১১:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ গ্রহণের সীমা নির্ধারণ করেছে আইএমএফ

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ১১:৫৭:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ১০৩৫৮ বার দেখা হয়েছে

ফাইল ফটো

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জন্য বিদেশি ঋণ গ্রহণের ওপর সীমা বেঁধে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। শর্ত অনুযায়ী চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৮৪৪ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি ঋণ নিতে পারবে না।

গত জুনে আইএমএফ তাদের ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি মিলিয়ে ১৩৪ কোটি ডলার ছাড়ের পর বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে পরবর্তী কিস্তি পেতে দেওয়া বেশ কিছু শর্তের মধ্যে অন্যতম হলো ঋণ সীমা নির্ধারণ।

শর্ত অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে প্রতি প্রান্তিকেই ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। প্রথম ত্রৈমাসিকে ১৯১ কোটি, ছয় মাসে ৩৩৪ কোটি, ৯ মাসে ৪৩৪ কোটি এবং পুরো অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৮৪৪ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ নেওয়া যাবে। প্রতি তিন মাস অন্তর আইএমএফ এই ঋণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য বলছে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ৮৫৭ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ নিয়েছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে ঋণ নেওয়া হয়েছে মাত্র ২০ কোটি ২৪ লাখ ডলার। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার কিছুটা কম ঋণ নিতে হবে।

আইএমএফ ২০২৩ সালে যখন ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করে, তখন এমন কোনো শর্ত ছিল না। তবে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে মূল ঋণের পরিমাণ ৮০ কোটি ডলার বাড়ানো হয় এবং মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হয়। এরপরই নতুন শর্ত আরোপ করা হলো। এ পর্যন্ত এই কর্মসূচি থেকে মোট ৩৬০ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আইএমএফের সর্বশেষ ঋণ স্থায়িত্ব বিশ্লেষণের (ডিএসএ) ভিত্তিতেই বিদেশি ঋণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিএসএ-তে বাংলাদেশকে ধারাবাহিকভাবে ‘কম ঝুঁকি’র দেশ থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’র দেশ হিসেবে পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানি ও রাজস্ব আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে।

ডিএসএ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ঋণ-রপ্তানির অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৬২ দশমিক ৭ শতাংশে, যা প্রাক্কলিত ১১৬-১১৮ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। বিদেশি ঋণ-রাজস্বের অনুপাতও বেড়েছে।

সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) ও অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। যেহেতু ঋণ বৈদেশিক মুদ্রায় শোধ করতে হয়, তাই বাস্তবতা বিবেচনা করে আইএমএফ এই সীমা বেঁধে দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পাচার বন্ধ ও রেমিট্যান্সের কারণে বর্তমানে রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে বটে, তবে তা কতটা টেকসই হবে, তা অনিশ্চিত। এক সময় পাচারের পরিবেশ আবার তৈরি হতে পারে। ফলে ঋণ গ্রহণে সীমা থাকা উচিত।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মেগা প্রকল্প ও করোনা মোকাবিলার ব্যয় সামলাতে বিদেশি ঋণ ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে বাংলাদেশের ঋণ তিনগুণ বেড়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ঋণ বৃদ্ধির রেকর্ড।

সরকারি তথ্য বলছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে যেখানে বৈদেশিক ঋণ ছিল ২০৩ কোটি ডলার, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ৮০২ কোটি ডলারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ঋণ পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে, কারণ আগের বছরের তুলনায় নতুন সরকারের সময়ে ঋণ গ্রহণ কম হয়েছে।

ঢাকা/এসএইচ

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ গ্রহণের সীমা নির্ধারণ করেছে আইএমএফ

আপডেট: ১১:৫৭:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জন্য বিদেশি ঋণ গ্রহণের ওপর সীমা বেঁধে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। শর্ত অনুযায়ী চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৮৪৪ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি ঋণ নিতে পারবে না।

গত জুনে আইএমএফ তাদের ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি মিলিয়ে ১৩৪ কোটি ডলার ছাড়ের পর বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে পরবর্তী কিস্তি পেতে দেওয়া বেশ কিছু শর্তের মধ্যে অন্যতম হলো ঋণ সীমা নির্ধারণ।

শর্ত অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে প্রতি প্রান্তিকেই ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। প্রথম ত্রৈমাসিকে ১৯১ কোটি, ছয় মাসে ৩৩৪ কোটি, ৯ মাসে ৪৩৪ কোটি এবং পুরো অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৮৪৪ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ নেওয়া যাবে। প্রতি তিন মাস অন্তর আইএমএফ এই ঋণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য বলছে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ৮৫৭ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ নিয়েছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে ঋণ নেওয়া হয়েছে মাত্র ২০ কোটি ২৪ লাখ ডলার। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার কিছুটা কম ঋণ নিতে হবে।

আইএমএফ ২০২৩ সালে যখন ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করে, তখন এমন কোনো শর্ত ছিল না। তবে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে মূল ঋণের পরিমাণ ৮০ কোটি ডলার বাড়ানো হয় এবং মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হয়। এরপরই নতুন শর্ত আরোপ করা হলো। এ পর্যন্ত এই কর্মসূচি থেকে মোট ৩৬০ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আইএমএফের সর্বশেষ ঋণ স্থায়িত্ব বিশ্লেষণের (ডিএসএ) ভিত্তিতেই বিদেশি ঋণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিএসএ-তে বাংলাদেশকে ধারাবাহিকভাবে ‘কম ঝুঁকি’র দেশ থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’র দেশ হিসেবে পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানি ও রাজস্ব আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে।

ডিএসএ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ঋণ-রপ্তানির অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৬২ দশমিক ৭ শতাংশে, যা প্রাক্কলিত ১১৬-১১৮ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। বিদেশি ঋণ-রাজস্বের অনুপাতও বেড়েছে।

সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) ও অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। যেহেতু ঋণ বৈদেশিক মুদ্রায় শোধ করতে হয়, তাই বাস্তবতা বিবেচনা করে আইএমএফ এই সীমা বেঁধে দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পাচার বন্ধ ও রেমিট্যান্সের কারণে বর্তমানে রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে বটে, তবে তা কতটা টেকসই হবে, তা অনিশ্চিত। এক সময় পাচারের পরিবেশ আবার তৈরি হতে পারে। ফলে ঋণ গ্রহণে সীমা থাকা উচিত।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মেগা প্রকল্প ও করোনা মোকাবিলার ব্যয় সামলাতে বিদেশি ঋণ ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে বাংলাদেশের ঋণ তিনগুণ বেড়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ঋণ বৃদ্ধির রেকর্ড।

সরকারি তথ্য বলছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে যেখানে বৈদেশিক ঋণ ছিল ২০৩ কোটি ডলার, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ৮০২ কোটি ডলারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ঋণ পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে, কারণ আগের বছরের তুলনায় নতুন সরকারের সময়ে ঋণ গ্রহণ কম হয়েছে।

ঢাকা/এসএইচ