০৫:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ মে ২০২৪

ভয়াল ২৫ মার্চে যেভাবে কাটিয়েছিলেন জাতির পিতা

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ০১:২৯:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ মার্চ ২০২৩
  • / ৪৪৬৭ বার দেখা হয়েছে

মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত হত্যাযজ্ঞের দিন ২৫ মার্চ। নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বর্বরোচিত গণহত্যা চালানোর এক ভয়াল স্মৃতির কালরাত এইদিন। ১৯৭১ সালের এই রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে রচিত হয়েছিল বিশ্বের নৃশংসতম গণহত্যার এক কালো অধ্যায়। একটি জনগোষ্ঠীর স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে ঢাকায় চালানো ওই হত্যাযজ্ঞের নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

‘অপারেশন সার্চলাইটে’র নামে মুক্তিকামী বাঙালির কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন শুরু হয় এই রাতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রাক্কালের এই গণহত্যার দিনটিকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে আসছে জাতি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন ৭ কোটি বাঙালিকে, সেই স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টাকে ২৫ শে মার্চ মধ্য রাতে আটক করার কথাতো আমরা সবাই জানি। কিন্তু আটকের আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কী কী করেন এবং কী কী ঘটেছে তার সঙ্গে তা কজনেই বা জানি?

২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো জানব সে সময় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের উপস্থিত হাজী গোলাম মোর্শেদ, বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপার্চায নাসরীন আহমাদ এবং বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য থেকে—

১৯৭১ সালের গোড়া থেকে কালরাত পর্যন্ত সেই উত্তেজনাকর দিনগুলোতে হাজী গোলাম মোর্শেদ বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর ‘আজ থেকে আমরা স্বাধীন’ ঘোষণাটি স্মরণ করেন।

গোলাম মোর্শেদ ওই দিনের ঘটনা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে বলেন, ‘ভবিষ্যৎ জাতির পিতা পাকিস্তানিদের দমন অভিযান শুরুর আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাকে গ্রেফতার করা হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওই দিন বঙ্গবন্ধু দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বারবার অনুরোধ উপেক্ষা করে, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতেই অবস্থান করেন। তিনি আশা করেছিলেন যে, তাকে গ্রেফতার করতে পারলে পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরস্ত্র সাধারণ বাঙালিদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালাবে না। কিন্তু বাস্তবে তার এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে বলেন, ‘তারা (পাকিস্তানি সৈন্য) আমাকে গ্রেফতার করতে আসছে। কিন্তু আমি এখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

আরও পড়ুনঃ ৭১’র ভয়াল রাত ‘২৫ মার্চ’: ইতিহাসের কালো অধ্যায়

মোর্শেদ বলেন, কয়েক মিনিট পর সেনা কমান্ডোরা আসে, পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এলিট ফোর্স স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ (এসএসজি) সদস্যরা ওই বাড়িতে এসে গুলিবর্ষণ শুরু করে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে। তিনি জানান, রাত ১০টার দিকে বঙ্গবন্ধু একা তার ঘরে বসে চোখ বন্ধ করে ওই ঘোষণাটি প্রদান করেন। সেনা হামলার আশঙ্কায় বেগম মুজিব ও তাদের ছোট সন্তান শেখ রাসেল এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী জানান, চরম যুদ্ধংদেহীভাবে সেনাবাহিনী ওই বাড়িতে হামলা চালানোর কিছু সময় আগে অপরিচিত এক ব্যক্তি ফোনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে চান। মোর্শেদ বলেন, ওই ব্যক্তি ফোনে শুধু এটুকু জানান যে তিনি ‘বলধা গার্ডেন’ থেকে ফোন করেছেন এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার কথা বলা খুবই জরুরি। ‘স্বাধীনতার ঘোষণাটি সম্প্রচারিত হওয়ায়’ এখন করণীয় সম্পর্কে তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা চান। মোর্শেদ বলেন, ‘তখন আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে যাই এবং রিসিভারটি আমার হাতে রেখে ওই ব্যক্তির কথা বঙ্গবন্ধুকে বলি। তিনি ওই লোকটিকে লুকিয়ে যেতে এবং ট্রান্সমিটারটি ধ্বংস করে ফেলতে বলেন। আমি আজও ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ওই দিন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবং আরও অনেকের সাথেই বঙ্গবন্ধু দেখা করেন। এমনকি সরকারি কর্মকর্তারাও আসেন তার নির্দেশনা নিতে, যারা এসময়টাতে এক অশুভ লক্ষণ দেখতে পান। কিন্তু ছাত্রনেতা তাবিবুর রহমান ছিলেন ওই সময়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করা সর্বশেষ ব্যক্তি। অন্য অনেকের মতো তিনিও বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে তাকে আত্মগোপন করার অনুরোধ জানান। মোর্শেদ বলতে থাকেন, তিনি (তাবিবুর) বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘এই মুহূর্তে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যান, তারা (পাকিস্তানি সৈন্য) আপনাকে হত্যা করবে। জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন- ‘যদি তারা আমাকে না পায়, তবে তারা সাধারণ মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালাবে এবং শহরটিকে ধ্বংস করে ফেলবে।’ বঙ্গবন্ধুকে কিছুতেই বাড়ি ছাড়তে রাজি করাতে না পেরে অশ্রুসিক্ত চোখে তাবিবুর ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।

মোর্শেদ জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা এমএ আউয়ালের কথা স্মরণ করেন- যিনি ওই সময়ে প্যারা-পুলিশ আনসার ফোর্সের পরিচালক  (জেনারেল) ছিলেন। ওই দিন তিনিও বঙ্গবন্ধুর দর্শনার্থীদের একজন ছিলেন। নেতারা যখন বাড়ির ভেতর পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা করছিলেন, তিনি তখন বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মোর্শেদ বলেন, একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের কাছে আসন্ন সেনা অভিযান মোকাবিলার জন্য অস্ত্র কোথা থেকে পাওয়া যেতে পারে, তা জানতে চান। তখন আউয়াল পুলিশ অস্ত্রাগারে থাকা অস্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মত দেন। মোর্শেদ জানালেন, ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান প্রস্তাবটি বাতিল করে দেন। কিন্তু পরে বঙ্গবন্ধু সামরিক অভিযান ঠেকাতে পুলিশ সদস্যদের মাঝে অস্ত্র বিতরণ করতে বলে তার পক্ষ থেকে আউয়ালকে মোর্শেদের সাথে ঢাকার তৎকালীন পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট  ই এ চৌধুরীর কাছে পাঠান।

মোর্শেদ বলেন, রাত ১২টার পর, বঙ্গবন্ধু তার কাছে এসে উজ্জ্বল আলোগুলো কোন দিক থেকে আসছে তা জানতে উপরতলায় চলে যান। কয়েক মুহূর্ত পর, কেউ একজন চিৎকার করে বলল, ‘হ্যান্ডস আপ। অপর একজন বলল, ‘মাৎ মারো (হত্যা কর না)’। এ সময় বঙ্গবন্ধু সিঁড়ির পাশে রাখা টেলিফোন সেটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ‘এক সেকেন্ডের মধ্যে কেউ একজন কিছু দিয়ে আমার মাথার পিছে আঘাত করলে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাসাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। আর সেই বাড়ি লাগোয়া পূর্বদিকের ৬৭৮ নম্বর বাড়িটি ছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বন বিভাগের এক বড় র্কমর্কতার। বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক প্রতিবেশী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপার্চায নাসরীন আহমাদদের বাড়ি ছিল এটি। তার মা বেগম বদরুন্নেসা আহমদ করতেন বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি।

নাসরীন আহমাদ বলেন, ‘২৫ র্মাচ ১৯৭১। গোটা দিনটি ছিল থমথমে। সেভাবেই দিন পেরিয়ে রাত নামলো ঢাকায়। সেই সময়টায় সবাই আঁচ করতে পারছিলেন ভয়ংকর কিছু একটা ঘটবে। যারা একটু ভালো বুঝতে পারতেন, তারা জানতেন ওই রাতেই ঘটতে যাচ্ছে ভয়ংকর কিছু ঘটনা। আমরাও বুঝতে পেরেছিলাম।’

নাসরীন বলেন, ‘এখনও স্পষ্ট মনে আছে ২৫ মার্চ সকাল বেলা আমি আর আমার মা কোথায় যেন গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি, বাসার সামনে সিরাজুল আলম খান। আমার মাকে খালাম্মা বা আপা বলেই ডাকতেন বলেই মনে হয়। তিনি আমার মাকে বললেন, ‘আজ রাতে দেখাব!’ ইস্পাহানি বা আদজমীর বাড়ি আক্রমণ করবে এই রকম কিছু একটা বলছিলেন সিরাজুল আলম খান। আমার মা খালি বললেন, ‘কোনো হঠকারিতা কর না যেন! যা করবে অনেক চিন্তা ভাবনা করেই করো। তারপর জনাব খান কোথায় যেন চলে গেলেন।’

তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যা থেকে আমি বাসায় আছি। সেটা রাত বারোটা বা সাড়ে বারোটার দিকে হবে। এমন সময় বঙ্গবন্ধু হঠাৎ করে আমাদের ঘরে ঢুকে হন্তদন্ত হয়ে আমাকে বললেন.., তাজউদ্দীন কোথায়?… এই তাজউদ্দীনকে দেখেছিস? আমি বললাম, না তো! তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন। আবার কী যেন ভেবে ফিরে এলেন। আমাদের ড্রয়িং রুম। দক্ষিণে তার তিনটা জানালা। তিনি সেখানে ঢুকলেন। জানালার পর্দাগুলো তিনি নিজেই সেঁটে দিলেন। বসলেন। আমাকে বললেন, শীলু এক কাপ চা দে… চা আনতে আমি উঠে যাচ্ছি। বাড়িতে আর কেউ নেই। কী ভেবে বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, কোথায় যাচ্ছিস? আমি বললাম, চা বানাতে বললেন যে! আবার কী ভেবে বললেন, থাক, দরকার নেই। এই দিকে আয়। কাছে যেতেই মামা, আমার হাতটা ধরলেন। বললেন, আজ রাতটা খুব খারাপ! আমি কী বুঝে বললাম, মামা আপনি পালিয়ে যান। উনি সুন্দর করে একটা হাসি দিয়ে বললেন, তোর এই মামাটাকে কোথায় লুকাবি? এরপর বললেন, না। তোরা সব ভালো থাক। সাবধানে থাক। আমি দেখি। আমি কী করব।

‘বঙ্গবন্ধু বলে চললেন… ওরা আমাকে না পেলে, বস্তির পর বস্তি জ্বালায়ে পুড়িয়ে দেবে। গ্রাম থেকে গ্রাম খুঁজে বেড়াবে। জ্বালিয়ে দেবে। এই বলে উনি আমাদের বাসা থেকে চলে গেলেন। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর সাথে ওই তার শেষ দেখা। অতটুকুই কথা!’

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসার পর ১৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বিদেশি সাংবাদিকদের এক সাক্ষাৎকার দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমসের বিখ্যাত সাংবাদিক সিডনি এইচ শ্যানবার্গ। বঙ্গবন্ধুর এ সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তার একটি বিশেষ প্রতিবেদন নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি।

শ্যানবার্গের ভাষায়- ‘মুক্তিলাভের কারণে অনেকটা নিরুদ্বেগ দেখালেও অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার রেশ তখনো তার মন থেকে কাটেনি। কিন্তু ভাগ্যের সুপ্রসন্নতায় বিশ্ব মানচিত্রে নতুন এক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে খুবই স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল। ১০ মাস আগে তাকে আটককারী ইয়াহিয়া খানের ঢাকার সরকারি বাসভবনের পালঙ্কে হেলান দিয়ে কয়েকটি মার্কিন পত্রিকার সাংবাদিকের সঙ্গে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলছিলেন বঙ্গবন্ধু।’

কেন সেদিন রাতে তিনি নিজের বাড়িতে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব বলেন, তিনি জানতে পেরেছিলেন সেদিন ঘর থেকে বের হলে গাড়িতে গ্রেনেড মেরে তাকে হত্যা করা হবে এবং সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে এ হত্যার দায় উগ্রপন্থি বাঙালিদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে। এটি ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নীলনকশা। এ ঘটনাকে জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দেয়ার অজুহাত হিসাবেও দাঁড় করানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। এ ষড়যন্ত্রের কথা জানার পর মুজিব নিজের বাড়িতে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন, যাতে পাকিস্তানিরা চাইলে তাকে নিজের বাড়িতেই হত্যা করবে।

পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা অত্যাসন্ন-এ ধরনের খবর ২৫ মার্চ সর্বত্র চাউর হচ্ছিল। তাই মুজিব তার বড় ছেলে কামাল এবং দুই মেয়েকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেন। তিনি স্ত্রী ও ছোট ছেলে রাসেলকে নিয়ে ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। কারণ তাকে একা রেখে অন্য কোথাও যেতে রাজি হননি বেগম মুজিব। মেজো ছেলে জামাল তখন বাড়িতেই ছিল। নিজের কক্ষে ঘুমিয়ে ছিল।

রাত ১০টার দিকে মুজিব খবর পান পাকিস্তানি বাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছে। কিছু সময় পর পাকিস্তানি সৈন্যরা তার বাড়ি ঘেরাও করে এবং কাছেই একটি মর্টার শেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এ আক্রমণ শুরু হওয়ার আগেই শেখ মুজিব গোপনে কিছু প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন। রাত প্রায় ১০টা ৩০ মিনিটের দিকে তিনি চট্টগ্রামে এক গোপন স্থানে ফোন করে তার সর্বশেষ বার্তাটি প্রেরণ করেন। মুজিবের এ বার্তাটি রেকর্ড করা হয় এবং পরে গোপন ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচার করা হয়।

এ বার্তায় শেখ মুজিব তার ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেন, জনগণকে সর্বত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রতি স্বাধীনতার ডাক দেন। পরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং আধাসামরিক বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তান রাইফেলসের কাছেও তিনি এ বার্তা প্রেরণ করেন।

রাত ১১টার দিকে সারা ঢাকা শহরে পশ্চিম পাকিস্তানি আর্মির আক্রমণ শুরু হয় এবং তা দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্য রাতের দিকে সৈন্যরা শেখ মুজিবের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। মুজিব তার স্ত্রী এবং দুই সন্তান জামাল ও রাসেলকে ড্রেসিং রুমের সিঁড়িতে নিয়ে যান এবং গুলি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মেঝে মাথা নিচু করে থাকেন।

পাকিস্তানি সৈন্যরা দ্রুত গেট ভেঙে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে প্রবেশ করে এবং বাড়ির একজন প্রহরীকে হত্যা করে। তারপর তারা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসে। শেখ মুজিব জানান, তিনি নিজেই সৈন্যদের ঘরের দরজা খুলে দেন এবং সৈন্যদের গুলি বন্ধ করতে বলেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা কেন গুলি করছ। যদি তোমরা গুলি করতে চাও, আমাকে কর। আমি তো এখানে আছি। তোমরা কেন আমার জনগণকে এবং শিশুদের ওপর গুলি করছ?
মুজিবের কথা শুনে মেজর গুলি বর্ষণকারীকে থামান। মেজর বঙ্গবন্ধুকে জানান তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তখন মুজিব প্রস্তুত হওয়ার জন্য মেজরের কাছে কিছুক্ষণ সময় চান।

‘মুজিব একে একে সবাইকে চুমু খান এবং বলেন, তারা আমাকে হত্যা করতে পারে। আর কোনো দিন তোমাদের সঙ্গে আমার দেখা নাও হতে পারে। কিন্তু আমার জনগণ একদিন স্বাধীন হবে। আমার আত্মা সেটি দেখবে এবং খুশি হবে।’

তারপর তিনি সবার কাছ থেকে বিদায় নেন। ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি থেকে মুজিবকে প্রথমে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে একটি চেয়ারে বসতে দেয়া হয়। এরপর তাকে চা খেতে বলা হয়। তখন মুজিবের মনে হয়েছে তার সঙ্গে ঠাট্টা করা হচ্ছে। তাই বললেন, ‘চমৎকার, আমার জীবনে চা খাওয়ার এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ সময়।’

বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার সম্পর্কে বিবিসির একটি প্রতিবেদনে সৈয়দ বদরুল আহসান রচিত ‘ফ্রম রেবেল টু ফাউন্ডিং ফাদার’ বইকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।

লেখকের বর্ণনায়, ‘কর্নেল জেড এ খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটা দল ৩২ নম্বর ধানমণ্ডিতে গিয়েছিল। সেখানে পৌঁছাতেই সেনা সদস্যরা গুলি চালাতে শুরু করে। শেখ মুজিবের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাঙালি পুলিশ সদস্য গুলিতে মারা যান। বঙ্গবন্ধু দোতলা থেকে চেঁচিয়ে বলে ওঠেন ‘ফায়ারিং বন্ধ কর।’

সাংবাদিক বি জেড খুসরু তার বই ‘মিথস অ্যান্ড ফ্যাক্টস বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার’- এ লিখেছেন, ‘গুলি বন্ধ হওয়ার পরে কর্নেল খান বাসায় ঢোকেন। দোতলায় যান। মুজিব একটা ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

‘শেখ মুজিবকে কর্নেল নির্দেশ দেন তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য। তিনি জানতে চেয়েছিলেন পরিবারকে বিদায় জানিয়ে আসতে পারেন কিনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি।’

খুসরু আরও লিখেছেন, ‘কর্নেলকে শেখ মুজিব জিজ্ঞাসা করেন, আসার আগে আমাকে জানানো হলো না কেন? কর্নেল উত্তর দিয়েছিলেন, সেনাবাহিনী আপনাকে দেখাতে চেয়েছিল যে আপনাকে গ্রেফতারও করা যেতে পারে।’

জেড এ খান ‘দা ওয়ে ইট ওয়াজ’ বইতে লিখেছেন, ‘শেখ সাহেবকে গ্রেফতার করার পরে ৫৭ ব্রিগেডের মেজর জাফর ওয়ারলেস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন ‘বিগ বার্ড ইন কেইজ, স্মল বার্ডস হ্যাভ ফ্লোন’।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, ‘ওই রাতে মুজিবের সঙ্গে থাকা সব পুরুষকে আমরা গ্রেফতার করে এনেছিলাম। পরে চাকরবাকরদের ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। আদমজী স্কুলে সবাইকে ওই রাতে রাখা হয়েছিল। পরদিন ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’

গ্রেফতারের তিন দিন পরে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা থেকে করাচি নিয়ে যাওয়া হয় উল্লেখ করে মেজর সালিক লিখেছেন, ‘পরে আমার বন্ধু মেজর বিলালের কাছে জানতে চেয়েছিলাম গ্রেফতার করার সময়েই মুজিবকে খতম করে দিলে না কেন? বিলাল বলেছিল, জেনারেল টিক্কা খান ব্যক্তিগতভাবে ওকে বলেছিলেন যে কোনও উপায়ে শেখ মুজিবকে জীবিত গ্রেফতার করতে হবে।’

তথ্য সূত্র: সময় নিউজ

শেয়ার করুন

x

ভয়াল ২৫ মার্চে যেভাবে কাটিয়েছিলেন জাতির পিতা

আপডেট: ০১:২৯:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ মার্চ ২০২৩

মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত হত্যাযজ্ঞের দিন ২৫ মার্চ। নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বর্বরোচিত গণহত্যা চালানোর এক ভয়াল স্মৃতির কালরাত এইদিন। ১৯৭১ সালের এই রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে রচিত হয়েছিল বিশ্বের নৃশংসতম গণহত্যার এক কালো অধ্যায়। একটি জনগোষ্ঠীর স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে ঢাকায় চালানো ওই হত্যাযজ্ঞের নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুকটুইটারলিংকডইনইন্সটাগ্রামইউটিউব

‘অপারেশন সার্চলাইটে’র নামে মুক্তিকামী বাঙালির কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন শুরু হয় এই রাতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রাক্কালের এই গণহত্যার দিনটিকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে আসছে জাতি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন ৭ কোটি বাঙালিকে, সেই স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টাকে ২৫ শে মার্চ মধ্য রাতে আটক করার কথাতো আমরা সবাই জানি। কিন্তু আটকের আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কী কী করেন এবং কী কী ঘটেছে তার সঙ্গে তা কজনেই বা জানি?

২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো জানব সে সময় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের উপস্থিত হাজী গোলাম মোর্শেদ, বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপার্চায নাসরীন আহমাদ এবং বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য থেকে—

১৯৭১ সালের গোড়া থেকে কালরাত পর্যন্ত সেই উত্তেজনাকর দিনগুলোতে হাজী গোলাম মোর্শেদ বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর ‘আজ থেকে আমরা স্বাধীন’ ঘোষণাটি স্মরণ করেন।

গোলাম মোর্শেদ ওই দিনের ঘটনা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে বলেন, ‘ভবিষ্যৎ জাতির পিতা পাকিস্তানিদের দমন অভিযান শুরুর আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাকে গ্রেফতার করা হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওই দিন বঙ্গবন্ধু দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বারবার অনুরোধ উপেক্ষা করে, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতেই অবস্থান করেন। তিনি আশা করেছিলেন যে, তাকে গ্রেফতার করতে পারলে পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরস্ত্র সাধারণ বাঙালিদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালাবে না। কিন্তু বাস্তবে তার এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে বলেন, ‘তারা (পাকিস্তানি সৈন্য) আমাকে গ্রেফতার করতে আসছে। কিন্তু আমি এখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

আরও পড়ুনঃ ৭১’র ভয়াল রাত ‘২৫ মার্চ’: ইতিহাসের কালো অধ্যায়

মোর্শেদ বলেন, কয়েক মিনিট পর সেনা কমান্ডোরা আসে, পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এলিট ফোর্স স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ (এসএসজি) সদস্যরা ওই বাড়িতে এসে গুলিবর্ষণ শুরু করে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে। তিনি জানান, রাত ১০টার দিকে বঙ্গবন্ধু একা তার ঘরে বসে চোখ বন্ধ করে ওই ঘোষণাটি প্রদান করেন। সেনা হামলার আশঙ্কায় বেগম মুজিব ও তাদের ছোট সন্তান শেখ রাসেল এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী জানান, চরম যুদ্ধংদেহীভাবে সেনাবাহিনী ওই বাড়িতে হামলা চালানোর কিছু সময় আগে অপরিচিত এক ব্যক্তি ফোনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে চান। মোর্শেদ বলেন, ওই ব্যক্তি ফোনে শুধু এটুকু জানান যে তিনি ‘বলধা গার্ডেন’ থেকে ফোন করেছেন এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার কথা বলা খুবই জরুরি। ‘স্বাধীনতার ঘোষণাটি সম্প্রচারিত হওয়ায়’ এখন করণীয় সম্পর্কে তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা চান। মোর্শেদ বলেন, ‘তখন আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে যাই এবং রিসিভারটি আমার হাতে রেখে ওই ব্যক্তির কথা বঙ্গবন্ধুকে বলি। তিনি ওই লোকটিকে লুকিয়ে যেতে এবং ট্রান্সমিটারটি ধ্বংস করে ফেলতে বলেন। আমি আজও ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ওই দিন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবং আরও অনেকের সাথেই বঙ্গবন্ধু দেখা করেন। এমনকি সরকারি কর্মকর্তারাও আসেন তার নির্দেশনা নিতে, যারা এসময়টাতে এক অশুভ লক্ষণ দেখতে পান। কিন্তু ছাত্রনেতা তাবিবুর রহমান ছিলেন ওই সময়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করা সর্বশেষ ব্যক্তি। অন্য অনেকের মতো তিনিও বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে তাকে আত্মগোপন করার অনুরোধ জানান। মোর্শেদ বলতে থাকেন, তিনি (তাবিবুর) বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘এই মুহূর্তে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যান, তারা (পাকিস্তানি সৈন্য) আপনাকে হত্যা করবে। জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন- ‘যদি তারা আমাকে না পায়, তবে তারা সাধারণ মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালাবে এবং শহরটিকে ধ্বংস করে ফেলবে।’ বঙ্গবন্ধুকে কিছুতেই বাড়ি ছাড়তে রাজি করাতে না পেরে অশ্রুসিক্ত চোখে তাবিবুর ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।

মোর্শেদ জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা এমএ আউয়ালের কথা স্মরণ করেন- যিনি ওই সময়ে প্যারা-পুলিশ আনসার ফোর্সের পরিচালক  (জেনারেল) ছিলেন। ওই দিন তিনিও বঙ্গবন্ধুর দর্শনার্থীদের একজন ছিলেন। নেতারা যখন বাড়ির ভেতর পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা করছিলেন, তিনি তখন বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মোর্শেদ বলেন, একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের কাছে আসন্ন সেনা অভিযান মোকাবিলার জন্য অস্ত্র কোথা থেকে পাওয়া যেতে পারে, তা জানতে চান। তখন আউয়াল পুলিশ অস্ত্রাগারে থাকা অস্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মত দেন। মোর্শেদ জানালেন, ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান প্রস্তাবটি বাতিল করে দেন। কিন্তু পরে বঙ্গবন্ধু সামরিক অভিযান ঠেকাতে পুলিশ সদস্যদের মাঝে অস্ত্র বিতরণ করতে বলে তার পক্ষ থেকে আউয়ালকে মোর্শেদের সাথে ঢাকার তৎকালীন পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট  ই এ চৌধুরীর কাছে পাঠান।

মোর্শেদ বলেন, রাত ১২টার পর, বঙ্গবন্ধু তার কাছে এসে উজ্জ্বল আলোগুলো কোন দিক থেকে আসছে তা জানতে উপরতলায় চলে যান। কয়েক মুহূর্ত পর, কেউ একজন চিৎকার করে বলল, ‘হ্যান্ডস আপ। অপর একজন বলল, ‘মাৎ মারো (হত্যা কর না)’। এ সময় বঙ্গবন্ধু সিঁড়ির পাশে রাখা টেলিফোন সেটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ‘এক সেকেন্ডের মধ্যে কেউ একজন কিছু দিয়ে আমার মাথার পিছে আঘাত করলে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাসাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। আর সেই বাড়ি লাগোয়া পূর্বদিকের ৬৭৮ নম্বর বাড়িটি ছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বন বিভাগের এক বড় র্কমর্কতার। বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক প্রতিবেশী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপার্চায নাসরীন আহমাদদের বাড়ি ছিল এটি। তার মা বেগম বদরুন্নেসা আহমদ করতেন বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি।

নাসরীন আহমাদ বলেন, ‘২৫ র্মাচ ১৯৭১। গোটা দিনটি ছিল থমথমে। সেভাবেই দিন পেরিয়ে রাত নামলো ঢাকায়। সেই সময়টায় সবাই আঁচ করতে পারছিলেন ভয়ংকর কিছু একটা ঘটবে। যারা একটু ভালো বুঝতে পারতেন, তারা জানতেন ওই রাতেই ঘটতে যাচ্ছে ভয়ংকর কিছু ঘটনা। আমরাও বুঝতে পেরেছিলাম।’

নাসরীন বলেন, ‘এখনও স্পষ্ট মনে আছে ২৫ মার্চ সকাল বেলা আমি আর আমার মা কোথায় যেন গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি, বাসার সামনে সিরাজুল আলম খান। আমার মাকে খালাম্মা বা আপা বলেই ডাকতেন বলেই মনে হয়। তিনি আমার মাকে বললেন, ‘আজ রাতে দেখাব!’ ইস্পাহানি বা আদজমীর বাড়ি আক্রমণ করবে এই রকম কিছু একটা বলছিলেন সিরাজুল আলম খান। আমার মা খালি বললেন, ‘কোনো হঠকারিতা কর না যেন! যা করবে অনেক চিন্তা ভাবনা করেই করো। তারপর জনাব খান কোথায় যেন চলে গেলেন।’

তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যা থেকে আমি বাসায় আছি। সেটা রাত বারোটা বা সাড়ে বারোটার দিকে হবে। এমন সময় বঙ্গবন্ধু হঠাৎ করে আমাদের ঘরে ঢুকে হন্তদন্ত হয়ে আমাকে বললেন.., তাজউদ্দীন কোথায়?… এই তাজউদ্দীনকে দেখেছিস? আমি বললাম, না তো! তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন। আবার কী যেন ভেবে ফিরে এলেন। আমাদের ড্রয়িং রুম। দক্ষিণে তার তিনটা জানালা। তিনি সেখানে ঢুকলেন। জানালার পর্দাগুলো তিনি নিজেই সেঁটে দিলেন। বসলেন। আমাকে বললেন, শীলু এক কাপ চা দে… চা আনতে আমি উঠে যাচ্ছি। বাড়িতে আর কেউ নেই। কী ভেবে বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, কোথায় যাচ্ছিস? আমি বললাম, চা বানাতে বললেন যে! আবার কী ভেবে বললেন, থাক, দরকার নেই। এই দিকে আয়। কাছে যেতেই মামা, আমার হাতটা ধরলেন। বললেন, আজ রাতটা খুব খারাপ! আমি কী বুঝে বললাম, মামা আপনি পালিয়ে যান। উনি সুন্দর করে একটা হাসি দিয়ে বললেন, তোর এই মামাটাকে কোথায় লুকাবি? এরপর বললেন, না। তোরা সব ভালো থাক। সাবধানে থাক। আমি দেখি। আমি কী করব।

‘বঙ্গবন্ধু বলে চললেন… ওরা আমাকে না পেলে, বস্তির পর বস্তি জ্বালায়ে পুড়িয়ে দেবে। গ্রাম থেকে গ্রাম খুঁজে বেড়াবে। জ্বালিয়ে দেবে। এই বলে উনি আমাদের বাসা থেকে চলে গেলেন। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর সাথে ওই তার শেষ দেখা। অতটুকুই কথা!’

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসার পর ১৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বিদেশি সাংবাদিকদের এক সাক্ষাৎকার দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমসের বিখ্যাত সাংবাদিক সিডনি এইচ শ্যানবার্গ। বঙ্গবন্ধুর এ সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তার একটি বিশেষ প্রতিবেদন নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি।

শ্যানবার্গের ভাষায়- ‘মুক্তিলাভের কারণে অনেকটা নিরুদ্বেগ দেখালেও অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার রেশ তখনো তার মন থেকে কাটেনি। কিন্তু ভাগ্যের সুপ্রসন্নতায় বিশ্ব মানচিত্রে নতুন এক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে খুবই স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল। ১০ মাস আগে তাকে আটককারী ইয়াহিয়া খানের ঢাকার সরকারি বাসভবনের পালঙ্কে হেলান দিয়ে কয়েকটি মার্কিন পত্রিকার সাংবাদিকের সঙ্গে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলছিলেন বঙ্গবন্ধু।’

কেন সেদিন রাতে তিনি নিজের বাড়িতে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব বলেন, তিনি জানতে পেরেছিলেন সেদিন ঘর থেকে বের হলে গাড়িতে গ্রেনেড মেরে তাকে হত্যা করা হবে এবং সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে এ হত্যার দায় উগ্রপন্থি বাঙালিদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে। এটি ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নীলনকশা। এ ঘটনাকে জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দেয়ার অজুহাত হিসাবেও দাঁড় করানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। এ ষড়যন্ত্রের কথা জানার পর মুজিব নিজের বাড়িতে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন, যাতে পাকিস্তানিরা চাইলে তাকে নিজের বাড়িতেই হত্যা করবে।

পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা অত্যাসন্ন-এ ধরনের খবর ২৫ মার্চ সর্বত্র চাউর হচ্ছিল। তাই মুজিব তার বড় ছেলে কামাল এবং দুই মেয়েকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেন। তিনি স্ত্রী ও ছোট ছেলে রাসেলকে নিয়ে ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। কারণ তাকে একা রেখে অন্য কোথাও যেতে রাজি হননি বেগম মুজিব। মেজো ছেলে জামাল তখন বাড়িতেই ছিল। নিজের কক্ষে ঘুমিয়ে ছিল।

রাত ১০টার দিকে মুজিব খবর পান পাকিস্তানি বাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছে। কিছু সময় পর পাকিস্তানি সৈন্যরা তার বাড়ি ঘেরাও করে এবং কাছেই একটি মর্টার শেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এ আক্রমণ শুরু হওয়ার আগেই শেখ মুজিব গোপনে কিছু প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন। রাত প্রায় ১০টা ৩০ মিনিটের দিকে তিনি চট্টগ্রামে এক গোপন স্থানে ফোন করে তার সর্বশেষ বার্তাটি প্রেরণ করেন। মুজিবের এ বার্তাটি রেকর্ড করা হয় এবং পরে গোপন ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচার করা হয়।

এ বার্তায় শেখ মুজিব তার ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেন, জনগণকে সর্বত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রতি স্বাধীনতার ডাক দেন। পরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং আধাসামরিক বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তান রাইফেলসের কাছেও তিনি এ বার্তা প্রেরণ করেন।

রাত ১১টার দিকে সারা ঢাকা শহরে পশ্চিম পাকিস্তানি আর্মির আক্রমণ শুরু হয় এবং তা দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্য রাতের দিকে সৈন্যরা শেখ মুজিবের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। মুজিব তার স্ত্রী এবং দুই সন্তান জামাল ও রাসেলকে ড্রেসিং রুমের সিঁড়িতে নিয়ে যান এবং গুলি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মেঝে মাথা নিচু করে থাকেন।

পাকিস্তানি সৈন্যরা দ্রুত গেট ভেঙে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে প্রবেশ করে এবং বাড়ির একজন প্রহরীকে হত্যা করে। তারপর তারা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসে। শেখ মুজিব জানান, তিনি নিজেই সৈন্যদের ঘরের দরজা খুলে দেন এবং সৈন্যদের গুলি বন্ধ করতে বলেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা কেন গুলি করছ। যদি তোমরা গুলি করতে চাও, আমাকে কর। আমি তো এখানে আছি। তোমরা কেন আমার জনগণকে এবং শিশুদের ওপর গুলি করছ?
মুজিবের কথা শুনে মেজর গুলি বর্ষণকারীকে থামান। মেজর বঙ্গবন্ধুকে জানান তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তখন মুজিব প্রস্তুত হওয়ার জন্য মেজরের কাছে কিছুক্ষণ সময় চান।

‘মুজিব একে একে সবাইকে চুমু খান এবং বলেন, তারা আমাকে হত্যা করতে পারে। আর কোনো দিন তোমাদের সঙ্গে আমার দেখা নাও হতে পারে। কিন্তু আমার জনগণ একদিন স্বাধীন হবে। আমার আত্মা সেটি দেখবে এবং খুশি হবে।’

তারপর তিনি সবার কাছ থেকে বিদায় নেন। ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি থেকে মুজিবকে প্রথমে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে একটি চেয়ারে বসতে দেয়া হয়। এরপর তাকে চা খেতে বলা হয়। তখন মুজিবের মনে হয়েছে তার সঙ্গে ঠাট্টা করা হচ্ছে। তাই বললেন, ‘চমৎকার, আমার জীবনে চা খাওয়ার এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ সময়।’

বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার সম্পর্কে বিবিসির একটি প্রতিবেদনে সৈয়দ বদরুল আহসান রচিত ‘ফ্রম রেবেল টু ফাউন্ডিং ফাদার’ বইকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।

লেখকের বর্ণনায়, ‘কর্নেল জেড এ খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটা দল ৩২ নম্বর ধানমণ্ডিতে গিয়েছিল। সেখানে পৌঁছাতেই সেনা সদস্যরা গুলি চালাতে শুরু করে। শেখ মুজিবের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাঙালি পুলিশ সদস্য গুলিতে মারা যান। বঙ্গবন্ধু দোতলা থেকে চেঁচিয়ে বলে ওঠেন ‘ফায়ারিং বন্ধ কর।’

সাংবাদিক বি জেড খুসরু তার বই ‘মিথস অ্যান্ড ফ্যাক্টস বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার’- এ লিখেছেন, ‘গুলি বন্ধ হওয়ার পরে কর্নেল খান বাসায় ঢোকেন। দোতলায় যান। মুজিব একটা ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

‘শেখ মুজিবকে কর্নেল নির্দেশ দেন তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য। তিনি জানতে চেয়েছিলেন পরিবারকে বিদায় জানিয়ে আসতে পারেন কিনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি।’

খুসরু আরও লিখেছেন, ‘কর্নেলকে শেখ মুজিব জিজ্ঞাসা করেন, আসার আগে আমাকে জানানো হলো না কেন? কর্নেল উত্তর দিয়েছিলেন, সেনাবাহিনী আপনাকে দেখাতে চেয়েছিল যে আপনাকে গ্রেফতারও করা যেতে পারে।’

জেড এ খান ‘দা ওয়ে ইট ওয়াজ’ বইতে লিখেছেন, ‘শেখ সাহেবকে গ্রেফতার করার পরে ৫৭ ব্রিগেডের মেজর জাফর ওয়ারলেস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন ‘বিগ বার্ড ইন কেইজ, স্মল বার্ডস হ্যাভ ফ্লোন’।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, ‘ওই রাতে মুজিবের সঙ্গে থাকা সব পুরুষকে আমরা গ্রেফতার করে এনেছিলাম। পরে চাকরবাকরদের ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। আদমজী স্কুলে সবাইকে ওই রাতে রাখা হয়েছিল। পরদিন ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’

গ্রেফতারের তিন দিন পরে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা থেকে করাচি নিয়ে যাওয়া হয় উল্লেখ করে মেজর সালিক লিখেছেন, ‘পরে আমার বন্ধু মেজর বিলালের কাছে জানতে চেয়েছিলাম গ্রেফতার করার সময়েই মুজিবকে খতম করে দিলে না কেন? বিলাল বলেছিল, জেনারেল টিক্কা খান ব্যক্তিগতভাবে ওকে বলেছিলেন যে কোনও উপায়ে শেখ মুজিবকে জীবিত গ্রেফতার করতে হবে।’

তথ্য সূত্র: সময় নিউজ