০২:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬

রাইট ইস্যুতে ইউসিবির একাধিক অনিয়ম: ব্যাখ্যা চেয়েছে বিএসইসি

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ১১:৫১:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
  • / ১০৫১০ বার দেখা হয়েছে

পুঁজিবাজারে ব্যাংক খাতে তালিকাভুক্ত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসির রাইট ইস্যু আবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) একাধিক আর্থিক অনিয়ম, মূলধন ঘাটতি ও বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে। ফলে ব্যাংকটিকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও সমর্থনকারী নথিপত্রসহ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কমিশনের কর্পোরেট ফাইন্যান্স ডিভিশনের আইপিও, আরপিও ও রাইট শেয়ার ইস্যু শাখা সম্প্রতি ইউসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠিয়েছে।

বিএসইসি সূত্রে জানা যায়, ইউসিবির ১৮ আগস্টের রাইট শেয়ার ইস্যু আবেদন পর্যালোচনায় নিরীক্ষকরা ‘কোয়ালিফাইড অপিনিয়ন’ দিয়েছেন। তাতে দেখা গেছে, ব্যাংকটির ৫,২৭৭ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি এবং ১৯২ কোটি টাকার অতিরিক্ত সুদ আয় হিসাবভুক্ত করা হয়েছে।

এসব অসঙ্গতি সংশোধন করলে ঘোষিত ৩৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার মুনাফা প্রকৃতপক্ষে ৫,৪৩০ কোটিরও বেশি ক্ষতিতে পরিণত হয়। এতে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৮,২০৬ কোটিরও বেশি, আর ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও (CAR) কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৭.৪৪ শতাংশে, যা ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ১২.৫০ শতাংশের অনেক নিচে।

বিধি অনুযায়ী, রাইট শেয়ার ইস্যুর জন্য কোম্পানির পূর্ববর্তী বছরে সন্তোষজনক মুনাফা থাকা আবশ্যক। কিন্তু ইউসিবির বর্তমান আর্থিক অবস্থায় ক্ষতি থাকায় কোম্পানিটি সেই শর্ত পূরণ করছে না। ফলে রাইটস ইস্যু করলে তা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (রাইট ইস্যু) বিধিমালা, ২০০৬–এর বিধি ৩(এইচ) এর লঙ্ঘন হবে বলে বিএসইসি জানিয়েছে।

আরও একটি বড় অনিয়ম ধরা পড়ে স্পন্সর ও পরিচালকদের শেয়ার ধারণে। বর্তমানে তারা ব্যাংকের মোট শেয়ারের মাত্র ১০.২৭ শতাংশ ধারণ করছেন, যেখানে বিএসইসি ২০১১ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী ন্যূনতম ৩০ শতাংশ ধারণ বাধ্যতামূলক।

নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা আছে, যদি স্পনসর ও পরিচালকরা এ শর্ত পূরণে ব্যর্থ হন, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রাইট শেয়ার ইস্যু বা রিপিট পাবলিক অফার (RPO) করতে পারবে না। ফলে ইউসিবির রাইটস ঘোষণা কমিশনের কাছে নিয়মভঙ্গের স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে ধরা পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিএসইসি বিধি ১০(২) অনুযায়ী ইউসিবিকে ১৫ দিনের মধ্যে সব অসঙ্গতির ব্যাখ্যা, ঘাটতি পূরণের তথ্য ও সমর্থনকারী নথিপত্র দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-কে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাংকটির রাইট শেয়ার ইস্যু আবেদন নিয়ে মতামত দিতে বলা হয়েছে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএসইসির এ ধরনের পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ইতিবাচক ও সাহসী উদ্যোগ। তাদের মতে, কোনো ব্যাংক যদি বিশাল প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন সংকট ও নিরীক্ষাগত পর্যবেক্ষণ থাকা সত্ত্বেও রাইট শেয়ার ইস্যুর চেষ্টা করে, তা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি ও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

তাদের মতে, একটি ব্যাংক যখন নিজের মূলধন ঘাটতি পূরণ না করেই নতুন মূলধন তুলতে চায়, তখন সেটি বিনিয়োগকারীদের ঠকানোর ঝুঁকি তৈরি করে। বিএসইসির এ ধরনের কঠোর নজরদারি বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।

অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের অনেকে বলছেন, ইউসিবির রাইটস ইস্যু নিয়ে এমন পর্যবেক্ষণ প্রকাশ পাওয়ায় তারা এখন আরও সতর্ক। রাইট শেয়ার সাধারণত বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো সুযোগ হয়, কিন্তু যদি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়, তখন সেটা ফাঁদে পরিণত হতে পারে।

ঢাকা/এসএইচ

শেয়ার করুন

রাইট ইস্যুতে ইউসিবির একাধিক অনিয়ম: ব্যাখ্যা চেয়েছে বিএসইসি

আপডেট: ১১:৫১:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫

পুঁজিবাজারে ব্যাংক খাতে তালিকাভুক্ত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসির রাইট ইস্যু আবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) একাধিক আর্থিক অনিয়ম, মূলধন ঘাটতি ও বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে। ফলে ব্যাংকটিকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও সমর্থনকারী নথিপত্রসহ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কমিশনের কর্পোরেট ফাইন্যান্স ডিভিশনের আইপিও, আরপিও ও রাইট শেয়ার ইস্যু শাখা সম্প্রতি ইউসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠিয়েছে।

বিএসইসি সূত্রে জানা যায়, ইউসিবির ১৮ আগস্টের রাইট শেয়ার ইস্যু আবেদন পর্যালোচনায় নিরীক্ষকরা ‘কোয়ালিফাইড অপিনিয়ন’ দিয়েছেন। তাতে দেখা গেছে, ব্যাংকটির ৫,২৭৭ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি এবং ১৯২ কোটি টাকার অতিরিক্ত সুদ আয় হিসাবভুক্ত করা হয়েছে।

এসব অসঙ্গতি সংশোধন করলে ঘোষিত ৩৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার মুনাফা প্রকৃতপক্ষে ৫,৪৩০ কোটিরও বেশি ক্ষতিতে পরিণত হয়। এতে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৮,২০৬ কোটিরও বেশি, আর ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও (CAR) কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৭.৪৪ শতাংশে, যা ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ১২.৫০ শতাংশের অনেক নিচে।

বিধি অনুযায়ী, রাইট শেয়ার ইস্যুর জন্য কোম্পানির পূর্ববর্তী বছরে সন্তোষজনক মুনাফা থাকা আবশ্যক। কিন্তু ইউসিবির বর্তমান আর্থিক অবস্থায় ক্ষতি থাকায় কোম্পানিটি সেই শর্ত পূরণ করছে না। ফলে রাইটস ইস্যু করলে তা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (রাইট ইস্যু) বিধিমালা, ২০০৬–এর বিধি ৩(এইচ) এর লঙ্ঘন হবে বলে বিএসইসি জানিয়েছে।

আরও একটি বড় অনিয়ম ধরা পড়ে স্পন্সর ও পরিচালকদের শেয়ার ধারণে। বর্তমানে তারা ব্যাংকের মোট শেয়ারের মাত্র ১০.২৭ শতাংশ ধারণ করছেন, যেখানে বিএসইসি ২০১১ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী ন্যূনতম ৩০ শতাংশ ধারণ বাধ্যতামূলক।

নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা আছে, যদি স্পনসর ও পরিচালকরা এ শর্ত পূরণে ব্যর্থ হন, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রাইট শেয়ার ইস্যু বা রিপিট পাবলিক অফার (RPO) করতে পারবে না। ফলে ইউসিবির রাইটস ঘোষণা কমিশনের কাছে নিয়মভঙ্গের স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে ধরা পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিএসইসি বিধি ১০(২) অনুযায়ী ইউসিবিকে ১৫ দিনের মধ্যে সব অসঙ্গতির ব্যাখ্যা, ঘাটতি পূরণের তথ্য ও সমর্থনকারী নথিপত্র দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-কে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাংকটির রাইট শেয়ার ইস্যু আবেদন নিয়ে মতামত দিতে বলা হয়েছে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএসইসির এ ধরনের পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ইতিবাচক ও সাহসী উদ্যোগ। তাদের মতে, কোনো ব্যাংক যদি বিশাল প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন সংকট ও নিরীক্ষাগত পর্যবেক্ষণ থাকা সত্ত্বেও রাইট শেয়ার ইস্যুর চেষ্টা করে, তা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি ও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

তাদের মতে, একটি ব্যাংক যখন নিজের মূলধন ঘাটতি পূরণ না করেই নতুন মূলধন তুলতে চায়, তখন সেটি বিনিয়োগকারীদের ঠকানোর ঝুঁকি তৈরি করে। বিএসইসির এ ধরনের কঠোর নজরদারি বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।

অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের অনেকে বলছেন, ইউসিবির রাইটস ইস্যু নিয়ে এমন পর্যবেক্ষণ প্রকাশ পাওয়ায় তারা এখন আরও সতর্ক। রাইট শেয়ার সাধারণত বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো সুযোগ হয়, কিন্তু যদি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়, তখন সেটা ফাঁদে পরিণত হতে পারে।

ঢাকা/এসএইচ