০৯:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
সালতামামি- ২০২৫

পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ ও খেলাপির ধাক্কায় অস্থির ব্যাংক খাত

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ০৫:৫৭:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১০২৯৫ বার দেখা হয়েছে

বিভিন্ন জালিয়াতির কারণে ব্যাংক খাতের চরম দুরবস্থার বিষয়টি আলোচনায় আসে আওয়ামী লীগ পতনের বেশ আগেই। তখন মুখে ব্যাংক খাত সংস্কারে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও তার কার্যকারিতা ছিল না। বরং ঋণ পুনঃতপশিলসহ নানা উপায়ে খেলাপি ঋণ আড়ালের উপায় বাতলে দেয় খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মালিকপক্ষের অর্থ আত্মসাতের কারণে কয়েকটি ব্যাংকের চরম খারাপ অবস্থার বিষয়টি জেনেও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট থেকে বিশেষ ধার হিসেবে টাকা দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ব্যাংকের লুকানো খেলাপি ঋণ সামনে আসায় খেলাপি ঋণ কয়েক গুণ বেড়েছে। প্রতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি নিয়ে ২০২৫ সালজুড়ে আলোচনা ছিল। একইভাবে আলোচনায় ছিল দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে মালিকপক্ষ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এমন কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক মিলে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। দুর্দশাগ্রস্ত এসব ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাইয়ের (একিউআর) জন্য ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক দুটি অডিট ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর গত এপ্রিলে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করে সরকার। সে আলোকে এসব ব্যাংক এক করা হয়েছে। আরও কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করা হবে। এ জন্য এবি, ন্যাশনাল ও আইএফআইসি ব্যাংকের ‘একিউআর’ হচ্ছে।

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৬ লাখ আমানতকারীর প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে গড়ে ৭৭ শতাংশ ঋণ খেলাপি। ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের আমানত বীমা তহবিল থেকে প্রথম ধাপে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। আমানতের বাকি অর্থও পর্যায়ক্রমে তুলতে পারবেন আমানতকারীরা। তবে এসব ব্যাংকসহ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের আমানত আদৌ তোলা যাবে কিনা, বছরজুড়ে সে আলোচনা ছিল। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের মধ্যে শেয়ার দেওয়া হবে।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা নেওয়ার সময় ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। পরে ব্যাপক অনিয়মের কারণে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে। খেলপি ঋণ কমাতে আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে ২০১৩ সাল থেকে কখনও বিশেষ ব্যবস্থায় পুনঃতপশিল বা পুনর্গঠন করা হয়। আর করোনাভাইরাসের প্রভাব দেখিয়ে পরে কোনো ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপিমুক্ত থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে চব্বিশের আগস্ট পরবর্তী প্রকৃত পরিস্থিতি সামনে আনতে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে গত সেপ্টেম্বর শেষে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের যা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অবশ্য ২০২৩ সালে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি শুরুর পর কিছুটা কড়াকড়ি শুরু হয়। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে চব্বিশের জুনে খেলাপি দেখানো হয় দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের যা ছিল ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে তিন লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকায় ওঠে। প্রতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল।

স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য বিদায়ী বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের উদ্যোগ ছিল । গভর্নরকে মন্ত্রী পদ মর্যাদা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কেবল সংসদের কাছে দায়বদ্ধ করার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার এখনও সংশোধন হয়নি। এর বাইরে ব্যাংকের ওপর পরিবারের প্রভাব কমাতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে পাঠানো হলেও এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি। ব্যাংকের মন্দ ঋণ কেনার জন্য আলাদা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি খোলার জন্য প্রস্তাবিত আইনও হয়নি।

ঢাকা/এসএইচ

শেয়ার করুন

error: Content is protected ! Please Don't Try!

সালতামামি- ২০২৫

পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ ও খেলাপির ধাক্কায় অস্থির ব্যাংক খাত

আপডেট: ০৫:৫৭:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬

বিভিন্ন জালিয়াতির কারণে ব্যাংক খাতের চরম দুরবস্থার বিষয়টি আলোচনায় আসে আওয়ামী লীগ পতনের বেশ আগেই। তখন মুখে ব্যাংক খাত সংস্কারে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও তার কার্যকারিতা ছিল না। বরং ঋণ পুনঃতপশিলসহ নানা উপায়ে খেলাপি ঋণ আড়ালের উপায় বাতলে দেয় খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মালিকপক্ষের অর্থ আত্মসাতের কারণে কয়েকটি ব্যাংকের চরম খারাপ অবস্থার বিষয়টি জেনেও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট থেকে বিশেষ ধার হিসেবে টাকা দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ব্যাংকের লুকানো খেলাপি ঋণ সামনে আসায় খেলাপি ঋণ কয়েক গুণ বেড়েছে। প্রতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি নিয়ে ২০২৫ সালজুড়ে আলোচনা ছিল। একইভাবে আলোচনায় ছিল দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে মালিকপক্ষ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এমন কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক মিলে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। দুর্দশাগ্রস্ত এসব ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাইয়ের (একিউআর) জন্য ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক দুটি অডিট ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর গত এপ্রিলে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করে সরকার। সে আলোকে এসব ব্যাংক এক করা হয়েছে। আরও কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করা হবে। এ জন্য এবি, ন্যাশনাল ও আইএফআইসি ব্যাংকের ‘একিউআর’ হচ্ছে।

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৬ লাখ আমানতকারীর প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে গড়ে ৭৭ শতাংশ ঋণ খেলাপি। ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের আমানত বীমা তহবিল থেকে প্রথম ধাপে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। আমানতের বাকি অর্থও পর্যায়ক্রমে তুলতে পারবেন আমানতকারীরা। তবে এসব ব্যাংকসহ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের আমানত আদৌ তোলা যাবে কিনা, বছরজুড়ে সে আলোচনা ছিল। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের মধ্যে শেয়ার দেওয়া হবে।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা নেওয়ার সময় ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। পরে ব্যাপক অনিয়মের কারণে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে। খেলপি ঋণ কমাতে আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে ২০১৩ সাল থেকে কখনও বিশেষ ব্যবস্থায় পুনঃতপশিল বা পুনর্গঠন করা হয়। আর করোনাভাইরাসের প্রভাব দেখিয়ে পরে কোনো ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপিমুক্ত থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে চব্বিশের আগস্ট পরবর্তী প্রকৃত পরিস্থিতি সামনে আনতে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে গত সেপ্টেম্বর শেষে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের যা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অবশ্য ২০২৩ সালে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি শুরুর পর কিছুটা কড়াকড়ি শুরু হয়। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে চব্বিশের জুনে খেলাপি দেখানো হয় দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের যা ছিল ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে তিন লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকায় ওঠে। প্রতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল।

স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য বিদায়ী বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের উদ্যোগ ছিল । গভর্নরকে মন্ত্রী পদ মর্যাদা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কেবল সংসদের কাছে দায়বদ্ধ করার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার এখনও সংশোধন হয়নি। এর বাইরে ব্যাংকের ওপর পরিবারের প্রভাব কমাতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে পাঠানো হলেও এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি। ব্যাংকের মন্দ ঋণ কেনার জন্য আলাদা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি খোলার জন্য প্রস্তাবিত আইনও হয়নি।

ঢাকা/এসএইচ