০১:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪
শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রিতেই মনোযোগ বেশি

১০ ইস্যুতে পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের করুন দশা!

বিশেষ প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ০৫:০৭:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ ২০২৩
  • / ৪৩৭৮ বার দেখা হয়েছে

বিদেশী বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করেই একটি দেশের পুঁজিবাজার বিনিয়োগের জন্য কতটা উপযুক্ত বা শক্তিশালি অবস্থানে রয়েছে সেটি নির্ধারণ করা হয়। অর্থ্যাৎ বিদেশী বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করেই স্থানীয় বা আঞ্চলিক পুঁজিবাজার বৈশ্বিক হয়ে ওঠে। যদিও দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ গত আট বছর ধরে ক্রমেই কমছে। অবশ্য মাঝখানে এক বছর সামান্য বেড়েছিল। এর মধ্যে আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ঋণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ তারা শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রি করছেন বেশি।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

মোট কথা, ধারাবাহিকভাবে নিম্নগামী অবস্থানে রয়েছে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ। দেখা যাচ্ছে, বিদেশীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ থেকে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়ার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষনে দেখা যায়, ২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৯৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এর পরের দুই বছর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৭ কোটি ৯০ লাখ ও ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। ২০১৭ সালে এটি বেড়ে ৪৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়।

এছাড়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এর পরের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এটি কমে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ আরো কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারে। ২০২০-২১ অর্থবছরে নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ঋণাত্মক ২৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরেও সেই ঋণাত্মক ধারা অব্যাহত থাকে; বছর শেষে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ২০ কোটি ডলারের মতো ঋণাত্মক হয়।

সর্বশেষ চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) পুঁজিবাজারে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার ঋণাত্মক হয়েছে।

আরও পড়ুন: তিন দিনের ছুটির ফাঁদে পুঁজিবাজার

মুলত, ঘন ঘন আইন-কানুনের পরিবর্তন, দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, তারল্য ঝুঁকি, মুদ্রা বিনিময় হার ঝুঁকি, মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ১০ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত, কোভিড-১৯-এর কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, ফ্লোর প্রাইস আরোপ, ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্ধারণ এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নই পুঁজিবাজারে ক্রমেই বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এমএসসিআই ফ্রন্টিয়ার মার্কেট সূচকের রিটার্ন প্রায় এক যুগ ধরেই শ্লথ অবস্থানে রয়েছে। ফলে ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে বিদেশীরা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন। এর বিপরীতে ২০০৮ সালের সাব-প্রাইম মর্টগেজ সংকটের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা যাচ্ছে। এ কারণে বেশি রিটার্নের আশায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন।

তারা আরও জানান, দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, তারল্য ঝুঁকি, মুদ্রা বিনিময় হার ঝুঁকির বিষয়গুলোও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ১০ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কারণেও এ খাতের বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এ নিয়ে  তাদেরকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আদালতের দ্বারস্থ হতেও দেখা গেছে। কোভিড-১৯-এর কারণে ২০২০ সালের মার্চে শেয়ার নির্দিষ্ট দরের নিচে যাতে কমতে না পারে সেজন্য ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দিয়েছিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তখন অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারী ক্রেতা না থাকার কারণে শেয়ার বিক্রি করতে চেয়েও করতে পারেননি। ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্ধারণ করে দেয়ার বিষয়টিকেও মুদ্রাবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিদেশীরা। বৈশ্বিকভাবেই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয় বিদেশীদের কাছে। সর্বোপরি সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের বিষয়টিও বিদেশীদের এ দেশ থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের অন্যতম একটি কারণ।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, আমাদের এখানে সুযোগ কমে গেছে বলেই বিদেশীরা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। ঘন ঘন আইন-কানুন পরিবর্তন করাটা বিদেশীদের অপছন্দ। প্রথমে কভিডের কারণে ফ্লোর প্রাইস দেয়া হলো এবং কিছুদিন পর বাজার বন্ধ করে দেয়া হলো। এখন আবার সার্কিট ব্রেকারের নিম্নসীমা ২ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়ে তা আবার তুলে নেয়া হয়েছে। এ ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে বাজারে শেয়ারের ক্রেতা কমে যায়। তখন চাইলেও শেয়ার বিক্রি করা যায় না।

তিনি বলেন, বিশ্বের কোথাও পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ ধরনের হস্তক্ষেপের উদাহরণ রয়েছে বলে আমার জানা নেই। এ কারণে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে প্রয়োজনের সময় সেটি ফেরত নিতে পারবেন কিনা সেটি নিয়ে শঙ্কা কাজ করে বিদেশীদের মধ্যে। এ কারণে দেখা যাচ্ছে, বেশকিছু ভালো কোম্পানির আয় বাড়ার পাশাপাশি শেয়ারদর যৌক্তিক পর্যায়ে থাকলেও বিদেশীরা কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন না। পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক দরপতনের পেছনে বিদেশীদের শেয়ার বিক্রিও অন্যতম একটি কারণ। দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে বৈশ্বিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হবে।

জানা গেছে, দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছে বিএসইসি। এজন্য গত এক বছরে সংযুক্ত আরব-আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে রোড শো আয়োজন করেছে সংস্থাটি। সামনে বিনিয়োগ আকর্ষণে কাতারে রোড শো অনুষ্ঠিত হয়েছে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজেই নিটা অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক হিসাব ও বিও হিসাব খুলতে পারেন, সেজন্যও উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির কর্মকর্তারা জানান, বিদেশীরা শেয়ার কেনা-বেচার মধ্যেই থাকেন। গত তিন বছরে পুঁজিবাজারের সূচক ৩ হাজার ৬০০ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিদেশীরা শেয়ার বিক্রি করে মূলধনি মুনাফা তুলে নিয়েছেন। তবে বর্তমানে পুঁজিবাজারে দর সংশোধন হওয়ার কারণে বিদেশীদের মধ্যে শেয়ার কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

তবে পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ না আসলেও দেশে সার্বিক বিদেশি বিনিয়োগ ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। দুই বছরের করোনা মহামারির পর এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো হোঁচট খেলেও বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ৪৭০ কোটি ৮০ লাখ (৪.৭১ বিলিয়ন) ডলারের এফডিআই এসেছিল দেশে, যা ছিল আগের বছরের (২০২০-২১) চেয়ে ৩৯ শতাংশ বেশি। নিট এফডিআই বেড়েছিল আরও বেশি, ৬১ শতাংশ। গত অর্থবছরে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ২১৮ কোটি ডলার।

এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। নিট বিনিয়োগের অঙ্ক ছিল ১২৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল দেশে। এর মধ্যে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ২৬৩ কোটি ডলার।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-‌অক্টোবর) দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। চার মাসে ১৫৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে জুলাই-‌অক্টোবর ১১২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছিল।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে ঘিরে দেশে বিনিয়োগের যে আবহ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়ছে বিদেশি বিনিয়োগে। সংকটের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াকে দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গল বলছেন তারা। বিশ্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এফডিআই আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা। তবে পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা বাজারের মন্দাবস্থাই বিদেশি না আসার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।

বিজনেস জার্নাল/ঢাকা/এইচকে

শেয়ার করুন

x

শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রিতেই মনোযোগ বেশি

১০ ইস্যুতে পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের করুন দশা!

আপডেট: ০৫:০৭:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ ২০২৩

বিদেশী বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করেই একটি দেশের পুঁজিবাজার বিনিয়োগের জন্য কতটা উপযুক্ত বা শক্তিশালি অবস্থানে রয়েছে সেটি নির্ধারণ করা হয়। অর্থ্যাৎ বিদেশী বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করেই স্থানীয় বা আঞ্চলিক পুঁজিবাজার বৈশ্বিক হয়ে ওঠে। যদিও দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ গত আট বছর ধরে ক্রমেই কমছে। অবশ্য মাঝখানে এক বছর সামান্য বেড়েছিল। এর মধ্যে আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ঋণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ তারা শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রি করছেন বেশি।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

মোট কথা, ধারাবাহিকভাবে নিম্নগামী অবস্থানে রয়েছে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ। দেখা যাচ্ছে, বিদেশীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ থেকে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়ার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষনে দেখা যায়, ২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৯৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এর পরের দুই বছর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৭ কোটি ৯০ লাখ ও ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। ২০১৭ সালে এটি বেড়ে ৪৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়।

এছাড়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এর পরের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এটি কমে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ আরো কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারে। ২০২০-২১ অর্থবছরে নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ঋণাত্মক ২৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরেও সেই ঋণাত্মক ধারা অব্যাহত থাকে; বছর শেষে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ২০ কোটি ডলারের মতো ঋণাত্মক হয়।

সর্বশেষ চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) পুঁজিবাজারে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার ঋণাত্মক হয়েছে।

আরও পড়ুন: তিন দিনের ছুটির ফাঁদে পুঁজিবাজার

মুলত, ঘন ঘন আইন-কানুনের পরিবর্তন, দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, তারল্য ঝুঁকি, মুদ্রা বিনিময় হার ঝুঁকি, মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ১০ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত, কোভিড-১৯-এর কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, ফ্লোর প্রাইস আরোপ, ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্ধারণ এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নই পুঁজিবাজারে ক্রমেই বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এমএসসিআই ফ্রন্টিয়ার মার্কেট সূচকের রিটার্ন প্রায় এক যুগ ধরেই শ্লথ অবস্থানে রয়েছে। ফলে ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে বিদেশীরা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন। এর বিপরীতে ২০০৮ সালের সাব-প্রাইম মর্টগেজ সংকটের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা যাচ্ছে। এ কারণে বেশি রিটার্নের আশায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন।

তারা আরও জানান, দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, তারল্য ঝুঁকি, মুদ্রা বিনিময় হার ঝুঁকির বিষয়গুলোও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ১০ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কারণেও এ খাতের বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এ নিয়ে  তাদেরকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আদালতের দ্বারস্থ হতেও দেখা গেছে। কোভিড-১৯-এর কারণে ২০২০ সালের মার্চে শেয়ার নির্দিষ্ট দরের নিচে যাতে কমতে না পারে সেজন্য ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দিয়েছিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তখন অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারী ক্রেতা না থাকার কারণে শেয়ার বিক্রি করতে চেয়েও করতে পারেননি। ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্ধারণ করে দেয়ার বিষয়টিকেও মুদ্রাবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিদেশীরা। বৈশ্বিকভাবেই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয় বিদেশীদের কাছে। সর্বোপরি সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের বিষয়টিও বিদেশীদের এ দেশ থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের অন্যতম একটি কারণ।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, আমাদের এখানে সুযোগ কমে গেছে বলেই বিদেশীরা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। ঘন ঘন আইন-কানুন পরিবর্তন করাটা বিদেশীদের অপছন্দ। প্রথমে কভিডের কারণে ফ্লোর প্রাইস দেয়া হলো এবং কিছুদিন পর বাজার বন্ধ করে দেয়া হলো। এখন আবার সার্কিট ব্রেকারের নিম্নসীমা ২ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়ে তা আবার তুলে নেয়া হয়েছে। এ ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে বাজারে শেয়ারের ক্রেতা কমে যায়। তখন চাইলেও শেয়ার বিক্রি করা যায় না।

তিনি বলেন, বিশ্বের কোথাও পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ ধরনের হস্তক্ষেপের উদাহরণ রয়েছে বলে আমার জানা নেই। এ কারণে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে প্রয়োজনের সময় সেটি ফেরত নিতে পারবেন কিনা সেটি নিয়ে শঙ্কা কাজ করে বিদেশীদের মধ্যে। এ কারণে দেখা যাচ্ছে, বেশকিছু ভালো কোম্পানির আয় বাড়ার পাশাপাশি শেয়ারদর যৌক্তিক পর্যায়ে থাকলেও বিদেশীরা কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন না। পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক দরপতনের পেছনে বিদেশীদের শেয়ার বিক্রিও অন্যতম একটি কারণ। দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে বৈশ্বিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হবে।

জানা গেছে, দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছে বিএসইসি। এজন্য গত এক বছরে সংযুক্ত আরব-আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে রোড শো আয়োজন করেছে সংস্থাটি। সামনে বিনিয়োগ আকর্ষণে কাতারে রোড শো অনুষ্ঠিত হয়েছে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজেই নিটা অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক হিসাব ও বিও হিসাব খুলতে পারেন, সেজন্যও উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির কর্মকর্তারা জানান, বিদেশীরা শেয়ার কেনা-বেচার মধ্যেই থাকেন। গত তিন বছরে পুঁজিবাজারের সূচক ৩ হাজার ৬০০ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিদেশীরা শেয়ার বিক্রি করে মূলধনি মুনাফা তুলে নিয়েছেন। তবে বর্তমানে পুঁজিবাজারে দর সংশোধন হওয়ার কারণে বিদেশীদের মধ্যে শেয়ার কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

তবে পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ না আসলেও দেশে সার্বিক বিদেশি বিনিয়োগ ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। দুই বছরের করোনা মহামারির পর এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো হোঁচট খেলেও বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ৪৭০ কোটি ৮০ লাখ (৪.৭১ বিলিয়ন) ডলারের এফডিআই এসেছিল দেশে, যা ছিল আগের বছরের (২০২০-২১) চেয়ে ৩৯ শতাংশ বেশি। নিট এফডিআই বেড়েছিল আরও বেশি, ৬১ শতাংশ। গত অর্থবছরে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ২১৮ কোটি ডলার।

এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। নিট বিনিয়োগের অঙ্ক ছিল ১২৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল দেশে। এর মধ্যে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ২৬৩ কোটি ডলার।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-‌অক্টোবর) দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। চার মাসে ১৫৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে জুলাই-‌অক্টোবর ১১২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছিল।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে ঘিরে দেশে বিনিয়োগের যে আবহ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়ছে বিদেশি বিনিয়োগে। সংকটের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াকে দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গল বলছেন তারা। বিশ্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এফডিআই আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা। তবে পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা বাজারের মন্দাবস্থাই বিদেশি না আসার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।

বিজনেস জার্নাল/ঢাকা/এইচকে