গল্পের শুরুটা ১২ বছর পূর্বের। যখন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন মানুষ সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণের জন্য শহরে যেতে হত, লাইনে দাঁড়িয়ে কিংবা দালালের বিড়ম্বনার শিকার হয়ে আর্থিক ভোগান্তিতে পড়তে হত, সেবা পেতে সময় লাগতো অনেক, দিনের পর দিন, কখনো মাসের পর মাস। সন্তান কিংবা আত্মীয় বিদেশে থাকলে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য নাগরিকদের ছুটে যেতে হত গঞ্জের টেলিফোন দোকানে। তাও মাত্র একটা ফোন কলের জন্য দীর্ঘ লাইন। যখন এদেশের অধিকাংশ মানুষ মোবাইল ব্যবহার করত না, ইন্টারনেট সম্পর্কে ধারণা রাখতো না, এগিয়ে যাওয়া বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোকে ভাবতো বিলাসিতা কিংবা স্বপ্ন। ঠিক তখনই যাত্রা শুরু হয় ডিজিটাল বাংলাদেশের পথচলা। যে পথচলার প্রেরণায় রয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মনির্ভরশীল এবং আধুনিক সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশনায় সেই রূপরেখাকে গত ১২ বছরে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে একটি ডিজিটাল দেশের রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি। 

 

২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করা হয় যে, ২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ পরিণত হবে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন এবং সহজেই নাগরিক সেবা প্রাপ্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবস্থাপনা, কর্মপদ্ধতি, শিল্প-বাণিজ্য ও উৎপাদন, অর্থনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালনা করার লক্ষ্যেই এই ডিজিটাল বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়। এতে দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে প্রযুক্তি যেমন করে সহজলভ্য হয়েছে তেমনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও প্রযুক্তি নির্ভর সেবা পৌঁছে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির এ অগ্রযাত্রায় দেশের আপামর নাগরিকদের ১.৯২ বিলিয়ন দিন, ৮.১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ এবং ১ মিলিয়ন যাতায়াত হ্রাস পেয়েছে। সকল নাগরিক সেবা ও জীবনযাপন পদ্ধতিতে প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে এক বিশ্বস্ত মাধ্যম। এখন মোবাইল ফোন বা অনলাইনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে দেশের মানুষ। 

ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের মূল্য হ্রাস, ইন্টারনেট ব্যবহারে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অবকাঠামো সৃষ্টি এবং সর্বোপরি বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে গত কয়েক বছরে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়নে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটেছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে প্রতি এমবিপিএস ইন্টারনেটের মূল্য ছিল ৭৮ হাজার টাকা কিন্তু আমরা প্রতি এমবিপিএস ইন্টারনেটের মূল্য ৩০০ টাকার নিচে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। ২০০৯ সালের আগে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা যেখানে ১০ লাখ ছিল, সেখানে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটির অধিক। আমাদের নিবিড় প্রচেষ্টায় বর্তমানে পুরো দেশ একই নেটওয়ার্কের আওতায় চলে এসেছে। সারাদেশে ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল সংযোগের মাধ্যমে ৩৮০০ ইউনিয়নে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে এবং ১৮ হাজার ৫০০টি সরকারি অফিসকে একই নেটওয়ার্কের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। 

জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি দপ্তর থেকে প্রদেয় সেবাসমূহ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানে দেশের সকল ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়সহ প্রায় ৫১ হাজারেরও অধিক সরকারি দপ্তরের ওয়েব সাইটের একটি সমন্বিত রূপ বা ওয়েবপোর্টাল হচ্ছে জাতীয় তথ্য বাতায়ন। বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নে সরকারি দপ্তরের এ পর্যন্ত ৬৫৭ ই-সেবা এবং ৮৬.৪৪ লাখেরও অধিক বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট যুক্ত করা হয়েছে। এ বাতায়নে প্রতি দিন গড়ে ১ লাখেরও অধিক জনগণ তথ্য ও সেবা গ্রহণ করছে। এত সহজে সরকারি সেবা সম্পর্কে জানার বিষয়টি ১২ বছর আগে মানুষ চিন্তাও করতে পারেনি। 

জনগণের দোরগোড়ায় সহজে, দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের ৪৫০১টি ইউনিয়নে একযোগে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র উদ্বোধন করেন, যা বর্তমানে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) নামে সুপরিচিত। এই সেন্টার থেকে গ্রামীণ জনপদের মানুষ খুব সহজেই তাদের বাড়ির কাছে পরিচিত পরিবেশে জীবন ও জীবিকাভিত্তিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন। প্রথমে কেবল ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্রিক এর কার্যক্রম চালু হলেও বর্তমানে পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, গার্মেন্টস কর্মী এবং প্রবাসী নাগরিকদের জন্য আলাদা ডিজিটাল সেন্টার চালু হয়েছে। এইসব ডিজিটাল সেন্টার থেকে ২৭০ এর অধিক ধরনের সরকারি-বেসরকারি সেবা জনগণ গ্রহণ করতে পারছেন। ডিজিটাল সেন্টার সাধারণ মানুষের জীবনমান সহজ করার পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিয়েছে। মানুষ এখন বিশ্বাস করে, ঘরের কাছেই সকল ধরণের সেবা পাওয়া সম্ভব। মানুষের এই বিশ্বাস অর্জন ডিজিটাল বাংলাদেশের পথচলায় সবচেয়ে বড় পাওয়া। কেবল স্থানীয় সেবাই নয়, প্রযুক্তি নির্ভর কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে দেশে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে ফ্রিল্যান্সিং করেও তরুণরা উপার্জন করছে বৈদেশিক মুদ্রা। বর্তমানে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আয় ১০০ কোটি ডলারের বেশি। এই আয় এ বছরে ৫০০ কোটি ডলারে উত্তীর্ণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিগত ১২ বছর ধরে সরকারের তথ্যপ্রযুক্তির নানা উদ্যোগের ফলে শিক্ষা কার্যক্রম এখন অনেকাংশেই সহজতর হয়েছে। পেয়েছে বৈশ্বিক মান। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন কারিগরি ও অনলাইন প্রযুক্তিগত ডিজিটাল জ্ঞান তৈরি করছে নানা কর্মসংস্থান। ‘তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা নয়, শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার’-এই স্লোগানকে সামনে রেখে দেশের সব মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চালু করা হয়েছিল মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও সহজ করে তুলতে এটুআইয়ের সহযোগিতায় তৈরি করা হয়েছে ‘কিশোর বাতায়ন’ ও ‘শিক্ষক বাতায়ন’-এর মত প্ল্যাটফর্ম। এ প্লাটফর্মগুলোর ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বিভিন্ন অনলাইন কন্টেন্ট থেকে নিত্য নতুন জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া ‘মুক্তপাঠ’ বাংলা ভাষায় সর্ববৃহৎ ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম। যেখানে সাধারণ, কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। 

করোনার মতো মহামারির সময়েও দেশব্যাপী লকডাউনে শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম যেন থেমে না যায় সেজন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা এবং কারিগরি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে, যা সংসদ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে দেশব্যাপী সম্প্রচার করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মোট অনলাইন ক্লাস প্রচারিত হয়েছে ৫৬৬৮টি এবং আপদকালীন সময়ে শিক্ষা কার্যক্রমে ৫০৮৬ জনেরও অধিক শিক্ষক যুক্ত রয়েছেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম এবং সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ডিজিটাল মাধ্যমে কার্যকরী ও সহজ উপায়ে চলমান রাখতে ‘ভার্চুয়াল ক্লাস’ প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে লাইভ ক্লাস বা ট্রেনিং পরিচালনা, এডুকেশনাল কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট, মূল্যায়ন বা অ্যাসেসমেন্ট টুলস, মনিটরিং এবং সমন্বয় করার প্রযুক্তি যুক্ত রয়েছে। 

২০০ বছরেরও অধিককাল ধরে বিদ্যমান বিচারিক কার্যক্রমের ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় তৈরি করা হয়েছে বিচার বিভাগীয় বাতায়ন। যার মাধ্যমে উচ্চ ও অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগের সকল কার্যক্রম নথিভুক্ত থাকবে। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ৮৭টি নিম্ন আদালতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ বিচার বিভাগের জন্য তৈরিকৃত এই প্ল্যাটফর্মে একইসাথে শুনানি কার্যক্রমকে পরিচালনা করার জন্য একটি সুরক্ষিত ভিডিও কনফারেন্সিং সিস্টেম সংযুক্ত করা হয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় এ পর্যন্ত ২৭ হাজারের অধিক জামিন আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৬ হাজারেরও অধিক জামিন শুনানির তারিখ নির্ধারণ এবং ১১ হাজারের অধিক ভার্চুয়াল শুনানি সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রায় ৯০০০ আইনজীবী এই প্লাটফর্মে নিবন্ধিত হয়েছেন।

তথ্যপ্রযুক্তি দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ফলে দ্রুত দেশের যেকোনো প্রান্তে অর্থনৈতিক লেনদেনের সুবিধা সাধারণ মানুষের জীবনে এনে দিয়েছে স্বস্তি। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে স্টার্টআপ সংস্কৃতির বিস্তৃতি ঘটেছে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারি সহায়তা প্রদানের জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ’ প্ল্যাটফর্ম। ইতোমধ্যে শতাধিক স্টার্টআপকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক এফ-কমার্সেরও বিস্তার ঘটেছে। এমনকি মূল ধারার ব্যবসায়ীরাও প্রযুক্তির সহায়তা নিতে এফ-কমার্সমুখী হচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আরেক বড় অগ্রগতি হয়েছে নারীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে যুক্ত করার বিষয়টি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি বাড়ছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্য বলছে, এখন দেশে প্রায় ২০ হাজার ফেসবুক পেইজে কেনাকাটা চলছে। এর মধ্যে ১২ হাজার পেইজ চালাচ্ছেন নারীরা। দেশের ই-কমার্স ব্যবসাকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে ‘একশপ’-এর। যেখানে প্রান্তিক অঞ্চলের পণ্য উৎপাদনকারীরা কোন মধ্যস্বত্ত্বভোগী ছাড়াই নিজেদের পণ্য বিক্রি করতে পারছেন।

কৃষি প্রধান বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রও প্রযুক্তির ছোঁয়া বদলে দিয়েছে কৃষকের জীবন। তথ্যপ্রযুক্তিগত সেবা ‘কৃষি বাতায়ন’ এবং ‘কৃষক বন্ধু কলসেন্টার’ চালু করা হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন কৃষি বিষয়ক সেবাগুলোর জন্য কলসেন্টার হিসেবে কাজ করছে ‘কৃষক বন্ধু’ (৩৩৩১ কলসেন্টার)। ফলে সহজেই কৃষকেরা ঘরে বসে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। ‘কোভিড-১৯’ এ যখন সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থা স্থবির। এই মহামারি পরিস্থিতিতে মোকাবেলায় উন্নত দেশগুলো হিমসিম খাচ্ছিলো। তখনও বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ মানুষকে দেখিয়েছে নতুন পথ, যুগিয়েছে প্রেরণা। সরকারি অফিসগুলোতে চালুকৃত ই-নথি ব্যবস্থা সেবা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে। করোনা মহামারির সময়ে ৩০ লাখের অধিক ই-নথি সম্পন্ন হয়েছে। এতে করে সরকারি সেবা কার্যক্রম নাগরিকের কাছে আরও সহজে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। 

করোনা মহামারিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ গ্রহণ করেছে বিজনেস কন্টিনিউটি প্ল্যান। প্রযুক্তির সহায়তায় করোনা সচেতনতা, বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ সকল ধরনের সেবা দেশের কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা দ্রুত এই করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছি। জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩ এর মতো একটি ফোন সেবার মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, নিত্যপণ্য সরবরাহসহ সরকারি তথ্য ও সেবা প্রদান করে আসছে। করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত যেকোনো প্রয়োজনীয় পরামর্শ, করোনা সম্পর্কিত সকল সেবার হালনাগাদ তথ্যের জন্য করোনা পোর্টাল তৈরি করেছি, যার মাধ্যমে কোটি মানুষকে করোনা সম্পর্কিত তথ্য প্রদান করা হয়েছে।  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেবাকে আরও ত্বরান্বিত করতে চালু করা হয়েছে স্পেশালাইজইড টেলিহেলথ সেন্টার। পাশাপাশি গর্ভবতী ও মাতৃদুগ্ধদানকারী মা ও শিশুর নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে মা টেলিহেলথ সেন্টার সার্ভিস তৈরি করা হয়েছে, এর মাধ্যমে লক্ষাধিক মা ও শিশুকে সেবা প্রদান করা হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশীদেরও প্রবাস বন্ধু কলসেন্টারের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে আসছে। প্রযুক্তি নির্ভর বাজার ব্যবস্থায় ফুড ফর নেশনের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সারাদেশের উদ্যোক্তাদেরকে যুক্ত করা হয়েছে। করোনা ট্রেসার বিডি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসমূহ চিহ্নিতকরণের কাজ করছে। এছাড়াও গুজব ও অসত্য তথ্য রোধে দেশব্যাপী সত্যমিথ্যা যাচাই আগে ইন্টারনেটে শেয়ার পরে ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়েছে। 
 
‘ফোর টায়ার ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার’ প্রকল্পের আওতায় দেশে একটি সমন্বিত ও বিশ্বমানের ডাটা সেন্টার গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ফলে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ই-সেবা সংরক্ষণের ক্ষমতা বৃদ্ধি, ই-সেবাসমূহের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে জনসেবা উন্নত হবে। বিভিন্ন ই-সেবাসমূহের মদ। যে ইন্টারঅপারেবেলিটি সমস্যা দূরীকরণ ও প্রক্রিয়া সহজসাধ্য করার জন্য বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডিজিটাল আর্কিটেকচার (বিএনডিএ) তৈরি করা হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশ সরকারের জন্য ‘ই-গভ মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশের ৯টি পৌরসভা ও ১টি সিটি কর্পোরেশনে ডিজিটাল মিউনিসিপালিটি সার্ভিস সিস্টেম (ডিএমএসএস) উন্নয়নের মাধ্যমে নাগরিক সেবাসমূহ অনলাইন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে ডিএমএসএস বাস্তবায়ন করা হবে। উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশ্ববাজারে প্রবেশ উপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের আরও উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ধরনের স্টার্টআপ ফান্ড প্রদান করছে সরকার। 

হাই-টেক শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকার ৩৯টি হাই-টেক পার্ক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপন করছে। এগুলো নির্মাণ সম্পন্ন হলে ৩ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে ২৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চালুকৃত ৫টি পার্কে ১২০টি প্রতিষ্ঠান ৩২৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং আইটিতে দক্ষ ১৩ হাজারের অধিক কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রতিযোগিতা মোকাবেলায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইওটি, রোবোটিক্স, সাইবার সিকিউরিটির উচ্চপ্রযুক্তির ৩১টি বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর স্থাপন করা হবে। প্রযুক্তি ও জ্ঞান নির্ভর প্রজন্ম বিনির্মাণের লক্ষ্যে প্রতিটি জেলায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সকল ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্যই ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিতকে আরও শক্তিশালী করা। 
 
করোনাকালীন সময়ে আইসিটি বিভাগের সহযোগিতায় সারাদেশের ১ লাখ ১০ হাজার গুরুত্বপূর্ণ স্থান গুগল ম্যাপ ও ওপেন স্ট্রিট ম্যাপে যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার হাসপাতাল, ১৬ হাজার ফার্মেসি এবং ২০ হাজার মুদি দোকান সন্নিবেশিত করার পাশাপাশি ৮৭০টি রাস্তা ম্যাপে যুক্ত হয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মোকাবিলায় বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় রাজধানীর আইসিটি টাওয়ারে ই-গভর্নমেন্ট মাস্টার প্ল্যান রিপোর্ট প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলেন, “ডিজিটাল সেবার বিস্তৃতি ও উন্নতি ঘটিয়ে বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরে জাতিসংঘের ই-গভর্ন্যান্স উন্নয়ন সূচকে সেরা ৫০টি দেশের তালিকায় থাকবে।”

একযুগে ডিজিটাল বাংলাদেশের কর্মযজ্ঞ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন এবং সেবা প্রদানের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এর বিস্তৃতি ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া সাউথ-সাউথ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সোমালিয়া, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, ফিজি, ফিলিপিন্স এবং প্যারাগুয়ের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে এসডিজি, ওপেন গভর্নমেন্ট ডাটা, চেইঞ্জ ল্যাবসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান এবং সেবা বা সিস্টেম আদান-প্রদান করা হচ্ছে। যেখানে পাঁচটি বেস্ট প্র্যাকটিস চিহ্নিত করা হয়েছে। বেস্ট প্র্যাকটিসগুলো হচ্ছে ডিজিটাল সেন্টার, সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড, অ্যাম্পেথি ট্রেনিং, টিসিভি এবং এসডিজি ট্রেকার। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হওয়া এসকল ডিজিটাল কার্যক্রমের মডেল বাস্তবায়িত হচ্ছে বিদেশের মাটিতেও। 

বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপ ও যথোপযুক্ত সিদ্ধান্তের ফলে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বৈশ্বিক তথ্যপ্রযুক্তি অঙ্গনে স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। আইটিইউ অ্যাওয়ার্ড, সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড, গার্টনার এবং এটিকারনিসহ বেশ কিছু সম্মানজনক স্বীকৃতি এর উদাহরণ। তরুণ প্রজন্ম কেবল চাকরিমুখী না হয়ে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় নিজেরাই গড়ে তুলছে ছোট-বড় আইটি ফার্ম, ই-কমার্স সাইট, অ্যাপ ভিত্তিক সেবাসহ নানা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইটসহ কয়েকটি বড় প্রাপ্তি বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়।

বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে, তা শুধু স্বপ্ন বা স্লোগানই নয়, বরং তা আজ দৃশ্যমান। যার সুফল ভোগ করছে দেশের প্রতিটি মানুষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যের অন্যতম মাধ্যম তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ। বিগত ১২ বছরের ডিজিটাল বাংলাদেশের পথচলা আমাদের আত্মবিশ্বাসী করেছে। মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে। এদেশের তরুণরা এখন কেবল স্বপ্ন দেখে না, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নও করতে জানে। এখন গর্ব করেই বলা যায়, বাংলাদেশের এই অদম্য যাত্রায় অচিরেই গড়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের স্বনির্ভর ও আত্মপ্রত্যয়ী বাংলাদেশ।

লেখক: জুনাইদ আহমেদ‍ পলক, এমপি, প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here