বিজনেস জার্নাল প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ১১০ কোম্পানির মধ‌্যে ৬৬টির শেয়ার থেকে ফ্লোর প্রাইস (দর পতনের সর্বনিম্ন সীমা) প্রত্যাহার করে নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ফলে দীর্ঘদিনের আটকে পড়া টাকা হাতে পাবেন বিনিয়োগকারীরা। তবে,  ৪৪ কোম্পানির শেয়ারের ওপর ফ্লোর প্রাইস বহাল রয়েছে। এখনই এসব কোম্পানির শেয়ারের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হচ্ছে না। বিএসইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ফ্লোর প্রাইসে বহাল রাখা ঠিক হবে না। বাজারকে তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিতে হবে। বিশ্বের কোথাও এ ধরনের পদ্ধতি নেই। পতনমুখী বাজারকে ধরে রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী আটকেপড়া টাকা হাতে পাবেন। এর ফলে শেয়ারবাজারে গতি ফিরবে।

তবে বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, গত বছরে করোনা প্রাদুর্ভাব শুরুর সময়ে বাজারে ব্যাপক দরপতন হয়। এতে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পরিমাণ বিনিয়োগের ৫০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। আর সে সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সাবেক কমিশন সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের শেষ পুঁজিটুকু বাচাতে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দেন। এতে হয়তো ওইসব শেয়ারের পতন ধরে রাখা গিয়েছে, তবে সেই লোকসান গত এক বছরেও পুষিয়ে নিতে পারেননি তারা। কারণ এই এক বছরে বাজার সূচক ও লেনদেনের দৃশ্যমান বা উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: বিজনেসজার্নালবিজনেসজার্নাল.বিডি

তবে ফ্লোর প্রাইসের কারণে ওই ৬৬ কোম্পানির শেয়ার তেমন লেনদেন হচ্ছিল না। বাজারে লেনদেনের গতি বাড়ানোর জন্য হয়তো বিএসইসি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। এমনিতেই এখন একটি ক্রান্তিকাল যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি যেকোনো বিষয় বাজারে পেনিক সৃষ্টি করতে পারে। তাই বিএসইসির উচিত ছিল আরও সময় নিয়ে ফ্লোর প্রাইস তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, ফ্লোর প্রাইসের কারণে অনেক বিনিয়োগকারীদের এক বছর ধরে টাকা আটকা পড়ে আছে। বিএসইসির এ সিদ্ধান্তের কারণে আটকে থাকা বিনিয়োগকারীরা বের করতে পারবেন। মূলত বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও লেনদেনের গতি বাড়তেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তবে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়া ৬৬টি কোম্পানির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে কমিশন। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সুফল পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে বাকি ৪৪ কোম্পানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। তবে তা সহসায় করা হচ্ছে না।

এদিকে, বুধবার (৭ এপ্রিল) বিএসইসির ৭৬৯তম কমিশন সভায় ৬৬টি কোম্পানির শেয়ারের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর বৃহস্পতিবার (৮ এপ্রিল) থেকে তা কার্যকর করা হয়েছে। ফলে গত বুধবার পর্যন্ত শেয়ারবাজারে ১১০টি কোম্পানির শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে আটকে ছিল। বৃহস্পতিবার ৬৬টি কোম্পানির শেয়ারের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এখনো ৪৪টি কোম্পানির শেয়ারে ফ্লোর প্রাইস বহাল রয়েছে।

এদিকে ৬৬টি কোম্পানির শেয়ার থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করার পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (৮ এপ্রিল) বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির চাপ লক্ষ্য করা গেছে। অনেক বিনিয়োগকারী অতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করেছেন। তবে এ বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, শুধু ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের কারণেই বৃহস্পতিবার শেয়ারবাজারে দরপতন ঘটেনি। এছাড়া আরও বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রফিট টেকিং। কারণ লকডাউন থেকে অর্থাৎ সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত শেয়ারবাজারে সূচক ১৪৮ পয়েন্ট বেড়েছে। ফলে বৃহস্পতিবার অনেকেই প্রফিট টেকিং করেছেন। আর বেশিরভাগ সময়েই সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে বিনিয়োগকারীরা মার্জিন ঋণে শেয়ার কেনা থেকে বিরত থাকেন। এছাড়া, এক সপ্তাহের লকডাউনের মেয়াদ আরও বাড়বে কি না, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিনিয়োগকারীরা ‘ওয়েট অ্যন্ড সি’ অবস্থানে রয়েছেন। ফলে এসব বিষয় বৃহস্পতিবার শেয়ারবাজারের ওপর প্রভাব ফেলেছে।

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের কারণে শেয়ারবাজারে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক  মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়ার কারণে শুধু বৃহস্পতিবার শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে, এমনটি ভাবা ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের কারণে শেয়ারবাজারে তুলনামূলক অনেক কম প্রভাব পড়েছে। বৃহস্পতিবার শেয়ারবাজার পতনের জন্য আরও বেশ কিছু কারণ রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থেই কমিশন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যার ইতিবাচক প্রভাব পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়বে।’

এখন ৪৪ কোম্পানির শেয়ারের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে রেজাউল করিম বলেন, ‘ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়া কোম্পানিগুলো গতিবিধি আগে পর্যবেক্ষণ করা হবে। পরবর্তী সময়ে বাকি ৪৪টি কোম্পানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে ৪৪ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস সহসায় প্রত্যাহার করা হবে না।’

শেয়ারবাজার বিশ্লেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ফ্লোর প্রাইস বহার রাখা ঠিক হবে না। বিশ্বের কোথাও এ পদ্ধতি নেই। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী আটকেপড়া টাকা ফেরত পাবেন। এ সিদ্ধান্ত শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান বলেন, ‘ফ্লোর প্রাইসের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের অনেক টাকা আটকে আছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা একটু স্বস্তি পাবেন।’

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিলে শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক পতন শুরু হয়। এ পতনরোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শে ওই বছরের ১৯ মার্চ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ওপর ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে বিএসইসি। গত বুধবার যেসব কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয় হয়েছিল, সেগুলো হচ্ছে- পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেড, আর এন স্পিনিং মিলস লিমিটেড, বাংলাদেশ সার্ভিস লিমিটেড, আইএফআইএল ইসলামিক মিউচ্যুয়াল ফান্ড, জাহিন স্পিনিং লিমিটেড, রিং সাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড, অলিম্পিক এক্সেসোরিজ লিমিটেড, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ফনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, নূরানী ডাইং অ্যান্ড সুয়েটার লিমিটেড, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, এসইএমএল এফবিএলএফএসএল গ্রোথ ফান্ড, ইভেন্স টেক্সটাইলস লিমিটেড, প্যাসিফিক ডেনিমস লিমিটেড, মেট্রো স্পিনিং লিমিটেড, ফার কেমিক্যালস লিমিটেড, দেশ বন্ধু পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ইয়াকিন পলিমার লিমিটেড, সাফকো স্পিনিং মিলস লিমিটেড, ওয়েস্টার্ণ মেরিন শিফইয়ার্ড লিমিটেড, সেন্ট্রাল ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেড, বীচ হেচারীজ লিমিটেড, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, হামিদ ফেব্রিক্স লিমিটেড, প্রাইম টেক্সটাইলস স্পিনিং মিলস লিমিটেড, সায়হাম টেক্সটাইলস লিমিটেড, গোল্ডেন হার্ভেস্ট এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এএফসি এগ্রো বায়োটিক লিমিটেড, বেঙ্গল উইন্ডসোর থার্মোপ্লাস্টিকস লিমিটেড, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, সিলভা ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেড, ইন্দোবাংলা ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেড, আরগন ডেনিমস লিমিটেড।

এছাড়াও রয়েছে কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, শাশা ডেনিমস লিমিটেড, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এস্কয়ার নিটিং কমপোজিট লিমিটেড, ভিএফএস থ্রেড ডাইং লিমিটেড, ফোনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টম্যান্ট লিমিটেড, এডভেন্ট ফার্মা লিমিটেড, আরএসআরএম লিমিটেড, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড, ওয়াউম্যাক্স ইলেক্ট্রোড লিমিটেড, রূপালী ব্যাংক লিমিটেড, সায়হাম টেক্সটাইলস মিলস লিমিটেড, সোনারগা টেক্সটাইলস লিমিটেড, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, গ্লোবাল হেভী কেমিক্যালস লিমিটেড, নাভানা সিএজি লিমিটেড, ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড, ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড ইন্সুরেন্স লিমিটেড, ফারইস্ট ইসলামি লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টম্যান্ট লিমিটেড উসমানিয়া গ্লাস সিট ফ্যাক্টরী লিমিটেড. খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, নাহী অ্যালোমিনিয়াম লিমিটেড, দুলা মিয়া কটোন স্পিনিং মিলস লিমিটেড, সিনোবাংলা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস লিমিটেড, এমএল ডাইং লিমিটেড।

ঢাকা/এসএ

আরও পড়ুন:

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here