কর বৈষম্যে চাপে বস্ত্রশিল্প, বাড়ছে আমদানি নির্ভরতার শঙ্কা
- আপডেট: ১২:০৫:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
- / ১০১৭৮ বার দেখা হয়েছে
কর সুবিধার গ্যাঁড়াকলে পড়েছে দেশের বস্ত্রশিল্প খাত। তৈরি পোশাক খাতে আয়কর যেখানে ১২ শতাংশ, সেখানে আগামী অর্থবছর থেকে বস্ত্রশিল্প মালিকদের দিতে হবে সাড়ে ২৭ শতাংশ কর। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করহার অপরিবর্তিত রাখায় এমন দ্বৈত নীতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উদ্যোক্তাদের। তাদের মতে, এতে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বাড়বে আমদানি নির্ভরতা। অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, রফতানি খাতের স্বার্থে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের জন্য সহায়ক কর কাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে তৈরি পোশাক খাত যে পরিমাণ রফতানি করে, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে তার বড় অংশের কাঁচামাল সরবরাহ করে স্থানীয় বস্ত্রকলগুলো। তথ্য অনুযায়ী, সুতা ও কাপড় মিলিয়ে নিট পোশাক খাতের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ এবং ওভেন খাতের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল আসে দেশের বস্ত্রকল থেকে। বাকি কাঁচামাল আমদানি করা হয় চীন, কোরিয়া ও ভারতের মতো দেশ থেকে।
সাধারণ কোম্পানির করপোরেট করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ হলেও রফতানি আয়ের ধারা সচল রাখতে ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে বস্ত্র ও পোশাক শিল্প মালিকরা ১৫ শতাংশ হারে কর সুবিধা পেয়ে আসছিলেন। পরে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সরকার এ হার কমিয়ে ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে। পোশাক খাতের জন্য এই সুবিধা ২০২৮ সাল পর্যন্ত বহাল থাকলেও মেয়াদ শেষ হওয়ায় চলতি জুন থেকে কর সুবিধা হারাচ্ছেন বস্ত্রকল মালিকরা।
বিটিএমএর ভারপ্রাপ্ত সহ-সভাপতি সালেউদ জামান খান বলেন, ফ্যাব্রিক ও স্পিনিং খাতে আগে ১৫ শতাংশ কর ছিল। গত বছর এসআরও সুবিধা বাতিল হয়ে তা বেড়ে ২৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাজেটের সময় সরকারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হলেও তখন অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছিল, তারা নির্বাচিত সরকার না হওয়ায় এ মুহূর্তে কিছু করতে পারছে না। ২০২৬ সাল পর্যন্ত একটি এসআরওর মাধ্যমে ১৫ শতাংশ কর সুবিধা ছিল, কিন্তু আইএমএফসহ বিভিন্ন চাপের কারণে তা আর নবায়ন হয়নি।
এ অবস্থায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী পাঁচ বছরের জন্য করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রেখেছেন। ফলে তৈরি পোশাক খাত কর সুবিধা পেলেও বস্ত্রশিল্পকে অতিরিক্ত করের চাপ বহন করতে হবে।উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এতে কাঁচামাল আমদানি নির্ভরতা বাড়বে এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে থাকা বস্ত্রখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও কমে যাবে। তাই তারা ২০৩০ সাল পর্যন্ত কর সুবিধা বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।
সালেউদ জামান খান আরও বলেন, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল একই শিল্পের দুটি অংশ। গার্মেন্টস খাতে কর ১২ শতাংশ, অথচ টেক্সটাইল খাতে ২৭ শতাংশ। এটি স্পষ্ট বৈষম্য। এর ফলে ভবিষ্যতে পোশাক কারখানাগুলো বিদেশ থেকে কাপড় ও সুতা আমদানিকে বেশি গুরুত্ব দেবে, কারণ এতে তাদের খরচ কম হবে। অথচ দেশের রফতানি সক্ষমতার বড় ভিত্তি এই ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প। তাই শিল্পবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে অন্তত ২০৩০ সাল পর্যন্ত বস্ত্রখাতের করহার ১৫ শতাংশ রাখা প্রয়োজন।
একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের অভাব; এ পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থেই বৈষম্যমূলক করনীতি থেকে সরে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, একই শিল্পের মধ্যে যদি কেউ ২৭ শতাংশ আর কেউ ১২ শতাংশ কর দেয়, তাহলে তা বৈষম্য তৈরি করবে। চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনের আগে যে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প কাঁচামাল সরবরাহ করে, তাদের শক্তিশালী না করলে উৎপাদন ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই এসব শিল্পকে আরও ভালো কর সুবিধা দেয়া প্রয়োজন।
বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৭০০টির বেশি বস্ত্রকল চালু রয়েছে। তবে জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের কারণে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এরই মধ্যে ৫০টিরও বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
ঢাকা/আরএইচ



































