১২:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
সালতামামি- ২০২৫

রেমিট্যান্সে স্বস্তি মিলেছে অর্থনীতিতে

বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক:
  • আপডেট: ০৬:০৭:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১০২৩২ বার দেখা হয়েছে

দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা আছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অনেক শিল্পকারখানার মালিক পলাতক বা জেলে থাকায় তা বন্ধ হয়ে চাকরি হারিয়েছেন অনেকে। অন্যদিকে, প্রত্যাশা অনুসারে আসছে না নতুন বিনিয়োগ। এসবের মধ্যেও অর্থনীতিকে স্বস্তি দিয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। প্রায় ৪০ লাখ পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে অর্থ প্রবাহ সচল রাখার পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা লাগাম টানা, ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স।

একটা সময় ধরে ডলারের দর নিয়মিত বাড়ছিল। সেটা নিয়ন্ত্রণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার বিক্রি করছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর এখন ডলারের দর যাতে অনেক না কমে যায়, সে জন্য ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে মোট ৩১৩ কোটি ৫৫ লাখ ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছুঁইছুঁই। আর বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ উঠেছে ২৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। মূলত গত বছরের জুলাই থেকে ডলার কেনা শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

দেশের ইতিহাসে রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার হয় ২০২১ সালের আগস্টে। সেখান থেকে কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নামে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ২৮ বিলিয়ন ডলারের মতো বিক্রি করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে ডিসেম্বর মাসের ২৯ দিনের রেমিট্যান্সের হিসাব দিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, মাস শেষ হওয়ার আগেই রেমিট্যান্স তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এ পর্যন্ত ৩০৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এটি গত বছরের পুরো ডিসেম্বর মাস এবং আগের মাসের তুলনায় অনেক বেশি।

এর আগে গত বছরের মার্চ মাসে ঈদ ও রোজাকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ ৩৩০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের দুদিন বাকি থাকতে মোট তিন হাজার ২৬৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের বছর যার পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৬৭৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ, বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত এসেছে এক হাজার ৬০৮ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছর রেকর্ড ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের উচ্চ প্রবৃদ্ধির পর এবারও বৃদ্ধির এ প্রবণতা অর্থনীতিকে স্বস্তি দিচ্ছে।

রেমিট্যান্সের এই উচ্চ প্রবাহের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে গতকাল ৩৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। আর বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ উঠেছে ২৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারে। বৈদেশিক মুদ্রার এ রিজার্ভ প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালের জুন থেকে আইএমএফের শর্ত মেনে বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই সময় রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ পতনের সময় বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ নামে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত সরকারের সময়ে সবচেয়ে অস্বস্তি ছিল ডলার বাজার নিয়ে। তখন ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মূল কারণ বিবেচনা করা হয় ডলার না পাওয়া ও ধারাবাহিকভাবে এর দর বৃদ্ধিকে। তবে চব্বিশের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে আন্তঃব্যাংক ডলারের দর ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। আবার ডলার পেতেও এখন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন দুই অঙ্কের ঘরে থাকা মূল্যস্ফীতি গত নভেম্বর শেষে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে শুরু হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল লুটের অর্থনীতি। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস এবং পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর অর্থনীতিতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। ওই সময় দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় সুদহারে নয়ছয় বজায় থাকলেও বিশ্ববাজারের সুদহার অনেক বেড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যে সরকারের নানা ছাড়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অজুহাতে দেশ থেকে ব্যাপকভাবে অর্থ পাচার হচ্ছিল। যে কারণে ২০২১ সালের মাঝামাঝিতে ৮৪ টাকার ডলারের দর বেড়ে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় উঠে যায়। অবশ্য ২০২৩ সালে আইএমএফ থেকে ঋণ নেওয়ার পর সংস্থাটির বিভিন্ন শর্তের কারণে ২০২৪ সালে এসে কিছুটা শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা হয়।

ঢাকা/এসএইচ

শেয়ার করুন

সালতামামি- ২০২৫

রেমিট্যান্সে স্বস্তি মিলেছে অর্থনীতিতে

আপডেট: ০৬:০৭:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬

দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা আছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অনেক শিল্পকারখানার মালিক পলাতক বা জেলে থাকায় তা বন্ধ হয়ে চাকরি হারিয়েছেন অনেকে। অন্যদিকে, প্রত্যাশা অনুসারে আসছে না নতুন বিনিয়োগ। এসবের মধ্যেও অর্থনীতিকে স্বস্তি দিয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। প্রায় ৪০ লাখ পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে অর্থ প্রবাহ সচল রাখার পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা লাগাম টানা, ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স।

একটা সময় ধরে ডলারের দর নিয়মিত বাড়ছিল। সেটা নিয়ন্ত্রণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার বিক্রি করছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর এখন ডলারের দর যাতে অনেক না কমে যায়, সে জন্য ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে মোট ৩১৩ কোটি ৫৫ লাখ ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছুঁইছুঁই। আর বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ উঠেছে ২৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। মূলত গত বছরের জুলাই থেকে ডলার কেনা শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

দেশের ইতিহাসে রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার হয় ২০২১ সালের আগস্টে। সেখান থেকে কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নামে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ২৮ বিলিয়ন ডলারের মতো বিক্রি করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে ডিসেম্বর মাসের ২৯ দিনের রেমিট্যান্সের হিসাব দিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, মাস শেষ হওয়ার আগেই রেমিট্যান্স তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এ পর্যন্ত ৩০৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এটি গত বছরের পুরো ডিসেম্বর মাস এবং আগের মাসের তুলনায় অনেক বেশি।

এর আগে গত বছরের মার্চ মাসে ঈদ ও রোজাকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ ৩৩০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের দুদিন বাকি থাকতে মোট তিন হাজার ২৬৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের বছর যার পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৬৭৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ, বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত এসেছে এক হাজার ৬০৮ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছর রেকর্ড ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের উচ্চ প্রবৃদ্ধির পর এবারও বৃদ্ধির এ প্রবণতা অর্থনীতিকে স্বস্তি দিচ্ছে।

রেমিট্যান্সের এই উচ্চ প্রবাহের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে গতকাল ৩৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। আর বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ উঠেছে ২৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারে। বৈদেশিক মুদ্রার এ রিজার্ভ প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালের জুন থেকে আইএমএফের শর্ত মেনে বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই সময় রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ পতনের সময় বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ নামে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত সরকারের সময়ে সবচেয়ে অস্বস্তি ছিল ডলার বাজার নিয়ে। তখন ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মূল কারণ বিবেচনা করা হয় ডলার না পাওয়া ও ধারাবাহিকভাবে এর দর বৃদ্ধিকে। তবে চব্বিশের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে আন্তঃব্যাংক ডলারের দর ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। আবার ডলার পেতেও এখন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন দুই অঙ্কের ঘরে থাকা মূল্যস্ফীতি গত নভেম্বর শেষে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে শুরু হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল লুটের অর্থনীতি। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস এবং পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর অর্থনীতিতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। ওই সময় দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় সুদহারে নয়ছয় বজায় থাকলেও বিশ্ববাজারের সুদহার অনেক বেড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যে সরকারের নানা ছাড়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অজুহাতে দেশ থেকে ব্যাপকভাবে অর্থ পাচার হচ্ছিল। যে কারণে ২০২১ সালের মাঝামাঝিতে ৮৪ টাকার ডলারের দর বেড়ে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় উঠে যায়। অবশ্য ২০২৩ সালে আইএমএফ থেকে ঋণ নেওয়ার পর সংস্থাটির বিভিন্ন শর্তের কারণে ২০২৪ সালে এসে কিছুটা শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা হয়।

ঢাকা/এসএইচ