০৫:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
বিতর্কিত পলাতক ব্যবসায়ী জাভেদ অপজেনহামের ভূয়া স্বাক্ষরে কোটি কোটি টাকা লোপাট

কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ডাচ-বাংলা ব্যাংকে ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারি: পর্ব-১

বিশেষ প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ০৭:২৮:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ১০১৯৭ বার দেখা হয়েছে

দেশের ব্যাংকিং খাতকে নাড়িয়ে দিয়েছে বেসরকারি ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেডে সংঘটিত ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ। বিতর্কিত ও পলাতক ব্যবসায়ী জাভেদ অপজেনহামের মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে তার ভূয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে নিয়মিত কোটি কোটি টাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপক ও কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ছাড়া এ অপকর্ম সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের প্রগতি স্বরনী ও গুলশান শাখা। এসব শাখা থেকে ফুয়াং সিরামিক, ফুয়াং ট্রেডিং ও এসএস স্টিলসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রায় প্রতিদিনই লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে পলাতক হত্যা মামলা আসামী ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী জাভেদ অপজেনহাম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ব্যাংকের আর্থিক লেনদেন ও যাবতীয় তথ্য বিশ্লেষন শুরু করে ‘বিজনেস জার্নাল’-এর অনুসন্ধানী দল। অনুসন্ধানকালে ওঠে এসেছে কিভাবে জাভেদ অপজেনহাম ডাচ-বাংলা ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় একাধিক কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এবং তা পরবর্তীতে হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বাহিরে পাচার করছেন। এ সংক্রান্ত সকল প্রমাণ/ডকুমেন্টস প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। এরই  ধারাবাহিকতায় এসব  আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে বিজনেস জার্নালের করা আট পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জাভেদ অপজেনহাম জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বেলজিয়ামের পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা তিনি দেশে না থাকা সত্বেও তারই স্বাক্ষর নিজেরা করে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নির্দিষ্ট শাখাগুলোতে প্রতিদিন লেনদেন চলছে নির্বিঘ্নে।

এখন প্রশ্ন হলো- গ্রাহক দেশের বাইরে থাকলে কীভাবে তার কর্মকর্তা কর্তৃক করা জাল স্বাক্ষর কিভাবে অ্যাপ্রুভ হচ্ছে? ব্যাংকের বাধ্যতামূলক সিগনেচার ভেরিফিকেশন কোথায় গেল? তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরও বড় অঙ্কের উত্তোলনে কেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোন বাধা দিচ্ছে না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একটাই- ব্যাংকের ভেতর থেকেই অপকর্মের পথ খুলে দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জাভেদ অপজেনহাম রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নামে-বেনামে একাধিক ভূয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়ের হওয়া একাধিক হত্যা মামলার আসামি তিনি। এসব মামলার পরই দেশ ছেড়ে পালান জাভেদ অপজেনহাম।

বিশেষ করে পুঁজিবাজারের একটি বিতর্কিত নাম জাভেদ অপজেনহাফেন, যিনি দুর্বল কোম্পানিকে বিশেষ কায়দায় ভালো দেখিয়ে পুঁজিবাজার থেকে হাতিয়ে নেন শত শত কোটি টাকা। রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে পুঁজিবাজারে দুর্বল কোম্পানি তালিকাভু্ক্তির মাধ্যমে ব্যবসার নামে নিয়েছেন বিপুল ব্যাংক ঋণ। যে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটিতে।

জাভেদ অপজেনহাফেন দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ‘অর্থ লোপাটের মহারাজা’ হিসেবে পুঁজিবাজারে পরিচিত। তিনি মূলত দুর্বল কোম্পানিকে অতিরঞ্জিত করে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসেন। সেসব কোম্পানি তালিকাভুক্তির কয়েক বছরের মধ্যেই রুগ্ন হয়ে ওঠে, যার উদাহরণ হচ্ছে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, এসএস স্টিল এবং ফু ওয়াং সিরামিকস। এই তিনটি কোম্পানির নেতৃত্বে রয়েছেন জাভেদ। এসব কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ব্যাংক ঋণসহ শ্রমিকদের অর্থও তছরুপ করেছেন তিনি। আর এসব অর্থ ব্যবহার করেছেন ব্যক্তিগত স্বার্থে। বিগত সরকারের আমলে ক্ষমতা ব্যবহার করে নিয়েছেন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ। অর্থ পাচারসহ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাভেদ অপজেনহাফেনসহ জেনারেশন নেক্সটের চেয়ারম্যান জাভেদের বাবা তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী, কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাজীব শেঠিসহ আরও কয়েকজন পরিচালক দেশ থেকে পালিয়েছেন।  রাজীব শেঠি বাংলাদেশে বসবাসরত একজন ভারতীয় নাগরিক।

তবে দেশ ছেড়ে পালালেও থামেনি তার অর্থ লুটের সাম্রাজ্য। বরং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোসহ বিভিন্ন ব্যাংকের ভেতরে দায়িত্বে থাকা অসাধু কর্মকর্তাদের সহায়তায় সেটি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডাচ বাংলা ব্যাংকের প্রগতি স্বরনী ও গুলশান শাখা থেকে ফুয়াং সিরামিক, ফুয়াং ইন্ডাস্ট্রি ও ফুয়াং ট্রেডিংয়ের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই লেনদেন চললেও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট, কমপ্লায়েন্স কিংবা কেন্দ্রীয় মনিটরিং ইউনিট কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি- যা পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এ সংক্রান্ত সকল তথ্য-প্রমাণ এ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে এবং প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে এ নিয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি আর সাধারণ অনিয়ম নয়; এটি একটি সংগঠিত ব্যাংকিং সিন্ডিকেট, যেখানে গ্রাহক, শাখা ব্যবস্থাপক ও নির্দিষ্ট কর্মকর্তারা একই সুতোয় বাঁধা।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভূয়া স্বাক্ষরে নিয়মিত টাকা উত্তোলন, দীর্ঘ সময় ধরে বড় অঙ্কের লেনদেন এবং গ্রাহক দেশের বাইরে থাকার তথ্য উপেক্ষা, এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ঘটতে পারে শুধুমাত্র ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। ফলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই শাখা ব্যবস্থাপক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

তাদের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করছে- দেশের ব্যাংকিং খাতে এখনও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর, প্রভাবশালী গ্রাহকদের জন্য আলাদা নিয়ম, শাখা পর্যায়ে ভয়াবহ ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি রয়েছে। এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থও যে নিরাপদ নয়, তা বলাই বাহুল্য।

এসব অভিযোগ ও বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ ও ফরেনসিক অডিটের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে ডাচ বাংলা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের বক্তব্য জানতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা সগির আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাচ-বাংলা ব্যাংকে সংঘটিত এই অভিযোগ শুধু একটি আর্থিক অনিয়ম নয়, এটি রাষ্ট্রীয় আর্থিক নিরাপত্তার জন্য একটি লাল সংকেত। এখনই যদি কঠোর তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে এই লুটপাটের ভাইরাস পুরো ব্যাংকিং খাতে ছড়িয়ে পড়বে, যার দায় এড়াতে পারবে না কেউই। (চলবে…)

শেয়ার করুন

error: Content is protected ! Please Don't Try!

বিতর্কিত পলাতক ব্যবসায়ী জাভেদ অপজেনহামের ভূয়া স্বাক্ষরে কোটি কোটি টাকা লোপাট

কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ডাচ-বাংলা ব্যাংকে ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারি: পর্ব-১

আপডেট: ০৭:২৮:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের ব্যাংকিং খাতকে নাড়িয়ে দিয়েছে বেসরকারি ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেডে সংঘটিত ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ। বিতর্কিত ও পলাতক ব্যবসায়ী জাভেদ অপজেনহামের মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে তার ভূয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে নিয়মিত কোটি কোটি টাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপক ও কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ছাড়া এ অপকর্ম সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের প্রগতি স্বরনী ও গুলশান শাখা। এসব শাখা থেকে ফুয়াং সিরামিক, ফুয়াং ট্রেডিং ও এসএস স্টিলসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রায় প্রতিদিনই লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে পলাতক হত্যা মামলা আসামী ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী জাভেদ অপজেনহাম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ব্যাংকের আর্থিক লেনদেন ও যাবতীয় তথ্য বিশ্লেষন শুরু করে ‘বিজনেস জার্নাল’-এর অনুসন্ধানী দল। অনুসন্ধানকালে ওঠে এসেছে কিভাবে জাভেদ অপজেনহাম ডাচ-বাংলা ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় একাধিক কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এবং তা পরবর্তীতে হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বাহিরে পাচার করছেন। এ সংক্রান্ত সকল প্রমাণ/ডকুমেন্টস প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। এরই  ধারাবাহিকতায় এসব  আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে বিজনেস জার্নালের করা আট পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জাভেদ অপজেনহাম জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বেলজিয়ামের পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা তিনি দেশে না থাকা সত্বেও তারই স্বাক্ষর নিজেরা করে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নির্দিষ্ট শাখাগুলোতে প্রতিদিন লেনদেন চলছে নির্বিঘ্নে।

এখন প্রশ্ন হলো- গ্রাহক দেশের বাইরে থাকলে কীভাবে তার কর্মকর্তা কর্তৃক করা জাল স্বাক্ষর কিভাবে অ্যাপ্রুভ হচ্ছে? ব্যাংকের বাধ্যতামূলক সিগনেচার ভেরিফিকেশন কোথায় গেল? তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরও বড় অঙ্কের উত্তোলনে কেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোন বাধা দিচ্ছে না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একটাই- ব্যাংকের ভেতর থেকেই অপকর্মের পথ খুলে দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জাভেদ অপজেনহাম রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নামে-বেনামে একাধিক ভূয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়ের হওয়া একাধিক হত্যা মামলার আসামি তিনি। এসব মামলার পরই দেশ ছেড়ে পালান জাভেদ অপজেনহাম।

বিশেষ করে পুঁজিবাজারের একটি বিতর্কিত নাম জাভেদ অপজেনহাফেন, যিনি দুর্বল কোম্পানিকে বিশেষ কায়দায় ভালো দেখিয়ে পুঁজিবাজার থেকে হাতিয়ে নেন শত শত কোটি টাকা। রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে পুঁজিবাজারে দুর্বল কোম্পানি তালিকাভু্ক্তির মাধ্যমে ব্যবসার নামে নিয়েছেন বিপুল ব্যাংক ঋণ। যে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটিতে।

জাভেদ অপজেনহাফেন দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ‘অর্থ লোপাটের মহারাজা’ হিসেবে পুঁজিবাজারে পরিচিত। তিনি মূলত দুর্বল কোম্পানিকে অতিরঞ্জিত করে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসেন। সেসব কোম্পানি তালিকাভুক্তির কয়েক বছরের মধ্যেই রুগ্ন হয়ে ওঠে, যার উদাহরণ হচ্ছে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, এসএস স্টিল এবং ফু ওয়াং সিরামিকস। এই তিনটি কোম্পানির নেতৃত্বে রয়েছেন জাভেদ। এসব কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ব্যাংক ঋণসহ শ্রমিকদের অর্থও তছরুপ করেছেন তিনি। আর এসব অর্থ ব্যবহার করেছেন ব্যক্তিগত স্বার্থে। বিগত সরকারের আমলে ক্ষমতা ব্যবহার করে নিয়েছেন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ। অর্থ পাচারসহ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাভেদ অপজেনহাফেনসহ জেনারেশন নেক্সটের চেয়ারম্যান জাভেদের বাবা তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী, কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাজীব শেঠিসহ আরও কয়েকজন পরিচালক দেশ থেকে পালিয়েছেন।  রাজীব শেঠি বাংলাদেশে বসবাসরত একজন ভারতীয় নাগরিক।

তবে দেশ ছেড়ে পালালেও থামেনি তার অর্থ লুটের সাম্রাজ্য। বরং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোসহ বিভিন্ন ব্যাংকের ভেতরে দায়িত্বে থাকা অসাধু কর্মকর্তাদের সহায়তায় সেটি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডাচ বাংলা ব্যাংকের প্রগতি স্বরনী ও গুলশান শাখা থেকে ফুয়াং সিরামিক, ফুয়াং ইন্ডাস্ট্রি ও ফুয়াং ট্রেডিংয়ের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই লেনদেন চললেও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট, কমপ্লায়েন্স কিংবা কেন্দ্রীয় মনিটরিং ইউনিট কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি- যা পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এ সংক্রান্ত সকল তথ্য-প্রমাণ এ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে এবং প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে এ নিয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি আর সাধারণ অনিয়ম নয়; এটি একটি সংগঠিত ব্যাংকিং সিন্ডিকেট, যেখানে গ্রাহক, শাখা ব্যবস্থাপক ও নির্দিষ্ট কর্মকর্তারা একই সুতোয় বাঁধা।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভূয়া স্বাক্ষরে নিয়মিত টাকা উত্তোলন, দীর্ঘ সময় ধরে বড় অঙ্কের লেনদেন এবং গ্রাহক দেশের বাইরে থাকার তথ্য উপেক্ষা, এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ঘটতে পারে শুধুমাত্র ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। ফলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই শাখা ব্যবস্থাপক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

তাদের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করছে- দেশের ব্যাংকিং খাতে এখনও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর, প্রভাবশালী গ্রাহকদের জন্য আলাদা নিয়ম, শাখা পর্যায়ে ভয়াবহ ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি রয়েছে। এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থও যে নিরাপদ নয়, তা বলাই বাহুল্য।

এসব অভিযোগ ও বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ ও ফরেনসিক অডিটের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে ডাচ বাংলা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের বক্তব্য জানতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা সগির আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাচ-বাংলা ব্যাংকে সংঘটিত এই অভিযোগ শুধু একটি আর্থিক অনিয়ম নয়, এটি রাষ্ট্রীয় আর্থিক নিরাপত্তার জন্য একটি লাল সংকেত। এখনই যদি কঠোর তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে এই লুটপাটের ভাইরাস পুরো ব্যাংকিং খাতে ছড়িয়ে পড়বে, যার দায় এড়াতে পারবে না কেউই। (চলবে…)