শাশা ডেনিমসের পাহাড়সম ঋণ: সুদের যাঁতাকলে তলানীতে মুনাফা! (পর্ব: ১)
- আপডেট: ১২:১২:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১০৩৭৩ বার দেখা হয়েছে
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর বেশ কিছু কোম্পানি তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম করে থাকে, যা পরবর্তীতে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তালিকাভুক্তির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের পরও অনেক কোম্পানি নিজেদের ঋণ পরিশোধের খরচ ও সুদের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে, তাদের মুনাফা হ্রাস পায় এবং শেয়ারবাজারে তাদের শেয়ারের দাম কমে যায়।
শাশা ডেনিমস পিএলসি, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একটি ডেনিম প্রস্তুতকারক কোম্পানি, বর্তমানে এমনই একটি সংকটের মধ্যে পড়েছে। গত বছরের (২০২৪ সাল) তুলনায় ২০২৫ সালে শাশা ডেনিমসের মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) গুরুতরভাবে কমে গেছে এবং এর প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের ঋণের সুদের পরিমাণ। অপারেটিং প্রফিটের ৭৮ শতাংশ শুধুমাত্র সুদের খরচে চলে যাওয়ার ফলে, কোম্পানির মুনাফা বড় অংশ হারিয়ে যাচ্ছে, যা শেয়ারবাজার এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
আরও পড়ুন: ইউসিবি’র প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সুদ আয় অনিশ্চিত!
এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষন শুরু করে ‘বিজনেস জার্নাল’-এর অনুসন্ধানী দল। কোম্পানিটির ২০২৫ সমাপ্ত বছরের আর্থিক প্রতিবেদনের চুল-চেড়া বিশ্লেষনে বেরিয়ে আসে কিছু অসঙ্গতিসহ বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। এরই ধারাবাহিকতায় শাশা ডেনিমস নিয়ে বিজনেস জার্নালের করা আট পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।
২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, কোম্পানির মুনাফা ও অপারেটিং প্রফিট বিপুল পরিমাণ সুদ পরিশোধের কারণে তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালে কোম্পানির মোট রাজস্ব কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু এর বিপরীতে সুদের খরচ এবং ঋণের বোঝা এতোটা বৃদ্ধি পেয়েছে যে, তা কোম্পানির লাভজনকতা এবং শেয়ারবাজারে মূল্যায়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।

আরও পড়ুন: যমুনা ব্যাংকের মূলধনের ৮২ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড: নগদ বঞ্চিত বিনিয়োগকারীরা
এদিকে, ২০২৫ সালে শাশা ডেনিমসের অপারেটিং প্রফিট ছিল ৯৬ কোটি ২ লাখ ৬২ হাজার ৬০৬ টাকা, যা মোটামুটি সন্তোষজনক। কিন্তু, একই বছরে তাদের সুদের খরচ দাঁড়িয়েছে ৭৪ কোটি ৯৬ লাখ ৫ হাজার ৬৯৫ টাকা, যা অপারেটিং প্রফিটের প্রায় ৭৮ শতাংশ। অথচ ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিলো ৬২ কোটি ৬০ লাখ ৭০ হাজার ৮ টাকা। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে শাশা ডেনিমসের সুদ বাবদ ব্যয় বেড়েছে ১২ কোটি ৩৫ লাখ ৩৫ হাজার ৬৮৭ টাকা বা প্রায়ি ২০ শতাংশ।
আরও পড়ুন: ইউসিবি: মুনাফার আড়ালে ঘাটতি প্রায় চার হাজার কোটি টাকা!
এই বিশাল সুদের খরচ, যা মূলত ব্যাংক ঋণের কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে, কোম্পানির মুনাফাকে খেয়ে ফেলছে। এই সুদের চাপের কারণে শাশা ডেনিমসের লাভের একটি বড় অংশ হারিয়ে যাচ্ছে এবং তারা ঋণ পরিশোধের জন্য কাজ করছে, যা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষনে দেখা যায়, ২০২৪ সালে শাশা ডেনিমসের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিলো ৫৩ কোটি ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮০১ টাকা, ২০২৫ সালে যার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ কোটি ৯ লাখ ৭৩ হাজার ২৭৯ টাকায়। অর্থ্যাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বেড়েছে ২৫ কোটি ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৪৭৮ টাকা। এছাড়া ২০২৫ সাল শেষে শাশা ডেনিমসের ৩১৪ কোটি ৭৮ লাখ ৩০ হাজার ২১৮ টাকার স্বল্পমেয়াদি ঋণ রয়েছে।

শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এভাবে চলতে থাকলে শাশা ডেনিমস ভবিষ্যতে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো ডিভিডেন্ড প্রদান করতে পারবে না। সুদের পরিমাণ এতো বেশি হয়ে গেলে, কোম্পানি নিজের ব্যবসার উপর কোনো স্থায়ী ভিত্তি গড়তে পারবে না। এছাড়া ২০২৫ সালে শাশা ডেনিমসের নেট প্রফিট আফটার ট্যাক্স ২১ কোটি ৬৮ লাখ ২৩ হাজার ২৩০ টাকায় নেমে এসেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ২৪ কোটি ৭৯ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৫ টাকা। এর মানে হলো, কোম্পানির মুনাফা প্রায় ১২.৬০ শতাংশ কমেছে। কিন্তু এটি শুধুমাত্র সুদের খরচের কারণে নয়, বরং ২০২৫ সালে ব্যাংক ঋণের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে কোম্পানির আর্থিক চাপ অনেক বেড়ে গেছে।
আরও পড়ুন: এবি ব্যাংক: সুদ আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ২০৮ শতাংশ!
তাদের মতে, শাশা ডেনিমস যদি তাদের ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সুদের পরিমাণ কমানোর জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে ভবিষ্যতে তাদের ব্যবসায়িক লাভ এবং শেয়ারবাজারে পারফরমেন্স আরও কমে যাবে।
প্রসঙ্গত, শাশা ডেনিমস ২০১৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এবং তাতে তারা নতুন মূলধন উত্তোলন করে। কিন্তু তালিকাভুক্তির পরেও, কোম্পানির ঋণের বোঝা কমেনি বরং তা বেড়েছে।
আরও পড়ুন: লাভেলো আইসক্রিমের হিসাবের ফাঁদে শেয়ারবাজার!
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে শাশা ডেনিমসের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর সুদের খরচ অপারেটিং প্রফিটের প্রায় ৭৮ শতাংশ কেড়ে নিয়েছে। এটা একটি বড় সমস্যা, কারণ একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য সুদের চাপ এত বেশি হওয়া ব্যবসায়ের দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক একজন নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য ঋণের সুদের পরিমাণ এতো বেশি হওয়া একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। শাশা ডেনিমস যদি সুদের খরচ কমানোর জন্য কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে তা তাদের শেয়ারবাজারে মূল্যায়নকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে। তার মতে, শাশা ডেনিমসের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের ঋণ পুনঃতফসিল এবং সুদের খরচ কমানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। শাশা ডেনিমস যদি তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারে এবং সুদের হার কমাতে সক্ষম হয়, তবে এটি তাদের আর্থিক চাপ কমাবে এবং কোম্পানির ভবিষ্যৎ টেকসই বৃদ্ধির জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আরও পড়ুন: আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের ৬১ কোটি টাকার পাওনা আদায়ে অনিশ্চয়তা!
এদিকে, বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, সুদের পরিমাণ বাড়ানোর ফলে কোম্পানির মুনাফা আরও সংকুচিত হয়ে যাবে এবং এর পরিণতি শেয়ারবাজারে নেতিবাচকভাবে পড়বে। তারা বলছেন, আমরা যখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করি, তখন আশা করি কোম্পানি লাভবান হবে এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের লাভও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু শাশা ডেনিমসের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের জন্য উদ্বেগজনক।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শাশা ডেনিমস কর্তৃপক্ষ লিখিত বক্তব্যে জানায়, ‘শাশা ডেনিমসের সমন্বিত শেয়ারহোল্ডার ইক্যুইটির পরিমান ৫৯০০ মিলিয়ন, যার বিপরীতে মোট সমন্বিত ঋণের পরিমান ৪,৫৮৮ মিলিয়ন। গৃহীত ঋণের মধ্যে ৭৮১ মিলিয়ন টাকা শাশা ডেনিমস ও তার সাবসিডিয়ারী কোম্পানির এক্সপানসন ও মুলধনী যন্ত্রপাতী ক্রয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, বাকি টাকা কোম্পানির চলতি মুলধণের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ঋন গ্রহণের সময় সুদের হার ছিল ৯%, কিন্তু পরবর্তীতে সুদের হার ১৪%-১৫% পুন:নির্ধারিত হওয়ায় ঋনের সুদের খরচ অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। কোম্পানির মোট আর্থিক খরচের মধ্যে বিল ডিসকাউন্ট বাবদ ব্যয় ৩৭৭ মিলিয়ন, যা গত বছর ছিল ৩৩৬ মিলিয়ন।’
আরও পড়ুন: ইউসিবি: খেলাপি আর প্রভিশনিংয়ের পাহাড়ে ইউসিবির মুনাফা ‘শূন্যের কোঠায়’
শাশা ডেনিমস আরও জানায়, ‘কোম্পানি ইতিমধ্যে বিল ডিসকাউন্ট ব্যয় কমানোর জন্য বিল ডলারে ডিসকাউন্ট করা শুরু করেছে ফলে এই খাতে খরচের হার প্রায় ২০ শতাংশ কমে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। পূর্বে এই ডিসকাউন্ট ব্যয় কমানোর জন্য বার বার চেষ্টা করা সত্বেও সফল না হওয়ায় নতুন ব্যাংক এবং পুরাতন ব্যাংকগুলোর সাথে ডলারে বিল ডিসকাউন্ট করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
‘এছাড়া কোম্পানির আর্থিক খরচের পরিমান অপারেটিং প্রফিট এর ৭৮ শতাংশ হলেও মোট রপ্তানি আয়ের ৬.৬৩ শতাংশ। বর্তমানে কাঁচামাল, ইউটিলিটি বিল ও অন্যান্য উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রতিষ্ঠানের কষ্ট অব গুডস্ অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে ফলে কোম্পানির গ্রস প্রফিট এবং অপারেটিং প্রফিট অস্বাভাবিক ভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাই কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি তথা কোম্পানির আয় বৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠাননের ব্যবস্থাপনা অত্যান্ত সজাগ রয়েছে।’
আরও পড়ুন: বেষ্ট হোল্ডিংসের আর্থিক প্রতিবেদনে অস্পষ্টতা: বিভ্রান্তিতে বিনিয়োগকারীরা!
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা মিজানুর রশীদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন যে শাশা ডেনিমস, যেটি আমাদের দেশের অন্যতম বড় এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানি, তার আর্থিক সংকট এবং সুদের পরিশোধের চাপের কারণে শেয়ারহোল্ডারদের ভবিষ্যত স্বার্থে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। কোম্পানির মুনাফা এবং ইপিএস গুরুতরভাবে কমে গেছে। ৭৮ শতাংশ অপারেটিং প্রফিট শুধু সুদের খরচে চলে যাচ্ছে, যা স্পষ্টভাবে বোঝায় যে কোম্পানির মূল ব্যবসার ওপর থেকে চাপ বাড়ছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো ভালো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই।’
তিনি বলেন, ‘এটি একটি বিপদজনক পরিস্থিতি, এবং আমি মনে করি, শাশা ডেনিমসের পরিচালনা কর্তৃপক্ষের উচিত এই বিষয়ে তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সুদের চাপ কমানোর জন্য একটি স্পষ্ট এবং কার্যকরী পরিকল্পনা তাদের শেয়ারহোল্ডারদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। যদি তারা এটা না করে, তবে তারা শুধু তাদের নিজস্ব আর্থিক ভবিষ্যতই নয়, বরং বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’
আরও পড়ুন: আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের রপ্তানি প্রণোদনা উধাও: ফুলে ফেঁপে উঠছে ‘রিসিভ্যাবলস’
মিজানুর রশীদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগকারীরা আর এমন অনিয়ম সহ্য করতে পারবো না। কোম্পানির ঋণ পুনঃতফসিল এবং সুদের পরিমাণ কমানোর জন্য জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে, শাশা ডেনিমস তার ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে না, এবং বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি আশা করি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) দ্রুত এই বিষয়গুলো নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং আমাদের সকল শেয়ারহোল্ডারের স্বার্থ রক্ষা করবে।’ (চলবে…)
বিজনেসজার্নাল/এইচকে/ঢাকা


































