পারলেও তলানীতে ঠেকেছে বাজারের লেনদেন।

সিকিউরিটিজ হাউজ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের এ পরিস্থিতির উত্তোরণ না ঘটলে ব্যবসা চালিয়ে নেয়া দুরুহ হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে অনেক হাউজে ছাটাই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।

অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরাও রয়েছেন ফোর্সসেল আতঙ্কে। কারণ গত বছর ফ্লোর প্রাইস আরোপে আগে অর্থ্যাৎ যখন বাজার পরিস্থিতি কিছুটা ইতিবাচক ছিল তখন অনেক বিনিয়োগকারীই মার্জিন ঋণ নিয়ে নতুন করে বিনিয়োগে এসেছিলেন। কিন্তু সূচক ও লেনদেনের ধারাবাহিকতা না থাকায় বিনিয়োগকৃত পুঁজি অর্ধেকে নেমে এসেছে। একদিকে ফ্লোর প্রাইস থাকায় যেমন নিটিং করতে পারছেন না অন্যদিকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার হলেও পড়বেন ফোর্স সেলের কবলে। এ অবস্থা পুঁজি আর ফেরত পাবেন কি না- এ নিয়েও দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন অধিকাংশ বিনিয়োগকারীরা।

আরও পড়ুন: ২০ হাজার শেয়ার ক্রয়ের ঘোষণা

এ প্রসঙ্গে আলাপকালে এডি হোল্ডিংস অ্যান্ড সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী রফিকুল ইসলাম বিজনেস জার্নালকে বলেন, পুঁজিবাজারে নতুন করে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম। একদিকে তা কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে, অন্যদিকে ফ্লোর প্রাইসের কারনে টাকার প্রয়োজন হলেও বিক্রি করতে পারছি না। তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজারই আমার একমাত্র অর্থ উপার্জনের মাধ্যম। কিন্তু প্রায় এক বছরের কাছাকাছি আমার বিনিয়োগ থেকে কোন রিটার্নই পাচ্ছি না। সংসারের খরচ, বাচ্চাদের লেখাপড়া চালিয়ে নেয়া আমার জন্য দুরুহ হয়ে পড়েছে। এখন আমি কি করবো, তা আমি নিজেও জানি না।

আরেক বিনিয়োগকারী সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বলেন, পুঁজিবাজারে কারসাজি থাকবে তা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তা মাত্রাতিরিক্ত। আর এ কারসাজি নিয়ন্ত্রনে বিএসইসি পুরোপুরি ব্যর্থ। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএসইসি সার্ভিল্যান্স সক্ষমতা যথেষ্ট শক্তিশালি, তবে সার্ভিল্যান্সের দায়িত্ব থাকা কর্তা-ব্যাক্তিদের স্বদ্বিচ্ছার অভাবে তা বিনিয়োগকারীদের কাজে আসছে না। এছাড়া ১০ কোটি টাকা অনিয়মের বিপরীতে ১০ লাখ টাকা জরিমানা-শাস্তির নামে প্রহসণ। এতে কারসাজি কমার বদলে উল্টো বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

পেনশনের পুরো টাকাই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন এএল সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী ইকরাম আলি। বিজনেস জার্নালের প্রতিবেদককে কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি  বলেন, পেনশনের পুরো টাকা এখানে বিনিয়োগ করা আমার জীবনের একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো। পুজিবাজারে উত্থান-পতন থাকেই, কিন্তু একদিন সূচক বাড়লে মাসের পর মাস কমে- শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। এমন যদি হয় মার্কেটের অবস্থা তাহলে আমাদের চলবে কীভাবে। তিনি অবিলম্বে বাজারের স্থিতিশীলতায় সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে কমিশনের প্রতি জোর দাবি জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সিকিউরিটিজ হাউসের কর্মকর্তারা জানান, বাজারের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সিকিউরিটিজ হাউসের ব্যয় বহন করাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। কিন্তু বাজারের এ করুন সময়ে বিএসইসি বাজার বাদ দিয়ে রোডশো আর সভা সেমিনার নিয়ে পড়ে আছে। এটা মানতেই হবে যে বিনিয়োগকারী ও সিকিউরিটিজ হাউজগুলো বাচলে বাজার বাচবে। অন্যথায় বিদেশ ঘুরে বিএসইসি যতোই উন্নয়নের গাল-গপ্প শোনান, তা কাজে আসবে না।

আরও পড়ুন: ক্যাশ ডিভিডেন্ড পাঠিয়েছে এইচ.আর টেক্সটাইল

জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বিজনেস জার্নালকে বলেন, লেনদেন ৫০০ কোটি হোক আর ২০০ কোটি হোক, ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে বাজার কখনো ভালো করা সম্ভব না। বর্তমান বাজার আটকে আছে ফ্লোর প্রাইসে। ফ্লোর প্রাইস না তুললে বিনিয়োগকারীরা আরও ক্ষতিগ্রস্থ হবে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে ফ্লোর  প্রাইস নেই বলেও তিনি জানান।

প্রসঙ্গত, পুঁজিবাজারে লেনদেনে গতি ফেরাতে তালিকাভুক্ত ১৬৯ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন মূল্যস্তর তুলে নেওয়া হয়েছিল গত বছরের ২১ ডিসেম্বর। একইসাথে এসব কোম্পানির শেয়ারদর এক দিনে সর্বোচ্চ কমায় সীমা নির্ধারিত হয়েছিল ১ শতাংশ। যদিও আজ বুধবার (১ মার্চ ২০২৩) এসব কোম্পানিতে ফের ফ্লোর প্রাইস পুনর্বহাল করেছে বিএসইসি।